বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী শুরুর পর থেকে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। গত বছরের একেবারে শুরুর দিকে ২১ জানুয়ারি থেকে ১৭ মার্চের মধ্যেই বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে আসেন ৬ লাখ ২৪ হাজার ৭৪৩ জন প্রবাসী শ্রমিক। পরবর্তী সময়ে বিমান চলাচল শুরুর পর দেশে ফিরে আসেন আরও বিপুল সংখ্যক অভিবাসী। অন্যদিকে, মহামারী শুরুর আগে কিংবা মহামারীর সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে ছুটিতে আসা শ্রমিকদের একটা বড় অংশই আবার কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চতায় পড়েছেন। যাদের অনেকেই হয়তো ইতিমধ্যে কাজ হারিয়েছেন কিংবা কাজ হারিয়ে আর ফিরতে না পারার ঝুঁকিতে রয়েছেন। দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া এমন শ্রমিকদের সুরক্ষায় ‘প্রবাসী কল্যাণ তহবিল’ থেকে শুরু করে নানামুখী প্রকল্পের কথা আলোচিত হয়েছে বটে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত দেশে ফিরে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে বড় রকমের কোনো প্রকল্প দৃশ্যমান নয়। বরং দেখা যাচ্ছে, করোনাকালে নানা বিশেষ প্রকল্পে বিদেশফেরত শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এতে হয়তো এমন প্রকল্পগুলোর অনুমোদন পেতে সুবিধা হতে পারে, কিন্তু তাতে সত্যিকার অর্থে বিদেশফেরত শ্রমিকদের কল্যাণ কতটা হবে সেটা বলা মুশকিল।
বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘সমীক্ষা ছাড়াই ১৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে এমন একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনার কথা তুলে ধরা হয়। উল্লিখিত প্রকল্প প্রস্তাবনাকে পরিকল্পনা কমিশনই ‘মনগড়া’ হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, এর জন্য কোনো সমীক্ষাও করা হয়নি। ১ হাজার ৩০১ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটির প্রস্তাবনা দিয়েছে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ। এই অর্থ থেকে প্রশিক্ষণ শেষে বিদেশফেরতদের ক্ষুদ্র ও উদ্যোক্তা ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনাও আছে। কিন্তু কীভাবে প্রকল্পটির সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে আর নির্বাচিতদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, প্রশিক্ষণ-উত্তর ঋণ প্রদান ও ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া কী হবে সেটাও প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে প্রকল্পটির বিভিন্ন অংশের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে তার ব্যাখ্যা চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। সম্প্রতি এই প্রকল্প প্রস্তাবের ওপর মূল্যায়ন কমিটির সভার (পিইসি) কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘পল্লী জীবিকায়ন’ শীর্ষক তৃতীয় পর্যায়ের এ প্রকল্পটি ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্টগ্রামের ৪৮টি জেলার ২২০টি উপজেলায় বাস্তবায়ন হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে কৃষি ও অকৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে। প্রকল্পটি সরকারের সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে চলতি বছরের জুন থেকে ২০২৫ সাল নাগাদ বাস্তবায়ন হবে। অনুমোদন পেলে এর দায়িত্ব পাবে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে চলমান ‘পল্লী জীবিকায়ন’ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের এই প্রকল্পটিতে এখন বিদেশফেরতদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে মাত্র, এটি বিদেশফেরতদের কল্যাণার্থে নেওয়া স্বতন্ত্র কোনো প্রকল্প নয়।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ দেড়শতাধিক দেশের শ্রমবাজারে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মনে রাখা দরকার দেশের জিডিপিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান ১২ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রবাসী আয়ের পরিমাণের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীতে ৯ম বৃহত্তম দেশ এবং প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যায় ৬ষ্ঠ বৃহত্তম দেশ। এই করোনাকালেও সর্বোচ্চ পরিমাণ প্রবাসী আয় এসেছে বলে রাষ্ট্র অনেকটা দুশ্চিন্তামুক্ত হয়েছে। এই শ্রমিকদের অবদানেই এখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বিগত কয়েক দশকের গড়ে ওঠা এই রেমিট্যান্স প্রবাহ সরাসরি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে প্রভাবিত করে এবং অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য একটি জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে। ফলে যে অভিবাসী শ্রমিকরা নিজের খরচে বিদেশে গিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভা-ার পূর্ণ করছেন, যারা নিজেদের কাজ নিজেরা জোগাড় করে উপার্জিত অর্থ দেশে বিনিয়োগ করছেন, তাদের বিপদের দিনে সুরক্ষা দেওয়া এবং তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানে রাষ্ট্রের অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে।
বৈশ্বিক মহামারীর আঘাতে অভিবাসী শ্রমিকরা এবং বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার যে হুমকির মুখে পড়েছে তা মোকাবিলায় এরই মধ্যে সুপরিকল্পিত বড় ধরনের স্বতন্ত্র প্রকল্প সরকার নেবে সেটাই আশা করা হয়েছিল। কিন্তু তেমনটা দৃশ্যমান নয়। এই পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে আসা মোট অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা, তাদের ভবিষ্যৎ অভিবাসনের সম্ভাবনা, বিদেশে শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ প্রাক্কলন ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সমীক্ষা পরিচালনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশফেরত যে শ্রমিকরা আর ফেরত যেতে পারবেন না বা যাবেন না তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানেরও সুনির্দিষ্ট প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত।