আদালতের পর্যবেক্ষণ

হত্যাকারীরা বেঁচে থাকলে জঙ্গিরা উৎসাহী হবে

জাগৃতির প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলায় ৫৩ পৃষ্ঠার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, হত্যাকারীরা বেঁচে থাকলে বিচারের বাইরে থাকা আনসার আল ইসলামের সদস্যরা একই অপরাধে উৎসাহী হবে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের এই রায়ে বলা হয় হয়, দেশব্যাপী ব্লগার, প্রকাশক, লেখক হত্যার অংশ হিসেবেই ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করা হয়। আদালত আরও বলে, আসামিরা সবাই সরকার কর্র্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসার আল ইসলাম অর্থাৎ আনসার উল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। মেজর (চাকরিচ্যুত) জিয়াউল হক এবং সেলিম ওরফে হাদীর নির্দেশ, পরিকল্পনা এবং অর্থায়নে এবং ব্লগার ও লেখক অভিজিত রায়ের (২০১৫ সালে বাংলা একাডেমির বইমেলায় জঙ্গিদের হাতে নিহত) বই প্রকাশের কারণে এ হত্যাকা- হয় বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে।

গতকাল দুপুরে আসামিদের উপস্থিতিতে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. মজিবুর রহমান। ৮ আসামির মৃত্যুদণ্ডাদেশকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে বলে উল্লেখ করেন বিচারক।  

পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, ‘জিহাদের নামে আনসার আল ইসলামের এবং এই মামলার আসামিদের লক্ষ্য ছিল ব্লগার, লেখক ও প্রকাশকদের হত্যা করে মানুষের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া এবং মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা। আর এসবের উদ্দেশ্য হলো মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ করে দিয়ে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে ধ্বংস করা।’ 

আদালত আরও বলে, ‘আনসার আল ইসলাম অর্থাৎ আনসার উল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা বাংলাদেশের জননিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারকে দেশের গণতান্ত্রিক উন্নয়নমূলক কার্য করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে এক ও অভিন্ন অভিপ্রায়ে ফয়সল আরেফিন দীপনকে হত্যা করে। আনসার আল ইসলামের সদস্যরা সাভারে ব্লগার রিয়াদ মোর্শেদ বাবুকে হত্যা করে। একই দিন শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটে ফয়সল আরেফিন দীপন এবং লালমাটিয়ায় ‘শুদ্ধস্বর’ প্রকাশনীর প্রকাশক টুটুলকে (আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল) হত্যার উদ্দেশ্যে সন্ত্রাসী হামলা চালায়।

দীপন হত্যাকা-ে আসামিদের কার কী ভূমিকা ছিল সেটি উল্লেখ করে আদালত  বলে, ‘দীপনকে হত্যার জন্য আসামি মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ জিয়াউল হক নির্দেশ, প্রশিক্ষণ এবং মূল হত্যাকারীদের অর্থায়ন করে। আর অপর আসামি আকরাম হোসেনের পরিকল্পনায় আসামি মইনুল হাসান শামীম অস্ত্র সংগ্রহ, খুনের পরামর্শ এবং মূল হত্যাকারীদের দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব দেয়। আরেক আসামি মোজাম্মেল হুসাইন সায়মন হত্যা পরিকল্পনায় অংশগ্রহণসহ ঘটনাস্থল রেকি করা এবং আসামি আ. সবুর হত্যাকারীদের প্রশিক্ষণ দেয়। আর আবু সিদ্দিক সোহেল এবং খাইরুল ইসলাম ঘটনাস্থল রেকি করে এবং আরেক আসামি শেখ আব্দুল্লাহ টাকা হস্তান্তর করে।’

আদালত বলে, ‘আসামিদের কারও ভূমিকা ছোট-বড় করে দেখার সুযোগ নেই। যারা বই প্রকাশের দায়ে মানুষ হত্যা করতে পারে, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যায় অংশগ্রহণকারীরা বেঁচে থাকলে আনসার আল ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরাসহ অন্য সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহী হবে। কাজেই আসামিরা কোনো সহানুভূতি পেতে পারে না। প্রত্যেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং এটা হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এতে একদিকে নিহতের আত্মীয়রা মানসিক শান্তি পাবেন অন্যদিকে ভবিষ্যতে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ করতে অন্যরা ভয় পাবে এবং নিরুৎসাহিত হবে।’ 

রায় ঘোষণার পর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দণ্ডাদেশ হাইকোর্ট বিভাগ কর্র্তৃক অনুমোদনের জন্য এই মামলার যাবতীয় নথি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ এর ৩১ (২) ধারা অনুযায়ী হাইকোর্টে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত।