নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা তৈরি করেন আর আমলাতন্ত্র সেটা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু একটা সরকারের রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা যতই জনমুখী হোক না কেন, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত আমলাতন্ত্র বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছাড়া সেই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। আবার আমলাতন্ত্র যতই দক্ষ বা পেশাদার হোক রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি দূরদৃষ্টিহীন এবং দুর্নীতিপরায়ণ হয় তাহলেও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারাও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা যদি নিজেদেরই সরকার ভাবতে শুরু করে দেন আর প্রশাসনিক কাঠামোবদ্ধ রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন তখন পুরো কাঠামোটিই স্থবির হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক কালে সারা দেশে মাঠপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের নানা ধরনের হামলা ও হয়রানির ঘটনায় শেষোক্ত সংকটটি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে। গত শনিবার কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য সচিবের কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি বা এসি-ল্যান্ড) মারধর করে পুকুরে নিক্ষেপের ঘটনাটি এই সংকটের তীব্রতারই একটি ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে স্বাস্থ্য সচিবের গ্রামের বাড়িতে লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে একদল লোক হামলা চালিয়েছে। হামলার সময় স্বাস্থ্য সচিব তার বাড়িতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। এ সময় হামলাকারীরা স্বাস্থ্য সচিবের বাড়িতে অবস্থানরত স্থানীয় এসি-ল্যান্ডকে মারধর করে পাশের পুকুরে ফেলে দেয়। হামলার শিকার ভুক্তভোগীরা বলছেন, সচিবের মায়ের নামে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে স্থানীয় সাংসদ নূর মোহাম্মদের অনুগতরা ওই হামলা চালিয়েছে।
মাঠপর্যায়ের সরকারি প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার ওপর হামলা চালানোর ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগের। এ থেকে এ দেশে অপরাধবৃত্তির দৌরাত্ম্য অনুমান করা যায়। একজন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি বা এসি-ল্যান্ড) যদি এমন নিরাপত্তাহীন থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি কত নাজুক, তা সহজেই আঁচ করা যায়। বেশ কিছু বছর ধরেই মাঠ প্রশাসনে কর্মরত ডিসি, ইউএনও এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিচার না হওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে সৃষ্ট রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির বাধ্যবাধকতায় ঘাটতি থাকার কারণে নিজেদের স্বার্থে তারা প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটাতে চাইছেন। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর বিকল্প নেই।
বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্বই হলো জনকল্যাণে কাজ করা। আমাদের সংবিধানে বলে দেওয়া হয়েছে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির কথা। সাংবিধানিক আইনের আলোকে প্রণীত গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে বর্ণিত ধারাগুলো এ ক্ষেত্রে গাইডলাইন হিসেবে কাজ করে। সংবিধানে জনপ্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার কথা স্পষ্ট করেই বলা আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন সাংসদসহ বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধির বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। এরমধ্যে যশোর-৬ আসনের একজন সাংসদ স্থানীয় একজন পরিবেশকর্মীকে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করার জেরে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাকে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা সাজানোর জন্য যে চাপপ্রয়োগ করেছেন, তা নিয়ে গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। এখন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে স্বাস্থ্য সচিবের বাড়িতে হামলা এবং এসি-ল্যান্ডকে মারধর করে পুকুরে নিক্ষেপের ঘটনায় স্থানীয় সাংসদের সম্পৃক্ততা আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখার দাবি সামনে চলে এসেছে।
আমরা মনে করি, এ ধরনের হামলার কারণে মাঠ পর্যায়ে কাজ করা সরকারি কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে রাজনৈতিক বিবেচনা না করে আইনের মধ্যে থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। হামলাকারী রাজনৈতিক প্রভাবশালী হলে কেন্দ্রীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি আইন এবং বিধিমালায় নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবতে হবে। পাশাপাশি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ওই এসি-ল্যান্ডের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। সর্বোপরি দায়িত্বরত সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর হামলার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে।