শুল্ক কমালেও অর্জিত হবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় ভোজ্য তেলের বাজারে কয়েক মাস ধরে চলছে অস্থিরতা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে আনতে আমদানি পর্যায়ে তিন স্তরের পরিবর্তে এক স্তরের শুল্ক আরোপের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। এ ছাড়া বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেল ১২৪ ও খুচরা সয়াবিন তেলে ১০৯ টাকা দাম নির্ধারণ করা যায় বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি সুরাহায় একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ১১ ফেব্রুয়ারি কমিটি এ বিষয়ে বৈঠক করবে। ট্যারিফ কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভোজ্য তেলের থেকে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করলেও তা অর্জনে তেমন সমস্যা হবে না; বরং বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে এক স্তরে শুল্ক নির্ধারণই এখন একমাত্র উপায় দেখছেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্যারিফ কমিশনের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশন নিয়মিত বাজার পর্যবেক্ষণ ও মতামত দিয়ে থাকে। আমরা এর আগেও এক স্তরে ভ্যাট নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছিলাম। যদিও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা গবেষণা করে দেখেছি, এনবিআর যখন চলতি অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা করেছিল, তখন টনপ্রতি সয়াবিন তেলের আমদানি মূল্য ছিল ৬০০-৭০০ ডলার। গত দুই মাসে তা বেড়ে ১ হাজার ২০০ ডলার হয়েছে। ভ্যাট হারের সংশোধন ও বাস্তবায়নে আরও বেশ কিছুদিন সময় লাগবে। যেহেতু আমদানি মূল্য বেশি তাই সরকার রাজস্বও বেশি পাচ্ছে। আমরা হিসাব করে দেখেছি, আগামী মাস থেকে যদি আমদানিতে পুরো ভ্যাট প্রত্যাহারও করে দেয় তার পরও রাজস্ব আহরণে প্রভাব পড়বে না।’

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছর অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে বাজেটে ভোজ্য তেলের ওপর তিন পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ করা হয়, যা আগে শুধু আমদানি পর্যায়ে আদায় করা হতো। এ ছাড়া অগ্রিম করও দিতে হচ্ছে আমদানি পর্যায়ে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে কমলে অভ্যন্তরীণ বাজারেও কমে। ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়া শুরু হয়। এর পর থেকেই আমদানিকারকরা এক স্তরের ভ্যাট নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি সুরাহায় এনবিআরকে চিঠি দিয়েছিল। সবশেষ গত নভেম্বরে আমদানিকারকরা ভোজ্য তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য পুনর্নির্ধারণের জন্য আবেদন করলে মন্ত্রণালয় ট্যারিফ কমিশনকে দিয়ে বাজার পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ চায়। গত ১১ জানুয়ারি কমিশন এক স্তরের ভ্যাট নির্ধরাণ অথবা বোতলজাত সয়াবিন তেলে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৪ টাকা বাড়িয়ে ১২৪ টাকা করার সুপারিশ করে।

ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিবেদন প্রস্তুতের ক্ষেত্রে তারা কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের ভোজ্য তেল আমদানিতে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কত ছিল, যখন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে ও বর্তমান দাম কত, এখন পর্যন্ত এ খাত থেকে কী পরিমাণ রাজস্ব আহরণ হয়েছে এবং এক স্তরের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার আরোপ করলে কী পরিমাণে প্রভাব পড়তে পারে। কমিশন দেখতে পায়, ইতিমধ্যে এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা প্রায় অর্জন করে ফেলেছে। এ ছাড়া কমিশনের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পণ্যের দীর্ঘ মেয়াদি দাম বৃদ্ধির ফলে ওই পণ্যের চাহিদা কমে যায়। সরকার যদি ভোজ্য তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে ক্ষেত্রে দুটি সমস্যার সৃষ্টি হবে। প্রথমত, সাধারণ নাগরিকের ভোজ্য তেল কেনায় বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে। দ্বিতীয়ত, দাম বৃদ্ধির ফলে বাজারে চাহিদা কমায় আমদানিও কমে যাবে। এ ছাড়া বাজারে চাহিদা কমলে খরচ পুষিয়ে নিতে আরও দাম বাড়াতে হবে। তাই কমিশন চাইছে দাম কমিয়ে পুরো বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে।

ট্যারিফ কমিশনের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দাম কমালে বাজারে ভোজ্য তেলের চাহিদা বাড়বে। সরকার ভ্যাট থেকে একটা রাজস্ব এমনিতেই পাচ্ছে। চাহিদা বাড়লে ভ্যাট আহরণের মাধ্যমে রাজস্ব বেড়ে যাবে। যদি আমদানি শুল্ক মওকুফও করা হয় তার পরও অর্থবছর শেষে ভোজ্য তেল থেকে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি রাজস্ব আহরিত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

এদিকে ভোজ্য তেলে দাম ও ভ্যাট পুনর্নির্ধারণ নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি গঠন করেছে। কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে রয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ও প্রধান হিসেবে রয়েছেন ওই মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর উদ্দীন। এ সপ্তাহেই কমিটির বৈঠক করার কথা ছিল। তা পিছিয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি ধার্য করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের ৯৫ শতাংশ ভোজ্য তেল আমদানি করা হয়। আর ৮০ শতাংশ ভোজ্য তেল খোলা অবস্থায় বিক্রি করা হয়। বাজারে খোলা তেল নিয়েই বেশি মূল্য কারসাজি হয়ে থাকে। ট্যারিফ কমিশন প্রতি মাসেই মিলগেট মূল্য ও আমদানি মূল্য পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রতিবেদন করে। এ মাসেও একটি প্রতিবেদন দেবে। কমিটি ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ, ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবনা ও অভ্যন্তরীণ বাজার পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে দাম পুনর্নির্ধারণ হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

ওই কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্যারিফ কমিশন একটা প্রস্তাবনা দিয়েছে। আমরা ১১ তারিখ বৈঠক করব। তারপর বোঝা যাবে আসলে কী সিদ্ধান্ত আসে। এসব বিষয়ে আগ বাড়িয়ে কিছু বলা যায় না। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও খুচরায় কিন্তু তেমন একটা বাড়েনি। ব্যবসায়ীরাও যেহেতু একটি প্রস্তাব দিয়েছে আবার ট্যারিফ কমিশনও একটি সুপারিশ করেছে সবকিছু বিবেচনা করে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে মানুষের কষ্ট হয় এমন কিছু করা হবে না।’

সবজি ও মাছের দামে স্বস্তি : ভোজ্য তেল ও চালের অস্বাভাবিক দামে স্বস্তিতে নেই রাজধানীর ক্রেতারা। সরকার বেসরকারিভাবে চাল আমদানির অনুমোদন দিলেও বাজারে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৩-৬৫ টাকা দরে। আর মোটা চালের কেজি বিকোচ্ছে ৫০-৫৫ টাকায়। বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটারপ্রতি খুচরা মূল্য এখনো ১২০ টাকা। তবে ৫ লিটারের বোতলে কিছুটা ছাড় মিলছে।

গতকাল রাজধানীর  বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, কিছুটা কম দামে মিলছে আলু। প্রতি কেজি আলু ২০-২৫ টাকা দরে খুচরা দোকানে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল সর্বনিম্ন ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা পর্যন্ত। এক সপ্তাহের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ থেকে ৪০ টাকা। ঢাকার সবচেয়ে বড় পাইকারি আড়ত শ্যামবাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ২৫ থেকে ২৮ টাকায় বিক্রি হয়। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, পাইকারিতে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরায় বেড়েছে। আর আড়তদাররা বলছেন, স্থানীয় বাজারে দাম চড়া যাচ্ছে।

এ ছাড়া অধিকাংশ সবজি ও মাছের দামও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। শিম, বেগুন, শালগম, মুলা, ঢেঁড়স, টমেটোর কেজি ২০-৩০ টাকার মধ্যে রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে ২০-৩০ টাকা দরে। তবে প্রতি কেজি চিচিঙ্গা কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ১০০ টাকা। এ ছাড়া বাজারে প্রতি কেজি ছোট আকারের রুই-কাতলা ১৮০-২০০ ও বড় আকারের রুই-কাতলা ৩০০-৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশের কেজি ১৪০ ও তেলাপিয়ার কেজি আকারভেদে ১৪০-১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাইব্রিড কই মাছের কেজি আকারভেদে ১৮০-২০০ টাকায় বিক্রি করছেন বিক্রেতারা।