আধুনিক ও পরিকল্পিত নগর বিনির্মাণে ১৯৬১ সালে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) গঠন করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কেডিএ বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে খুলনার উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু বিগত দুই দশকে খুলনার উন্নয়নে কেডিএর উন্নয়নকাজ যেন মুখ থুবড়ে পড়েছে। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, এই সময়কালেই দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পনগরী খুলনার উল্লেখযোগ্য অংশ প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, কাজ হারিয়ে শ্রমিক পরিবারগুলোর অন্যত্র চলে যাওয়া এবং ব্যবসার সুযোগ কমে যাওয়ায় এই সময়ে খুলনার জনসংখ্যাও কমে যায়। দেশের তৃতীয় বৃহত্তম মহানগর খুলনার জনসংখ্যা ২০০০ সালে ছিল ১২ লাখ ৪৭ হাজার; ২০১৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৩৫ হাজারে (সূত্র : ইউএন হ্যাবিট্যাট)। বিগত কয়েক বছরে খুলনা এবং এর আশপাশে সরকারের কিছু বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, কেডিএ এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) উন্নয়ন কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে খুলনায় আবার উন্নয়নের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। কিন্তু খুলনার নাগরিক সমাজের অভিযোগ খুলনা উন্নয়ন
কর্তৃপক্ষ ও খুলনা সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং বিভিন্ন প্রকল্পে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে একদিকে যেমন সময়মতো প্রকল্প শেষ হচ্ছে না কিংবা কাজের মান যথাযথ হচ্ছে না, তেমনি অন্যদিকে জনজীবনে সৃষ্টি হচ্ছে ব্যাপক ভোগান্তি।
গত সপ্তাহে খুলনা প্রেস ক্লাবের হুমায়ুন কবির বালু মিলনায়তনে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির নেতারা এক সংবাদ সম্মেলনে মহানগরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির নানা অভিযোগ তুলে ধরে। তাদের অভিযোগ নগরে পরিকল্পিত রাস্তা ও ড্রেন ছাড়াই যত্রতত্র ভবন গড়ে উঠেছে। কেডিএর তৈরি আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকাগুলোও নির্মাণ করা হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে। সোনাডাঙ্গা ও নিরালা আবাসিক এলাকার একটি ফেজেও গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মুজগুন্নী মহাসড়কের দুই পাশে বাণিজ্যিক প্লট তৈরি করলেও মূল সড়কে আসার জন্য কোনো সংযোগ সড়ক তৈরি করেনি কেডিএ। দৌলতপুরে কেডিএ’র কল্পতরু মার্কেটে অবাধে গরু চরে, রূপসায় কেডিএ মার্কেটের অবস্থা জরাজীর্ণ এবং নিউ মার্কেটের পেছনের সড়কটি ড্রেন ছাড়া ও ভাঙাচোরা। এসব বিষয় এখন নগরের মানুষের চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি কেডিএ’র অবরাদ্দকৃত ৩১টি প্লট সংস্থাটি নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। তাদের অভিযোগ ২০০০ সালের পরে কেডিএ যে সংযোগ সড়কগুলো তৈরি করেছে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সড়ক নির্মাণ করায় সেসব এখন মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুলনার উন্নয়নে জনপ্রতিনিধিত্বশীল খুলনা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কেডিএর কাজের সমন্বহীনতার কারণে অপরিকল্পিত নগরায়ণ হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন খুলনার নাগরিক সমাজের নেতারা। সংগত কারণেই এসব অভিযোগ নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত কর্তৃপক্ষের।
অন্যদিকে, দেখা যাচ্ছে খুলনা সিটি করপোরেশনের রাস্তাঘাট, ফুটপাত ও ড্রেন নির্মাণের বিভিন্ন প্রকল্পও সময়মতো শেষ হচ্ছে না। খুলনা সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে মহেশ্বরপাশা, খালিশপুর ১৮ নম্বর রাস্তার (ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের সামনে) ১ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার, চরেরহাট মেইন রোডের ১ দশমিক ৬২ কিলোমিটার সড়ক কার্পেটিং ও আরসিসি ড্রেন নির্মাণ এবং টাইলস দিয়ে ফুটপাত উন্নয়নের উদ্যোগ নেয় কেসিসি। ২০১৯ সালের ১২ জুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এ কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যা বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২০ সালের ৩১ মার্চ। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রথম দফায় কাজ শেষ করতে না পারায় মেয়াদ বাড়িয়ে সেটা ২০২১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত এক বছর বৃদ্ধি করা হয়। এ প্রকল্পে ড্রেন ও ফুটপাতের কাজ প্রায় শেষ হলেও প্রায় দুই বছরেও মাত্র তিন কিলোমিটার সড়কের কার্পেটিং শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি। খুলনার নাগরিক সমাজের নেতাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দায়বদ্ধতার অভাবে প্রকল্পটিতে এই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ করতে না পারায় এখন বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (বিএমডিএফ) তাদের আওতাধীন প্রকল্পটিতে ওই ঠিকাদারকে দেওয়া সড়ক কার্পেটিংয়ের কার্যাদেশ বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। দেরিতে হলেও এমন ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত কমই বটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যথাযথ নজরদারি করা হলে দুই বছরেও এত ছোট একটি প্রকল্প শেষ না হওয়ার কথা না। এমতাবস্থায় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের উচিত এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সমন্বয় নিশ্চিত করে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর যথাযথ তদারকিতে মনোযোগ দেওয়া। তাহলেই কেবল উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে জনভোগান্তির অবসান হবে এবং ভবিষ্যতের আধুনিক খুলনা মহানগর গড়ে তোলা নিশ্চিত করা যাবে।