এক নিখুঁত অভ্যুত্থানে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাই দেশটির সরকারকে পদচ্যুত করেছেন। রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সু চি, রাষ্ট্রপতি উইন মিন্ট এবং অন্য কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী এক বছরের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। তারা দাবি করেছে এরপর নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। গত নভেম্বরের নির্বাচনের পর পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন বসার অল্প আগে এই অভ্যুত্থান হয়েছে। সু চির ন্যাশনাল লিগ অব ডেমোক্রেসি নির্বাচনে ৮৩% আসন পেয়ে একচেটিয়াভাবে জিতেছিল। পার্লামেন্টের সেদিন ওই ফলাফল অনুমোদন করে পরবর্তী সরকার গঠন করার কথা ছিল। হঠাৎ সব উল্টে গেল। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। ২০১০ সালের শেষের দিকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তৎকালীন গণতন্ত্রের আইকন সু চিকে মুক্তি দিয়ে বাইরের বিশ্বের কাছে নিজেদের উন্মুক্ত করেছিল। তার আগে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর গৃহবন্দি ছিলেন দেশের স্বাধীনতার নায়কের সন্তান সু চি। পাঁচ বছর পরে ২৫ বছরের মধ্যে দেশটিতে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সু চির দল এনএলডি ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল তাতে। সেনাবাহিনী প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তার সমস্ত বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ চালিয়ে গেলেও বেসামরিক শাসনে পরিবর্তনকে অনুমোদন করে তখন।
বিষয়টা কিন্তু কখনই এত সহজ ছিল না। বাস্তবে, ক্ষমতার ওপর দখল ধরে রাখতে জান্তা নিজের পছন্দমতো লিখেছিল দেশের সংবিধান। সামরিক বাহিনীর স্পষ্টতই মিয়ানমারকে ৬৫% বামার জনগোষ্ঠীর দেশ থেকে একটি বহুজাতিক ও বহুধর্মের দেশে রূপান্তরিত করার কোনো ইচ্ছা ছিল না। সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষায় আগ্রহী ছিল না তারা। প্রসঙ্গত, বামার জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বিষয়টি সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট ছিল পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে। সেখানে সেনাবাহিনী জাতিগত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংস অভিযানে নেতৃত্ব দেয়। তারা ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। দেশত্যাগ করতে বাধ্য করে দশ লাখেরও বেশি মানুষকে। জাতিসংঘ পরে একে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করে। সু চি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর পক্ষে নিঃশর্ত সমর্থন প্রকাশ করে এই নৃশংস অপরাধ সংঘটনে অংশীদার হয়েছেন। এর ষোলকলা পূর্ণ হয় যখন বিশ্ব আদালতে মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের গণহত্যার অভিযোগ থেকে রক্ষা করতে দাঁড়িয়ে তিনি বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেন। তবে আরও ঘনিষ্ঠভাবে দেখলে বোঝা যাবে সু চি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে বিরোধ এড়ানোর আরও কিছু উপায় খুঁজছিলেন। তার ব্যাপক সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বাকস্বাধীনতা এবং সভা-সমাবেশ নিয়ন্ত্রণ করা আইনগুলো কখনই বাতিল করা হয়নি। সু চি রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদন করা সাংবাদিকদের বিচার ও কারাদন্ডের পক্ষ নিয়েছিলেন। তিনি সামরিক বাহিনীর অবমাননা করার দায়ে দন্ডিত তিন জাতিগত কাচিন আন্দোলনকর্মীকে সহায়তা করতেও কোনো পদক্ষেপ নেননি। সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন সংস্থাগুলোর অবিশ্বাস্যরকম লাভজনক ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত করতেও কিছুই করেননি সু চি। সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ব্যাপকভাবে প্রচলিত ধারণা ছিল যে, সু চির সমর্থনের অর্থ হচ্ছে সামরিক বাহিনীর আর অভ্যুত্থান করার দরকার হবে না। তবে পর্যবেক্ষকরা সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়ের ব্যক্তিগত উচ্চাকাক্সক্ষার মাত্রা বুঝতে মারাত্মক ভুল করেছিলেন। কয়েক মাসের মধ্যেই অবসর গ্রহণে বাধ্য হন মিন অং হ্লাই। বেসামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণের কোনো পথ খোলা ছিল না তার সামনে। অন্যদিকে দ্য হেগের বিচারালয়ে তাকে অপরাধের অভিযোগের মুখোমুখি করার জন্য বিশ্বব্যাপী রব উঠেছে। এসব কারণে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।
গত নভেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে মাত্র ৭% আসন (৪৭৬ এর মধ্যে ৩৩টি) পাওয়ার পর সামরিক বাহিনী ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করে। গত সপ্তাহে মিন অং হ্লাইং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, দেশের নির্বাচনী আইন প্রয়োগ না করা হলে সংবিধান বাতিল করা হতে পারে। ২৮ জানুয়ারি মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশন কারচুপির অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে। এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমস এক খবরে জানায় মিন অং হ্লাইয়ের প্রতিনিধিরা সু চিকে একটি চিঠি পাঠান যাতে ভোট পুনঃগণনা এবং পার্লামেন্ট অধিবেশন বসা বিলম্বিত করার ‘আদেশ দিয়ে’ অন্যথায় পরিণতির জন্য সতর্ক করে দেওয়া হয়। এরপর সপ্তাহান্তেই সামরিক বাহিনী ‘ব্যবস্থা গ্রহণ করার’ প্রত্যয় ব্যক্ত করে। এরপরেই ঘনিয়ে আসে এই অভ্যুত্থান। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাইডেন সরকার মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণকে ‘অভ্যুত্থান’ বলবে কি না তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে। বাইডেনের কৃতিত্বই বলতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণকে অভ্যুত্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর পরিণতিতে দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ সামরিক এবং বৈদেশিক সহায়তা আটকে যাবে। তবে এ বিষয়ে আরও অনেক কিছু করা দরকার।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রগুলোকে সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক অপরাধের আদালতে তোলার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাৎক্ষণিকভাবে মিয়ানমার ইকোনমিক কর্পোরেশন এবং মিয়ানমার ইকোনমিক হোল্ডিংস নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করতে হবে। এই দুটি বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত সংস্থা সাধারণত আন্তর্জাতিক যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নির্মাণ, উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, বীমা, ব্যাংকিং, রত্ন আহরণ এবং পর্যটন খাতের ১০০টিরও বেশি কোম্পানি পরিচালনা করে। এই ধরনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক উদ্যোগ সেনাবাহিনীর নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতার ওপর অবিলম্বে রাশ টানতে শুরু করবে। এবং তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য মিয়ানমার সরকারকে প্রদেয় অর্থ তাদের বদলে শরণার্থীদের সহায়তা দিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঠানো।
মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর অভিযানে আনুমানিক ২,০০,০০০ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ১০ লাখ মানুষ। মিয়ানমার বিষয়ে সামনে যে চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে যে সম্পর্কে কোনো বিভ্রান্তি থাকার অবকাশ নেই। সামরিক বাহিনীর ওপর জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তিনি মিয়ানমারকে দ্রুত চীনের দিকে আরও বেশি ঠেলে দিতে পারেন। দেশটিতে চীনের বৈদেশিক বিনিয়োগ দুই হাজার কোটি ডলারের বেশি। মিয়ানমারের বৈদেশিক বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি চীনের সঙ্গে। তবে এই সমীকরণের আসল অনিশ্চিত উপাদানটি হলো এই অভ্যুত্থানের বিষয়ে মিয়ানমারের জনগণের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া। যদি তারা অতীতের মতো দল বেঁধে রাজপথে নামে তবে সামরিক বাহিনী ব্যারাকে ফিরে যেতে বাধ্যও হতে পারে। যাই ঘটুক না কেন, আমাদের অবশ্যই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।
লেখক : আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী এবং অং সান সু চির সাবেক অবৈতনিক উপদেষ্টা
সিএনএন অনলাইন থেকে ভাষান্তর- আবু ইউসুফ