আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকা- ৯ বছরে পা দিলেও খোলেনি রহস্যের জট। একের পর এক তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হলেও বদলায়নি মামলার তদন্ত। এখনো আসামি শনাক্তকরণ, জব্দ করা আলামত পরীক্ষা ও নিহতদের খোয়া যাওয়া ল্যাপটপ উদ্ধারের পর্যায়েই আটকে আছে। যদিও র্যাবের পক্ষ থেকে বরাবরের মতো দাবি করা হচ্ছে, মামলার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু অতীতের মতো এ বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি সংস্থাটি। উল্টো ৭৮ বার পেছানো হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ। ফলে-নিহতদের স্বজনরা বিচার পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
এদিকে হত্যাকান্ডের দিবসকে সামনে রেখে সাংবাদিক সংগঠনগুলো আগামীকাল বৃহস্পতিবার সভা-সমাবেশ করবে। প্রতি বছরের মতোই ওইদিন সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) একটি প্রতিবাদ সভা হবে। পরিবারের সদস্যরা সাগর-রুনি কবর জিয়ারত করবেন।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি তাদের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন। হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় ছিল তাদের সাড়ে চার বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ। এ হত্যাকাণ্ডে দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরের দিন রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন। প্রথমে মামলাটির তদন্ত করেন শেরেবাংলা নগর থানার একজন সাব-ইন্সপেক্টর। ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্তভার পড়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল আলমের ওপর। তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার ৬২ দিনের মাথায় (২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল) হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এরপর আদালত র্যাবকে মামলার তদন্তের নির্দেশ দেয়। সেই থেকে র্যাব মামলাটি তদন্ত করছে। তদন্তভার পেয়েই ভিসেরা পরীক্ষার জন্য কবর থেকে সাগর-রুনির লাশ উত্তোলন করা হয়। ভিসেরা পরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাদের মৃত্যুর আগে কোনো ধরনের বিষাক্ত বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করানো হয়নি। আর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ছুরিকাঘাতে রক্তক্ষরণ ও আঘাতের কারণেই তারা মারা গেছেন। ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থাটি।
বাসা থেকে লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে এসে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই হত্যার রহস্য উদঘাটন করা হবে। সেই ৪৮ ঘণ্টা এখন ৯ বছরে গিয়ে ঠেকেছে। ২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছিলেন ১০ অক্টোবরের মধ্যে সাগর-রুনির হত্যারহস্য উদঘাটিত হবে বলে আশা করছি। এরপর ৯ অক্টোবর হঠাৎ করে রাতের বেলায় ডাকা চমক দেওয়া সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানিয়েছিলেন, একজনকে ধরতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কা ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তার পরিচয় বলা হয়নি ওই সময়ে। আদৌ ওই ব্যক্তিকে ধরে মামলার কোনো সুরাহা করতে পারেনি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।
মামলার বাদী ও রুনির ভাই নওশের আলম রোমান গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্তের সর্বশেষ আপডেট সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। তদন্তকারী সংস্থা র্যাবও আমাদের কিছু জানায়নি। গত বছর সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে। এর মাঝে তারাও (তদন্ত কর্মকর্তা) আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি, আমরাও করিনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মামলাটি তদন্তে র্যাব গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে মনে হচ্ছে। একটি মহল এ হত্যাকা-ের বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছে। আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, রহস্যের জট খোলার চেষ্টা না করলে জট খুলবে কীভাবে?
মামলার অগ্রগতির বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি তদন্ত কর্মকর্তা ও র্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খন্দকার শফিকুল আলম। তবে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকা- অন্যতম একটি স্পর্শকাতর ঘটনা। আমরা আমাদের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা দিয়ে মামলাটির তদন্ত করে আসছি। ইতিমধ্যে বেশকিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। যা যথাসময়ে যথাযথ উপায়ে উপস্থাপন করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুরো বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। এ অবস্থায় অগ্রগতির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা আলামত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়ে ফরেনসিক ও রাসায়নিক পরীক্ষার পর সেখান থেকে দুজন অজ্ঞাত পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ বৃত্তান্ত পাওয়া গেছে। তাদের আমরা এখনো খুঁজছি। আশা করি অল্প সময়ে কোনো একটা সুখবর দেওয়া যাবে। খুনিদের গ্রেপ্তার ও হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, হত্যাকা-ের পর গতকাল পর্যন্ত আলোচিত এ মামলায় আটজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতরা হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মো. সাইদ, মিন্টু, কামরুল হাসান ওরফে অরুন, সাগর-রুনির ভাড়া বাসার নিরাপত্তাপ্রহরী এনামুল, পলাশ রুদ্র পাল এবং নিহত দম্পতির বন্ধু তানভীর রহমান। তাদের মধ্যে প্রথম পাঁচজনই মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র হত্যার ঘটনায় র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হন।