ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ

দায়িত্ব খর্ব বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তার

পি কে হালদারের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. শাহ আলমকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ এবং ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-১-এর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

মূলত ওই বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের দায়িত্বে থাকাকালে তিনি রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং নামে দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছিলেন বলে আদালতের কাছে দেওয়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. রাশেদুল হকের স্বীকারোক্তিতে উঠে আসে।

স্বীকারোক্তিকে সামনে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৈরি করা এক তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে পত্রপত্রিকায় খবর বেরোনোর পরপরই শাহ আলমকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিভাগ থেকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার দিনের শেষভাগে এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদালত বা দুদক থেকে শাহ আলমের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকে আসেনি। তবুও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অভিযোগ আমলে নিয়ে নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমকে সার্ভিস রুল অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিভাগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’

তিনি জানান, শাহ আলম এখন থেকে ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বিভাগ, ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স বিভাগ ও স্পেশাল স্টাডিস সেলের দায়িত্ব পালন করবেন।

গত ২৩ জানুয়ারি রাজধানীর সেগুনবাগিচা থেকে দুদকের একটি দল ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক এমডি রাশেদুল হককে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুদক পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিলে তিন দিনের মাথায় গত ২৬ জানুয়ারি ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বাকী বিল্লাহর কাছে স্বীকারোক্তিমূলক এ জবানবন্দি দেন তিনি।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে রাশেদুল হক দাবি করেছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা অনিয়ম চাপা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন কর্মকর্তাদের ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা করে দিতে হতো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক শাহ আলমকে প্রতি মাসে দেওয়া হতো ২ লাখ টাকা করে। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এসব অনিয়ম ‘ম্যানেজ’ করতেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশেদুল হক মালয়েশিয়া থেকে বিবিএ পাস করে ২০০০ সালে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে যোগ দেন। ২০০৬-০৭ সালে আইআইডিএফসি নামের অন্য একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এভিপি হিসেবে প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের অধীনে চাকরি করেন তিনি। ২০১১-১২ সালে রিলায়েন্স ফিন্যান্সে এসভিপি হিসাবে যোগ দেন এবং প্রশান্ত কুমার হালদারের অধীনে চাকরি করেন। পি কে হালদার একসময় রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হন। সেখান থেকেই পি কে হালদারের অপকর্মের শুরু।

আদালতে রাশেদুল হক বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগ থেকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং পরিদর্শন করার জন্য বছরে দুবার সহকারী পরিচালক থেকে যুগ্ম পরিচালক পদের দুজন কর্মকর্তা আসতেন। যারা অনিয়ম এড়িয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন দেওয়ার বিনিময়ে নিতেন ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা।

দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা লিজিং কোম্পানিগুলোর তদারকি করা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের মাধ্যমে। ২০১৩ সালে ওই বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পান শাহ আলম।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে পদোন্নতি পেয়ে একই বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হন তিনি। এখনো এ পদে আছেন শাহ আলম। এ সময়ের মধ্যে প্রায় ১০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়। এসব দুর্নীতিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পি কে হালদার।

ঘুষের বিনিময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তার এ ধরনের অপকর্ম প্রশ্রয় দেওয়ার খবরে সংস্থাটির কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়।

গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা এ প্রতিবেদকে বলেন, সাত হাজার কর্মীর একটি পরিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখানে এক-দুজনের অপকর্মের কারণে সংস্থাটির সবার বদনাম হচ্ছে। এ ধরনের এক-দুজনের অপকর্মের দায় অন্যরা নেবে না।

অন্যদিকে পি কে হালদারের নির্দেশে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ভুয়া ঋণ দিয়েছেন বলেও স্বীকারোক্তি দেন রাশেদুল হক।