মার্জিন ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়াকে কেন্দ্র করে জানুয়ারির শেষার্ধ থেকেই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মার্জিন ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ১২ শতাংশে কার্যকরের বিষয়টিতে পাঁচ মাসের ছাড়ও দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। তবে এই ছাড়ের কোনো প্রভাব বাজারে পড়েনি। উল্টো মার্জিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজে শেয়ারের বিক্রিচাপ চলছে। আবার নতুন করে কোনো মার্জিন ঋণও দিচ্ছে না অধিকাংশ ব্রোকারেজ হাউজ। এতে করে শেয়ারের ক্রেতা সংকট তৈরি হয়েছে। গতকাল প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আসা বিক্রিচাপে বড় মূলধনি কোম্পানিসহ বেশিরভাগ শেয়ার দর হারিয়েছে। এতে করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ১৪২ পয়েন্ট কমে গেছে।
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বড় পতনে ভূমিকা রেখেছে শীর্ষস্থানীয় ১১টি ব্রোকারেজ হাউজ। এসব হাউজ থেকে বিক্রিচাপ আসায় সূচকের বড় পতন হয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে ডিএসইর প্রধান সূচক ৬ হাজার পয়েন্টের কাছাকাছি উন্নীত হওয়ায় অনেক শেয়ারের দর বেড়েছে। মার্জিন ঋণ সংকটের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মূলধনি মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। গতকালের বড় পতনে এটিই প্রধান কারণ। গতকালের সূচকে পতনে বেশি ভূমিকা রেখেছে, বড় মূলধনি কোম্পানি বিএটি বাংলাদেশ, বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, লাফার্জহোলসিম ও স্কয়ার ফার্মার শেয়ার। গতকাল এসব শেয়ারের দর ৬ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, যাতে ডিএসইর প্রধান সূচকটি কমেছে ৮০ পয়েন্ট।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মার্জিন ঋণের সুদহার ১২ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণার পর থেকেই পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তা কার্যকরের কথা থাকলেও ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের দাবির মুখে তা পাঁচ মাস পিছিয়ে দেওয়া হয়। তবে এরপর থেকে ব্রোকারেজ হাউজগুলো নতুন করে কোনো মার্জিন ঋণ দিচ্ছে না বলে জানা গেছে। বিপরীতে ঋণের সুদহার ১২ শতাংশে নামিয়ে আনার অংশ হিসেবে বিভিন্ন শেয়ার বিক্রি করে তা সমন্বয়ের চেষ্টা চালাচ্ছে ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এর ফলে নতুন করে ক্রেতা সংকট তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া সূচকের বিভিন্ন স্তরভিত্তিক মার্জিন ঋণ দেওয়ার যে পদ্ধতি চালু করেছে এসইসি, সেটিও প্রচলিত নয় বলে অভিযোগ করেছে ব্রোকারেজ হাউজগুলো। এটিও প্রত্যাহারের চাপ রয়েছে। তবে সূচকের বড় পতনের মাধ্যমে এসইসির ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুঁজিবাজারে যাতে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা না দেয়, সে জন্য নজরদারি আরও জোরদারের কথা জানিয়েছেন এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. রেজাউল করিম। তিনি দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পতন হওয়ার কোনো কারণ নেই। এ ধরনের পতন আমাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। কেউ কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বিক্রিচাপ বাড়িয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। সোমবার থেকে লেনদেন পর্যালোচনায় নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা গেলে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এসইসি সূত্রে জানা গেছে, সোমবার থেকে শীর্ষ ব্রোকারেজ হাউজের লেনদেনে কঠোর নজরদারি করা হবে। কোনো ব্রোকারেজ হাউজের কোনো ওয়ার্কস্টেশন থেকে লেনদেনের সময় অস্বাভাবিক বিক্রিচাপ এলে প্রয়োজনে সেই ওয়ার্কস্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে।
গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৬০ শতাংশ শেয়ারের দর কমেছে। এতে করে প্রধান মূল্যসূচকটি আগের দিনের তুলনায় ১৪২ দশমিক ৮৯ পয়েন্ট কমে ৫৫০৪ পয়েন্টে নেমেছে। অবশ্য সূচক কমলেও লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭৭১ কোটি ৫২ লাখ টাকা, যা আগের দিনের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি।
ডিএসইতে লেনদেনকৃত কো¤পানির মধ্যে দাম বেড়েছে ৪৩টির, কমেছে ২২৪টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৮৬টি কোম্পানির শেয়ার। খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল সবচেয়ে বেশি দর কমেছে সিমেন্ট, খাদ্য ও অনুষঙ্গ, সেবা ও নির্মাণ, বিবিধ, এনবিএফআই ও টেলিযোগাযোগ খাতের। এসব খাতের বাজার মূলধন এক দিনে ৩ থেকে ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। মূলত বড় মূলধনি কোম্পানির শেয়ারের পতনে সূচকে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
গতকাল ডিএসইতে দর কমার শীর্ষে প্রধান ১০টি সিকিউরিটিজ হলো : সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, মীর আখতার, শাইনপুকুর সিরামিকস, অ্যাপোলো ইস্পাত, বেক্সিমকো লিমিটেড, জিকিউ বলপেন, লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স, সাইফ পাওয়ার, ফু-ওয়াং সিরামিকস ও বেক্সিমকো ফার্মা। লেনদেনের ভিত্তিতে (টাকায়) প্রধান ১০টি কোম্পানি হলো : বেক্সিমকো লি., বিএটিবিসি, লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স, রবি আজিয়াটা, বেক্সিমকো ফার্মা, মীর আখতার, বিডি ফাইন্যান্স, এলএইচবিএল, সামিট পাওয়ার ও ইপিজিএল। দর বৃদ্ধির শীর্ষে প্রধান ১০টি কো¤পানি হলো : মার্কেন্টাইল ইন্স্যু., প্রাইম ইন্স্যু., মতিন স্পিনিং, তাকাফুল ইন্স্যু., রিপাবলিক ইন্স্যু., বীকন ফার্মা, সোনারবাংলা ইন্স্যু., প্রগতি ইন্স্যু., ক্রিস্টাল ইন্স্যু. ও ইসলামি ইন্স্যু.।