পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে স্থবিরতা

ভারতীয় ঋণ ছাড়ে জটিলতা নিজস্ব অর্থায়নের ভাবনা

বিদ্যমান পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়াতে ভারত সরকারে লাইন অব ক্রেডিট বা এলওসি সহায়তা নেওয়া প্রকল্পে স্থবিরতা কাটছে না। এখন ভারতের ঋণ না নিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চিন্তাভাবনা করছে সরকার। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এ লক্ষ্যে প্রকল্পটিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, যার সিংহভাগ আসছে এলওসি ঋণ হিসেবে। কিন্তু সাড়ে ৩ বছরে এই প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। প্রতিশ্রুত ঋণের এক আনাও ছাড় হয়নি। এ অবস্থায় প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানোসহ ৯২৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বাস্তবায়নকারী কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় এলওসির ঋণ বাদ দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করা উচিত। বাস্তবায়নকারী সংস্থা পরিকল্পনা কমিশনের পরামর্শ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) জানানো হয়েছে। এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, শর্ত ও প্রক্রিয়াগত জটিলতায় অর্থছাড় হচ্ছে না। কিন্তু বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকা কঠিন। এখন এলওসি ঋণের আশায় না থেকে জিওবি অর্থে বাস্তবায়ন করার পরামর্শ দিয়েছে।

তিনি বলেন, অনুমোদিত প্রকল্পটির সঙ্গে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক জড়িত। ইআরডিকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তারা বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কার মতামত দিলে আমরা মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব।

প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাবে অনুষ্ঠিত মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, সাড়ে তিন বছর আগে ‘অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ সৃষ্টিতে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় ৪০ মাস গত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কাজ করা হয়নি। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ভারত সরকারের ২ হাজার ১৮৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পটির আওতায় ঋণের কোনো অর্থ খরচ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় ঋণ ছাড়ে জটিলতা একটি বড় কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে।

অনুমোদনের সময় প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভারত সরকার ২ হাজার ১৮৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে প্রকল্পটিতে অর্থ ছাড় করেনি ভারত।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরডির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি ভারত সরকারের ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় ছাড় হয়নি। তবে নেগোসিয়েশনের চেষ্টা অব্যাহত আছে। বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জানানো হবে। আশা করি দ্রুত সমাধান পাওয়া যাবে।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) অজিত কুমার ঘোষ বলেন, এখন প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন অনুমোদন করলে বাকি বিস্তারিত বলার পরিবেশ হবে। এখন এর বাইরে আর কিছু বলতে পারব না।

গত ২৭ ডিসেম্বর এর ওপর পিইসি সভা করেছে পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির বাস্তবায়নের মেয়াদ শেষ হয়েছে জুন ২০২০ সালে। করোনাকালের দুরবস্থার অজুহাতে প্রকল্পটির মেয়াদ জুন ২০২১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এই সময়ে ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ০.০৮২ শতাংশ অর্থ। নতুন করে প্রকল্পটির মেয়াদ জুন ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়িয়ে ব্যয় ৩ হাজার ৪৯০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

পিইসি সভার শুরুতে আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের যুগ্ম প্রধান জানান, আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ফলে শ্রমবাজার পরিবর্তিত হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের জন্য প্রযুক্তিভিত্তিক তথা কারিগরি শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের কোনো বিকল্প নেই। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০২০) ও এসডিজির (২০১৬-২০৩০) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সরকার ২০২০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় এনরোলমেন্টের হার ২০ শতাংশের কার্যক্রম গ্রহণ করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪১টি জেলায় ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ মোট ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু আছে। এ ছাড়া ‘২৩টি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে ২৩ জেলায় একটি করে নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের কাজও চলমান আছে।

পিইসি সভায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি জানান, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মোট ১১২টি ভবনের অবকাঠামো নির্মাণ বা উন্নয়ন করা হবে। এ ছাড়া ল্যাব ইকুইপমেন্ট ও মেশিনারি ক্রয়, কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন, উন্নয়নসহ আনুষঙ্গিক কাজ করা হবে। এ পর্যায়ে উন্নয়ন সহযোগীর সুপারিশ অনুযায়ী প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টের (পিএমসি) মাধ্যমে সব পূর্তকাজ, যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জামাদি ক্রয়, প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করতে সংশোধিত ডিপিপিতে অর্থবরাদ্দ ও পিএমসি নিয়োগের সংস্থান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পিডব্লিউডির ২০১৮ সালের রেট শিডিউল অনুসারে পূর্তকাজের ব্যয় প্রাক্কলন, প্রকিউরমেন্ট প্ল্যান, সিডি ভ্যাটসহ অন্যান্য অসামঞ্জস্য খাত সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পটি প্রথম সংশোধন প্রয়োজন।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক মো. শামসুর বলেন, প্রকল্প শুরুর দুই বছর পর ভারত জানায়, এটি ভারতের পাঞ্জাব অ্যান্ড মহারাষ্ট্র কো-অপারেটিভ ব্যাংকের (পিএমসি) মাধ্যমে করতে হবে। কিন্তু‘ অনুমোদিত ডিপিপিতে পিএমসির কোনো সংস্থান ও বাধ্যবাধকতা না থাকায় প্রকল্পের মূল কাজ আরম্ভ করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পিএমসির মাধ্যমে কাজ শুরু করতে অনেক সময় প্রয়োজন হবে। এ জন্যই সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে আমি আর কিছু বলতে পারব না। কারণ আমি ঢাকার বাইরে আছি।

কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্প শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সাতবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করা হয়েছে; যা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ধীরগতির অন্যতম প্রধান কারণ। প্রকল্পটির সংশোধন প্রস্তাব করার আগে এর দুর্বলতাগুলো অনুসন্ধান করে সুপারিশসহ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। ব্যর্থতা ও ত্রুটিগুলো অনুসন্ধান না করে প্রকল্পটি সংশোধনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রকল্পটি রি-ভিজিট করে একটি কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিয়ে পুনরায় প্রস্তাব পাঠাতে হবে। অর্থাৎ দেশীয় অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে ডিপিপি পুনর্গঠন করতে হবে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাস্তবায়ন মেয়াদ শেষে অগ্রগতির হার যদি এমন হয়, তাহলে তো বাস্তবায়নকারী সংস্থার দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। মূলত ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি হয়।