মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে মিয়ানমার আবার সেনা অভ্যুত্থানের কবলে পড়ল। গত সোমবার ভোরে নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। সোমবারই দেশটির প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট ও স্টেট কাউন্সেলরকে আটক করা হয়। গতকাল বুধবার দেশটির নির্বাচিত বেসামরিক নেতা অং সান সু চি’র বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের দায়ের করা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে আমদানি ও রপ্তানি আইন ভঙ্গ, বেআইনি যোগাযোগ সামগ্রী দখলে রাখা। নথিতে দেখা গেছে, তদন্তের জন্য আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাকে হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় পুলিশ।
গত সোমবার অভ্যুত্থানের পর থেকে সু চি কোথায় আছেন সে বিষয়ে সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে কিছুই জানানো হয়নি। তবে তাকে রাজধানী নেপিদোর নিজ বাড়িতে আটক রাখা হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ত জেলে রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করার নথি দেখা গেছে। তার বিরুদ্ধে করোনা মহামারীর নিয়ম ভঙ্গ করে জনসমাগম করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতিবাদে নাগরিক অসহযোগের ডাক দিয়েছেন মিয়ানমারের অ্যাকটিভিস্টরা। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে দেশটির ৩০টি শহরের ৭০টি হাসপাতাল ও মেডিকেল বিভাগের কর্মীরা কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন। কেউ কেউ কাজ চালিয়ে গেলেও গণতন্ত্র হরণের প্রতিবাদের প্রতীক পরছেন তারা। বিক্ষোভরত মেডিকেল কর্মীরা সু চি’র মুক্তির দাবি তুলেছেন। গতকাল থেকে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন তারা। নবগঠিত মিয়ানমার সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্টের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
এরই মধ্যে সেনা অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করে মিয়ানমারে অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। মিয়ানমার সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্ট নামে ওই বিক্ষোভ চলছে। এরই মধ্যে এতে শামিল হয়েছেন চিকিৎসাকর্মীরা। বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, ‘করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে হিমশিম খাওয়া অসহায় জনগণের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকেই ঊর্ধ্বে রেখেছে সেনাবাহিনী। মিয়ানমারে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৩ হাজার ১শ’রও বেশি মানুষ মারা গেছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাণহানি। অবৈধ সামরিক সরকার যারা কি-না আমাদের দরিদ্র রোগীদের প্রতি এতটুকু সম্মান দেখাতে পারেনি, তাদের যেকোনো আদেশ মানতে আমরা অস্বীকৃতি জানাচ্ছি।’
চারজন চিকিৎসক রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন যে, তারা কর্মবিরতি পালন করছেন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়েছেন তারা। ইয়াঙ্গুনভিত্তিক ২৯ বছর বয়সী এক চিকিৎসক রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি চাই সেনারা তাদের ব্যারাকে ফিরে যাবেন। আর সে দাবি জানিয়েই আমরা চিকিৎসকরা হাসপাতালে যাচ্ছি না। কতক্ষণ পর্যন্ত এ ধর্মঘট চলবে তার কোনো সময়সীমা নেই। এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।
অনলাইনে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মে নিজেদের প্রোফাইল পিকচার কেবল লাল রং করে ফেলছেন। ইয়াঙ্গুন ইয়ুথ নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা থিনজার সুনলেই বলেন, ‘মিয়ানমারের তরুণরা এখন নাগরিক অসহযোগের কৌশল দেশজুড়ে প্রয়োগ শুরু করছেন। তারা বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের সামরিক জান্তা সরকারের হয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার ডাক দিচ্ছেন।’ অসহযোগ আন্দোলন সমন্বয় করতে খোলা হয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ। তবে বড় ধরনের বিক্ষোভের কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। মঙ্গলবার রাতে দেশটির মূল শহর ইয়াঙ্গুনে চালকরা গাড়ির হর্ন আর বাসিন্দারা থালাবাসন পিটিয়ে সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতিবাদ জানান। অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে সেনাসদস্যরা। জারি রয়েছে রাত্রিকালীন কারফিউ। ফলে মূলত নীরব রয়েছে দেশটি।
মিয়ানমারে জরুরি অবস্থা জারির প্রসঙ্গে প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন দেশটির সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাং। অভ্যুত্থানের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি বলেছেন, দেশে সেনাশাসন জারি করাটা অপরিহার্য ছিল এবং আইনানুগ পথেই তা করা হয়েছে। এএফপি জানিয়েছে, মঙ্গলবার সেনাসদস্যদের নিয়ে গঠিত মন্ত্রিপরিষদে দেওয়া বক্তব্যে এমন দাবি করেন তিনি। মঙ্গলবার আগের মন্ত্রীদের বরখাস্ত করে সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাংয়ের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়েছে। ওইদিনই প্রথমবারের মতো এ মন্ত্রিসভার বৈঠক হয়।
বৈঠকে সেনাপ্রধান দাবি করেন, আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। নির্বাচনে জালিয়াতি সংক্রান্ত অভিযোগগুলো মোকাবিলা করতে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে তাদেরকে। ‘অনেক অনুরোধের পরও সরকার সাড়া দেয়নি। এমন অবস্থায় দেশের জন্য এটা (অভ্যুত্থান) অপরিহার্য ছিল। আর সে কারণে আমরা সে পথই বেছে নিয়েছি।’
এদিকে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ একটি নিন্দা প্রস্তাব দেওয়ার চেষ্টা করেছে। চীন ভেটো দেওয়ায় মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিতে পারেনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠকে বসে। তবে চীন সমর্থন না দেওয়ায় তারা যৌথ বিবৃতি দিতে ব্যর্থ হয়। যৌথ বিবৃতি দিতে চীনের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে চীনের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
বৈঠকের আগে মিয়ানমারে নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ দূত ক্রিস্টিন শ্রেনার সেনা অভ্যুত্থানের কড়া নিন্দা জানান। তিনি বলেন, এটা খুব স্পষ্ট যে গত নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে অং সান সু চি’র দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)।
মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। কয়েক সপ্তাহ আগেই সংস্থাটি করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবিলায় মিয়ানমারকে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার জরুরি সহায়তা দিয়েছিল। সেনা অভ্যুত্থানের পর সংস্থাটি এখন মিয়ানমার থেকে তাদের তহবিল ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে চিন্তা করছে বলে জানিয়েছে এএফপি।