দেশে গত ১৯ জানুয়ারি পরীক্ষা অনুপাতে মোট শনাক্তের হার ছিল ৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর পরদিন থেকেই শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবারও শনাক্তের হার ছিল ২ দশমিক ৮২ শতাংশ বা ৩ শতাংশের ঘরে। অর্থাৎ গত ২৪ দিন বা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশে করোনা সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে। এমনকি ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি এই হার ২ শতাংশের ঘরে ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারী নিয়ন্ত্রণের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার টানা তিন থেকে চার সপ্তাহ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে সে দেশে রোগটির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। দেশের বিশেষজ্ঞরাও বিভিন্ন সময় এই সংজ্ঞার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
দেশে করোনার এমন পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা রোগটি নিয়ন্ত্রণে ‘ভালো পর্যায়’ বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, দেশে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছে। আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। তবে একজন বিশেষজ্ঞ নিয়ন্ত্রণের পথে না বলে কমছে এবং প্রবণতা নিম্নমুখী বলে মত দিয়েছেন।
তবে বিদেশ গমনেচ্ছু বাংলাদেশি যাত্রীদের স্ক্রিনিং টেস্ট বা করোনা পরীক্ষার সংখ্যার কারণে দেশের করোনা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি এই পরিসংখ্যানের কারণে করোনা নিয়ন্ত্রণের যে ধাপ, সেটা নির্ণয়েও সমস্যা হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরীক্ষা অনুপাতে মোট শনাক্তের যে পরিসংখ্যান, সেখানে একটা বড় অংশ বিদেশ গমনেচ্ছু বাংলাদেশি যাত্রী রয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিদিন যে পরিমাণ নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে, তার মধ্যে এসব যাত্রী ৩৪ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১৪ হাজার ১১৪টি। এর মধ্যে বিদেশ গমনেচ্ছু বাংলাদেশের যাত্রী রয়েছেন ৪ হাজার ৭৭৮ জন। সে হিসাবে মোট নমুনা পরীক্ষার এক-তৃতীয়াংশই এসব যাত্রী। এসব যাত্রীর মাত্র ১-২ শতাংশের শরীরে করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়। বাকিরা পরীক্ষা করেন করোনা সনদের জন্য।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বাংলাদেশ স্বস্তির দিকে থাকবে যদি শনাক্তের হার আরও কমে যায় ও টিকা নিয়ে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে। কারণ টিকা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকা কাজ করে না। নেওয়ার তিন সপ্তাহ পর থেকে কাজ করা শুরু করবে। দ্বিতীয় ডোজ নিলে সম্পূর্ণ কাজ করবে। টিকা নিলেও সংক্রমণ হতে পারে, তবে মারাত্মক পর্যায়ে হবে না। টিকাগ্রহীতা নিজেও সংক্রমিত হতে পারে আবার ছড়াতে পারে। যিনি টিকা নেবেন, তিনি আক্রান্ত হলেও তা মারাত্মক রোগ হবে না, কিন্তু সামান্য আক্রান্ত হলে তিনি ছড়াতে পারবেন। তাই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে।
বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির বর্তমান অবস্থা কী জানতে চাইলে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রবীণ ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের দিকে যাচ্ছে। সেদিনই নিয়ন্ত্রণ বলতে পারব, যখন শূন্যে নেমে আসবে। অন্তত আরও এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। তারপর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যাবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে ৫ শতাংশের কম হলেই সেটাকে পেনডেমিক স্টেজ বলছে, সেখানে আমরা ২ শতাংশের ঘরে চলে এসেছি। সুতরাং ধরে নিতে পারি আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণে অনেকটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছি।
অবশ্য করোনা সংক্রমণ কমার পেছনে এই ভাইরোলজিস্ট ভাইরাসের জীনগত বৈচিত্র্যই মূল কারণ বলে মনে করছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে করোনা কমছে ভাইরাসের নিজস্ব বংশ বৈচিত্র্যের কারণে। দেশে করোনাভাইরাস নিজে নিজেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে। ভাইরাসের একটা পপুলেশন আছে। সেখানে ওদের মিথস্ক্রিয়া হয়েছে। অনেক ভাইরাস থাকে। এখন দেশীয় ভাইরাসগুলো এত প্রবল যে করোনাভাইরাস এখানে সুবিধা করতে পারছে না। নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এখন যে টিকাদান কর্মসূচি চলছে, সেটাও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে যুক্ত হবে।
তবে এই পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণের পথে বলতে নারাজ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রণের পথে বলা যাবে না, কমছে, প্রবণতা নিম্নমুখী। বাংলাদেশে যদি আরও দুই সপ্তাহ ৫ শতাংশের নিচে থাকে, তখন আমরা বলতে পারব যে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বন্ধ হয়ে ক্লাস্টার ট্রান্সমিশনে অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণে একধাপ উন্নতি হলো। তারপর সংক্রমণ শনাক্তের হার যদি একের নিচে চলে যায় এবং সেটার দুই সপ্তাহ পর ছিটেফোঁটা ট্রান্সমিশন বলা যাবে। এরপর যদি শনাক্ত দুই সপ্তাহ শূন্যে থাকে, তখন সেটাকে বলা যাবে দেশে করোনা নেই, কিন্তু দেশের বাইরে আছে। আর যদি আবার ৫ শতাংশের ওপরে ওঠে বা আরও বেড়ে যায়, তাহলে আবার করোনার প্রাদুর্ভাবে পড়ব।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা কখন কোন দেশকে করোনামুক্ত বলতে পারে জানতে চাইলে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এটা কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। কোনো দেশে যদি শনাক্তের হার দুই সপ্তাহ শূন্যের ঘরে থাকে, তখন সে দেশ তৃতীয় সপ্তাহে গিয়ে বলতে পারবে দেশে এই মুহূর্তে করোনা নেই। কিন্তু বিশে^র অন্য দেশে আছে, অর্থাৎ মহামারী প্রবণতার মধ্যে আছে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, মহামারীর সময় কোনো দেশে যখন কোনো রোগী থাকে না, তখন সেই দেশে সেই রোগটি নিয়ন্ত্রণে বলা যায়। এটা ‘স্টেজ-১’। স্টেজ-২ হলো ছিটেফোঁটা সংক্রমণ, স্টেজ-৩ হলো ক্লাস্টার বা গুচ্ছ গুচ্ছ সংক্রমণ (যেমন টোলারবাগ, শিবচরে ছিল), স্টেজ-৩ হলো কমিউনিটি ট্রান্সমিশন। যখন সংক্রমিত হয় গণহারে, কেউ বুঝতে পারে না কোথা থেকে রোগটি ছড়াচ্ছে।
এই বিশেষজ্ঞের হিসাবমতে, এখনো দেশ করোনা নিয়ন্ত্রণের কোনো স্টেজের মধ্যে নেই। আরও দুই সপ্তাহ যদি সংক্রমণ ৫ শতাংশের নিচে থাকে, তখন আমরা নিয়ন্ত্রণের তৃতীয় ধাপে পৌঁছাব। অর্থাৎ ক্লাস্টার ট্রান্সমিশন লেভেল শুরু হবে।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, তৃতীয় ধাপে পৌঁছালে আরও সতর্ক থাকতে হবে। এখন যে সার্ভিলেন্স আছে, সেটাকে আরও জোরদার করতে হবে। তখন ক্লাস্টারগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে, সেগুলোকে ঘেরাও করে রোগীদের চিকিৎসা, আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। এগুলো আমরা প্রথম থেকে করছিলাম। কিন্তু শতভাগ করতে পারলাম না। সে সময় সংক্রমিত এলাকাগুলো সংক্রমণমুক্ত করতে আগের মতোই ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিদেশ গমনেচ্ছুদের যে পরীক্ষা, সেই সংখ্যা বা হার করোনা নিয়ন্ত্রণে একটু নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ যারা বাইরে যায়, তাদের মধ্যে অসংক্রমিত লোক বেশি থাকে।
একইভাবে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, করোনা নিয়ন্ত্রণে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার যে হিসাবে, সেটা মহামারীর সময় ধরা যাবে না। এসব নিয়ম মানাও যাবে না। বলতে হবে যে মূলত দেশে সংক্রমণ সংখ্যা কমছে, সারা পৃথিবীতেও কমছে। তবে পৃথিবীর বহু দেশে সংক্রমণ রয়ে গেছে। সুতরাং আমাদের এখনো সাবধানতা অবলম্বন করে যেতেই হবে। যেকোনো সময় সংক্রমণের মিউটেশন বা নতুন ধরন ঢুকে সংক্রমণ সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে। এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে।
এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া এবং পৃথিবীর অনেক দেশেই সংক্রমণ কমছে। এটা খুবই চিরাচরিত একটা লক্ষণ। কিন্তু আমাদের সবাইকে সাবধান হতে হবে। মনে রাখতে হবে করোনাভাইরাস অনবরত পরিবর্তন হয়। যেহেতু বিশ্বব্যাপী ট্রাভেল বেড়ে গেছে, মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা কম, যেকোনো সময় আবার বেড়ে যেতে পারে। বলা হয় যে করোনাভাইরাসের সামান্যতম সংক্রমণও যদি কোনো দেশে হয় বা থাকে, তাহলে কেউ নিরাপদ নয়। আমাদের দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়ে গেছে, টিকা নিতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, সাবধানে থাকতে হবে। তবেই আমরা একটা ভালো অবস্থানে যাব। আমরা ভালো পর্যায়ে আছি। তবে সেটাতে আশ^স্ত হয়ে বসে থাকা যাবে না। আমাদের সাবধানতা অবশ্যই অবলম্বন করে যেতে হবে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, সংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে একজনের থেকে আরেকজনে দ্রুত ছড়াতে পারে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যে সংজ্ঞা সেখানে স্থির থাকা যাবে না।
তবে বিদেশ গমনেচ্ছু যাত্রীরা দেশে করোনার প্রকৃত চিত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা বলে মনে করেন ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, মোট পরীক্ষার ৩৪ শতাংশ বিদেশ গমনেচ্ছুদের ব্যাপারে এই বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যাত্রী স্ক্রিনিং ৫ শতাংশের নিচে থাকতে হবে। সেটা না থাকলে রোগের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে যে সার্ভিলেন্স, সেটার মধ্যে পড়বে না। প্রকৃত সার্ভিলেন্স ডেটা হলো যারা রোগ আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করার জন্য আসে। শনাক্ত সংখ্যা হলো যারা সন্দেহজনক করোনা নিয়ে আসে বা রোগীর নিবিড় সংস্পর্শে আছে, তাদের পরীক্ষা। আর বিদেশযাত্রী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসছে, তাদেরটা স্ক্রিনিং বলা হয়। স্ক্রিনিং পরীক্ষা সার্ভিলেন্স ডেটায় আসে না। এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া যায়। সেখানে ৩৪ শতাংশ অনেক বেশি। এটা আমাদের মোট সার্ভিলেন্সের জন্য অসম্পূর্ণতা।
এই বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে করোনার প্রকৃত চিত্র বের করতে হলে বাকি যে ৬৬ শতাংশ তাদের মধ্যে কত শতাংশ শনাক্ত, সেটা বের করতে হবে। সেই হিসাবে নিয়ন্ত্রণের ধাপ গণনা করা যাবে। তখন আমরা বলতে পারব প্রকৃত অবস্থা কী?
অবশ্য বিদেশ গমনেচ্ছুদের পরীক্ষার ব্যাপারে ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, আমাদের মোট যে সংক্রমণ তার ৯১ শতাংশ লক্ষণবিহীন রোগী। বিদেশ যেতে যারা পরীক্ষা করে, তাদের মধ্যে ১-২ শতাংশ পজিটিভ আসে। সুতরাং এই জনগোষ্ঠীর ফলে মোট শনাক্ত বেশি দেখা যাচ্ছে, তা নয়। এখন দেশের ৬০-৬২টা কেন্দ্রে অ্যান্টিজেন টেস্ট হয়, আরটিপিসিআর হয় ৬০-এর বেশি কেন্দ্রে।