পদ্মা সেতু প্রকল্পের মেয়াদ ২ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব

মহামারী করোনাভাইরাসের প্রভাবে স্থবির থাকা উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনার চেষ্টা করছে সরকার। এক্ষেত্রে বেশিরভাগ বড় প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) কাটছাঁটের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। এক্ষেত্রে সংশোধিত এডিপিতে বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেলের বরাদ্দ ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। অন্য দিকে মেট্রোরেলের বরাদ্দ সমান রাখা হলেও সড়ক ও মহাসড়কের বেশিরভাগ বড় প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এই বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

আগামী মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (এনইসি) সংশোধনের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে বলে কমিশন সূত্র জানায়। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, করোনার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রমে যে স্থবিরতা এসেছিল, তা মোটামুটি কাটিয়ে ওঠা গেছে। এখন চলমান প্রকল্পগুলোর কাজের গতি আরও বাড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।

তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার (আজ) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সঙ্গে বসব। আশা করি চলমান কার্যক্রমের গতি বাড়াতে প্রকল্পগুলোর একটি নতুন প্রাধিকার নিশ্চিত করা যাবে। এক্ষেত্রে কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধান করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা, সংশোধিত এডিপিতে তা কমিয়ে করা হচ্ছে ২ হাজার ৯৯ কোটি টাকা, কর্ণফুলী টানেলে বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, আরএডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ১ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। তবে মেট্রোরেল লাইন -৬ বা এমআরটি প্রকল্পে বরাদ্দ ৫ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা অপরিবর্তিত থাকছে।

তবে বেশ কিছু বড় প্রকল্পে বরাদ্দ বাড়ছে। এর মধ্যে সাউথ এশিয়ান সাব রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন সাসেক-১ প্রকল্পে বরাদ্দ আছে ৪৪০ কোটি টাকা, তা বাড়িয়ে করা হচ্ছে ৬১০ কোটি টাকা, সাসেক-২ তে বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, বাড়িয়ে করা হচ্ছে ২ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, ফরিদপুর-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ৪৭৭ কোটি টাকা, তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ফোরলেন প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, তা বাড়িয়ে করা হচ্ছে ২ হাজার ৩০২ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অন্যান্য উন্নয়ন কাজের মতো করোনা মহামারীতে পদ্মা সেতু নির্মাণেও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বিশাল কর্মযজ্ঞ দ্রুত বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল পাঁচ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সাত মাস চলে গেলেও সেভাবে ব্যয় করতে পারেনি অর্থ। বর্তমানে বাস্তব কাজ ৮৩ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। বাধ্য হয়ে কর্র্তৃপক্ষ সংশোধিত এডিপিতে প্রায় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা বা ৫৮ শতাংশ অর্থ ফেরতের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত অর্থাৎ আরও দু বছর বৃদ্ধিরও আবেদন করা হয়েছে।

স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রতি অর্থবছরে বরাদ্দও রাখা হয়। চলতি অর্থবছরেও রাখা হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনাভাইরাস মহামারী আকার ধারণ করায় উন্নয়ন কাজে বিঘ্ন ঘটে। পদ্মা সেতু নির্মাণে বিদেশিরা জড়িত। এক পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায় এর কাজ।

সর্বশেষ সংশোধনীতে সরকার সেতু চালু করার জন্য সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিল ২০২১ সালের জুন মাস। স্বাধীনতার ৫০তম বছরের মধ্যেই সরকার পদ্মা সেতুর কাজ সম্পন্ন করে যান চলাচল শুরু করতে চায় বলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে বাস্তবায়নকারী সংস্থা জানিয়েছে।

পদ্মা সেতুর সুফল কাজে লাগাতে হচ্ছে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। এ জন্য রাজধানী থেকে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে একটি এক্সপ্রেসওয়ে করা হচ্ছে। পদ্মা সেতু না হলেও যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এর কাজ এগিয়ে নিতে সরকার অন্যান্য বছরের মতো চলতি অর্থবছরেও ৪৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালের মে মাসে। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে সংশোধন করে শেষ পর্যন্ত এই সড়ক নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে ১১ হাজার কোটি টাকা।

সাসেক-২ অর্থাৎ এলেঙ্গা-রংপুর মহাসড়ক ফোর লেন প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে এক হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কাজের গতি বাড়ায় সংশোধন করে বেশি করে অর্থ চাওয়া হয়েছে। এ জন্য সংশোধিত এডিপিতে দ্বিগুণেরও বেশি দুই হাজার ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে কর্র্তৃপক্ষ।

আর রাজধানীর যানজট দূর করতে ফাস্টট্র্যাক নামে মেট্রোরেল-৬ প্রকল্পেও সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে এবার পাঁচ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এখানে কর্র্তৃপক্ষ সব টাকাই ব্যয় করার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া নতুন করে মেট্রোরেল-১ প্রকল্পেও ৫৯১ কোটি টাকা ঠিক রাখা হয়েছে।

কর্ণফুলী টানেলে মূল এডিপিতে এক হাজার ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেও সংশোধিত এডিপিতে এক হাজার ৪২৫ কোটি টাকা ব্যয় করার প্রস্তাব করেছে কর্র্তৃপক্ষ।