লভ্যাংশ না দেওয়ায় রবির ওপর অসন্তুষ্ট এসইসি

মুনাফা করার পরও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটার ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। গতকাল মঙ্গলবার কোম্পানিটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের ডেকে অসন্তোষ প্রকাশ করে এসইসি।

২০২০ সালে রবির নিট মুনাফা হয়েছে ১৫৫ কোটি টাকা এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৩৩ পয়সায়, যা আগের বছর ছিল মাত্র ৪ পয়সা। গত সোমবার ২০২০ সালের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন যাচাই করে রবির পরিচালনা পর্ষদ লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সদ্য তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রথম বছরে ‘নো ডিভিডেন্ড’ ঘোষণা আসায় রবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কমিশনে ডেকে পাঠানো হয়। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় রবি আজিয়াটার হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স শাহেদ আলমের নেতৃত্বে একটি দল এসইসিতে যায়। এ সময় বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে দুই কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে মুনাফা হওয়ার পরও কেন বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়া হলো না, সে বিষয়ে রবির কাছে ব্যাখ্যা চায় এসইসি। এ বিষয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে এসইসি জানায়, বিনিয়োগকারীরা কিছু না পেয়ে হতাশ। এ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার প্রতিকার কী হতে পারে, তাও জানতে চেয়েছে এসইসি।

বৈঠকে রবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা এর প্রতিকার কী হতে পারে এবং এসইসি যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, এ বিষয় তাদের পরিচালনা পর্ষদকে অবহিত করা হবে। পর্ষদের সঙ্গে কথা বলে কী প্রতিকার হতে পারে, পরে তা বিএসইসিকে জানানো হবে। এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ায় আমরা রবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ডেকেছিলাম। বৈঠকে এসইসির চরম অসন্তোষের বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে। নো ডিভিডেন্ডের প্রতিকার কী হতে পারে, তাও আমরা প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে জানতে চেয়েছি।

এদিকে গতকাল বিকেলে ২০২০ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে লভ্যাংশের বিষয়ে রবি আজিয়াটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, এসইসি মোটেও খুশি নয়। তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের সেন্টিমেন্ট ও ইমোশনের সঙ্গে আমরা একমত। তাদের এ অসন্তোষের বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদকে অবহিত করা হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের যে ডিভিডেন্ড পলিসি আছে, তাতে ৫০ শতাংশ লভ্যাংশ দিলে এটা মাত্র ১ দশমিক ৬ অথবা ১ দশমিক ৭ শতাংশ আসত। এমনকি শতভাগ লভ্যাংশ দিলেও ৩ শতাংশের মতো আসে। রবি যে মুনাফা করেছে, তা দিয়ে কর প্রদানের পর যে লভ্যাংশ দিতে পারতাম তা দিয়ে বিনিয়োগকারীদের খুশি করা যেত কি না তা বিবেচ্য বিষয়। এর পরিবর্তে আমরা লভ্যাংশের টাকাটা যদি পুনর্বিনিয়োগ করি, তাহলে ব্যবসায় ভালো গ্রোথ হবে এবং এটা ভালো রিটার্ন পাওয়া নিশ্চিত করবে। তাই লভ্যাংশ দেওয়ার বদলে ব্যবসায় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বোর্ড। তিনি বলেন, আমাদের বোর্ড অবশ্যই লভ্যাংশ দেবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। সঠিক সময়, সঠিক মুহূর্তে এটা করতে চাচ্ছি। সেটা কত তাড়াতাড়ি হবে, সেটা বলা মুশকিল। কারণ এটা হচ্ছে বোর্ডের ব্যাপার। গতকালের সংবাদ সম্মেলনে রবি জানায়, করোনা মহামারী সত্ত্বেও ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে রবির রাজস্ব বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ১ শতাংশ। চতুর্থ প্রান্তিকে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকাসহ এ বছর রবির মোট আয় ৭ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। এই প্রান্তিকের ৩৯ কোটি টাকাসহ ২০২০ সালে রবির কর-পরবর্তী মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫৫ কোটি টাকায়। আগের বছরের নামমাত্র মুনাফার পর এ অর্জন আশাব্যঞ্জক।

তবে প্রবৃদ্ধির গতিতে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করেছে মোট আয়ের ওপর ন্যূনতম ২ শতাংশ কর। অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে একমাত্র রবিই কোনো প্রণোদনা ছাড়া পুঁজিবাজারে প্রবেশ করেছে। তাই ২০২০ সালে কার্যকর করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ৮ শতাংশে। কোম্পানিটি করের বোঝায় জর্জরিত বলে জানিয়েছেন মাহতাব উদ্দিন। নতুন ১৯ লাখ গ্রাহকসহ ২০২০ সালে রবির সক্রিয় গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ৯ লাখে। যার মধ্যে ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ গ্রাহক ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। গত বছরের তুলনায় ফোরজি গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ। ভয়েস সেবা থেকে রাজস্ব কিছুটা কমলেও ডেটা সেবায় ২০১৯ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেড়েছে।

২০২০ সালে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৪ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা জমা দিয়েছে রবি যা ওই বছরের মোট রাজস্বের ৫৬ শতাংশ। ২০২০ সালে তাদের মোট মূলধনী বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে ওই বছর ৪ হাজার ২৬৩টির বেশি ফোরজি সাইট স্থাপন করেছে। ২০২০ সালের শেষ নাগাদ রবির নেটওয়ার্ক সাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৪৬১টিতে যার মধ্যে ৯৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ ফোরজি সাইট।

রবি আজিয়াটার বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ২১ মার্চ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত হবে। এ সংক্রান্ত রেকর্ড ডেট ৮ মার্চ নির্ধারণ করা হয়েছে।