বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালিয়ে রাজধানীর বাংলামোটরে ফুটপাতে ঘুমন্ত যুবককে (২০) চাপা দিয়ে হত্যা করে ১১ মাস ধরে চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে ঘুরেছেন লরিচালক মো. আল আমিন (২৫)। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনও করছিলেন। নির্বিগ্নে নিয়মিত বড় কাভার্ড ভ্যানও চালাচ্ছিলেন।
এদিকে ঘটনার পর থেকে ট্রাক ও লরিটি আটক থাকলেও এর চালককে শনাক্ত করতে পারছিল না পুলিশ। ঘটনার পর থেকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে দুইবার।
অবশেষে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের ম্যানশন ডিপো থেকে আল আমিনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আল মোমেন। গ্রেপ্তার আল আমিনকে আজ বুধবার আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, বেপরোয়া গতির কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটে। আল আমিন মাঝেমধ্যেই গভীর রাতে চট্টগ্রাম থেকে পাথর বোঝাই লরি চালিয়ে ঢাকার সাভারে পৌঁছে দিতেন। ঘটনার রাতে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালিয়ে ক্লান্ত ছিলেন।
এদিকে গ্রেপ্তারের পর আল আমিন পুলিশকে জানান, একটি রিকশাকে পাশ কাটাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পরে তার লরিটি। ঘটনার পর এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা চট্টগ্রামে চলে যান। আল আমিনের গ্রামের বাড়ি খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি থানার মাস্টারপাড়ায়। তবে চট্টগ্রামের হালিশহরে পরিবার নিয়ে থাকতেন।
উল্লেখ্য, গত বছর ১৩ মার্চ রাত ৩টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটরে বেপরোয়া গতির একটি লরি (চট্ট-মেট্রো ঢ-৮১-১১২৭) ও একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো-ড-৬৭৪৭) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার ফুটপাতে উঠে পড়ে। এ সময় ফুটপাতে এক যুবক ঘুমাচ্ছিলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ির চাপায় গুরুতর জখম হন তিনি। পড়ে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। ঘটনার দিনই পুলিশের এসআই রিপন মিয়া বাদী হয়ে রাজধানীর শাহবাগ থানায় ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনের ৯৮/১০৫ ধারায় মামলা করেন। তবে নিহত যুবকের কোনো পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তার কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়েও পরিচয় শনাক্তে ব্যর্থ হয়।
মামলার বর্তমান তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনার মামলার আসামি গ্রেপ্তারে দীর্ঘ সময় লাগে। তার ওপর নিহত যুবক ভবঘুরে হলে আসামি গ্রেপ্তারের নজির খুবই কম। তবে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি দেখভাল করায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আল মোমেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকায় গাড়িচাপা দিয়ে লোক মারার পরও আল আমিন চট্টগ্রামে নিয়মিত গাড়ি চালাত। গ্রেপ্তারের পর সে ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। সে জানিয়েছে, এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হবে বলে তার ধারণাই ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, মামলাটির কোনো কূলকিনারা পাওয়া যাচ্ছিল না। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও অস্পষ্ট ছিল। তবে প্রযুক্তির সহায়তায় লরিটির মালিক ও চালককে শনাক্ত করা হয়। ট্রাকটির কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। ফলে এখনো মালিক চিহ্নিত করা যায়নি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নাভানা জহির স্কয়ার মার্কেটের নিরাপত্তা প্রহরী শংকর দাশ ও রিয়াজ উদ্দিন জানান, ঘটনার রাতে একটি পাটের চটের ওপর কালো স্টাইপের শার্ট পরে ঘুমচ্ছিলেন আনুমানিক ২০ বছর বয়সী এক ভবঘুরে। এ সময় দ্রুতগতির দুটি গাড়ি শাহবাগ থেকে বাংলামোটর আসার পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে তুলে দিলে বিকট শব্দ শুনে দৌড়ে এসে দেখেন ঘুমন্ত ওই যুবকের পুরো শার্ট রক্তে ভিজে আছে। তাকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাই। প্রতি রাতেই ওই যুবক ফুটপাতে ঘুমাত। তার পরিচয় সম্পর্কে জানা নেই।
ডিএমপির রমনা বিভাগের রমনা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (এসি) এস এম শামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যেসব ভবঘুরে ছিন্নমূল মানুষ ঘুমায় তারা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। মাঝেমধ্যেই গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের চাপা দেয়। এতে প্রাণহানিও ঘটে। তবে এসব ক্ষেত্রে খুব কমই গাড়ির চালক গ্রেপ্তার হয়। আমরা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি গাড়ির চালককে গ্রেপ্তার করেছি। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’