ভুটানের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে নেপালের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যিক চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী মার্চে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এটি স্বাক্ষরিত হবে। ইতিমধ্যে চুক্তি সংক্রান্ত সারসংক্ষেপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নীতিগত অনুমোদন দিয়ে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। চুক্তির আওতায় কোন কোন পণ্য থাকছে তা নির্ধারণে আগামী সপ্তাহে বৈঠকে বসছে দুই দেশ। গত ৬ ডিসেম্বর সম্পর্কের ৫০ সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে প্রথম দেশ হিসেবে ভুটানের সঙ্গে পিটিএ করে বাংলাদেশ। ভুটান বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দানকারী দেশ। অন্যদিকে নেপালের অবস্থান সপ্তম।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে এই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল। পরে সেটি পরিবর্তন করা হয়। আগামী ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে বাংলাদেশ। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে বেশ ঘটা করেই রাষ্ট্রীয়ভাবে এটি উদযাপন করা হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এদের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানরাও থাকবেন বলে কথা দিয়েছেন। থাকছেন সার্কভুক্ত দেশের অনেক রাষ্ট্রনেতা। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলিও উক্ত অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চাইছে কে পি শর্মা ও শেখ হাসিনার উপস্থিতিতেই এটি স্বাক্ষর করতে। তবে সেই তারিখটি ২৬ মার্চ হবে নাকি দু’একদিন আগে-পরে হবে সেটি নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের ওপর।
চুক্তির অগ্রগতি সম্পর্কে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ অনুবিভাগ) মো. শহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আগামী মাসে (মার্চে) নেপালের সঙ্গে পিটিএ স্বাক্ষর করতে যাচ্ছি। এই মাসেই হয়ে যেত। কিন্তু নেপালিদের অলসতার কারণে সেটি হয়নি। আমাদের (বাংলাদেশ-নেপাল) আর একটি মিটিং বাকি আছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এটি হয়ে যাবে। আগামী মাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। তখন আনুষ্ঠানিকভাবে এটি স্বাক্ষর হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’ নেপালের পর বাংলাদেশ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে পিটিএ করতে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৮ অক্টোবর এক বৈঠকে দুই দেশ পিটিএ স্বাক্ষরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ১৪০টি পণ্যকে অগ্রাধিকারের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে সেটিকে কমিয়ে ৪২টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, রেফ্রিজারেটর, মোটরসাইকেল, ওষুধ, আলু, বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট, বিভিন্ন প্রকারের জুস, প্লাস্টিক পণ্য, ফার্নিচার ইলেকট্রনিক্স পণ্য, পাটপণ্য, সিরামিকস, টয়লেট্রিজ ও স্টিল উল্লেখযোগ্য।
অপরদিকে নেপাল চাইছে ২০টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা, সৈয়দপুর বিমানবন্দর ব্যবহার এবং সেদেশে বিদ্যুৎ ও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে বাংলাদেশি বিনিয়োগ। নেপালের প্রস্তাবিত পণ্যগুলোর মধ্যে সবুজ সবজি, মসুর, এলাচ, আদা, বিভিন্ন ধরনের ফল, চা, কফি, হারবাল পণ্য, নুডলস, মিনারেল ওয়াটার, ক্লিংকার, ডেইরি পণ্য, হাতে তৈরি কাগজ, উলের কার্পেট, ফুটওয়্যার, সিলভারের জুয়েলারি ও কন্ট্রাক্ট লেন্স উল্লেখযোগ্য। তবে চুক্তির আওতায় কী কী থাকছে সেটি নির্ধারিত হবে আগামী সপ্তাহের বৈঠকে।
এ বিষয়ে মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘উভয় দেশেরই প্রস্তাবনা রয়েছে। কোন কোন পণ্য অগ্রাধিকার পাবে সেটি নির্ধারণের জন্যই বৈঠকে বসা হবে। বাকি সবকিছু চূড়ান্ত। এটিও এতদিনে হয়ে যেত। কিন্তু নেপাল দেরি করায় হয়নি।’
এদিকে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের পিটিএ স্বাক্ষরে রপ্তানি আরও প্রসারিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে পোশাক, ওষুধ, পাটপণ্য ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজার আরও প্রসারিত হবে। এছাড়া এই চুক্তি অন্য দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তিতে সহায়ক হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বড় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দর কষাকষি করতে অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে লাগবে। বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বাংলাদেশ কয়েক বছরের মধ্যেই স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। তখন এলডিসিভুক্ত হওয়ার কারণে যেসব সুবিধা পেত তা আর থাকবে না। বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে তাই এফটিএ বা পিটিএ করতেই হবে। এখন থেকে সেটি শুরু করা গেলে বাড়তি সুবিধা পাবে বাংলাদেশ।
বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ও ঢাকা চেম্বারের (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এফটিএ বা পিটিএ করতেই হবে। ভুটানের পর নেপালের সঙ্গে আমরা পিটিএ করতে যাচ্ছি এটা নিঃসন্দেহে ভালো। কারণ এতদিন আমাদের এই বিষয়ে তেমন একটা অভিজ্ঞতা ছিল না।’ নেপালের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে কতটা লাভবান হওয়া যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে পারিনি। এখনো ২-৩টি পণ্যের ওপর আমরা নির্ভরশীল। এটা হুট করে বাড়বেও না। আমরা যদি পিটিএ ও এফটিএ স্বাক্ষর করতে পারি তাহলে বাজার সম্প্রসারিত হবে। উদ্যোক্তারা নতুন পণ্য নিয়ে ভাববে। এছাড়া পিটিএ বা এফটিএ স্বাক্ষর করার পর অনেক দেশ থেকে আমরা লাভবান হব। আবার লাভ না থাকলেও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের অনেক দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক করতে হবে।’
জায়ান্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশে গ্রিসের সম্মানিত কনসাল জেনারেল ফারুক হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নেপাল ছোট দেশ হলেও তার সঙ্গে করা পিটিএ বাংলাদেশের জন্য ভালো। এতে করে বাংলাদেশ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এফটিএ করার সময় বাড়তি সুবিধা পাবে। বাণিজ্যে একটা কমন বিষয় হলো, রপ্তানিযোগ্য পণ্য থাকলে বাজার যত উন্মুক্ত হবে তত ভালো। আমাদের পণ্য প্রবেশে ব্রাজিল, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উচ্চ ট্যাক্স রয়েছে। নেপাল ও ভুটানের পিটিএ এই দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়তা করবে।’