কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশে দুটি আলোচিত হত্যা মামলার রায় হলো। প্রথমটি জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার রায়। দ্বিতীয়টি বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যার মামলার রায়। দীপন হত্যা মামলায় সেনাবাহিনীর চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকসহ আট জঙ্গির সবাইকে মৃত্যুদন্ড দেয় আদালত। আর অভিজিৎ হত্যা মামলায় অভিযুক্ত পাঁচ জঙ্গিকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে আদালত। সঙ্গে অভিজিৎ হত্যায় প্ররোচনা দেওয়ায় একজনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ। দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত-সমালোচিত হত্যাকান্ড দুটি একই সূত্রে গাঁথা। তেমনি দুটি হত্যা মামলার রায়েই আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে তাও প্রায় একই চেতনা ও মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত। দীপন হত্যা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছিল ‘যারা বই প্রকাশের দায়ে মানুষ হত্যা করতে পারে, তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের শত্রু। দীপনের হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ করে দেওয়া।’ অন্যদিকে, অভিজিৎ হত্যা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয় ‘নাস্তিকতার অভিযোগ এনে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের অভিযুক্ত সদস্যরা সাংগঠনিকভাবে অভিজিৎকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। স্বাধীনভাবে লেখা ও মতপ্রকাশের কারণে জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয় অভিজিৎকে।’ এই রায়ে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি মুক্তমনারা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশে সাহস পাবে বলে উল্লেখ করা হয় রায়ের পর্যবেক্ষণে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পদার্থবিদ অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ রায় যুক্তরাষ্ট্রে বাস করতেন। বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখি ও ‘মুক্তমনা’ ব্লগ সাইট পরিচালনা করতেন তিনি। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৮টার দিকে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকার ফুটপাতে জঙ্গিদের চাপাতির কোপে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান অভিজিৎ। স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে চাপাতির কোপে গুরুতর জখম হন এবং হাতের একটি আঙুল হারান তার স্ত্রী বন্যা। মামলার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন অভিজিতের স্ত্রী বন্যা। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে গণমাধ্যমে বলা হয়, বন্যাকে সাক্ষ্য দিতে আসতে সমন দেওয়া হয়েছে। তবে গত বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্যা জানান, মামলায় সাক্ষ্য দিতে বাংলাদেশের কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। রায়ের পর ফেইসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে বন্যা বলেন, এ রায়ে তিনি পুরো সন্তুষ্ট নন। এছাড়া বন্যা তাদের বইমেলায় আমন্ত্রণ জানানো ব্যক্তিদের জিজ্ঞসাবাদ ও মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। দীপন হত্যা মামলার রায়ের পর উচ্চ আদালতে বিচার দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছিলেন তার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। দেশে জঙ্গি হামলার বিভিন্ন ঘটনার অতীত দৃষ্টান্ত আমলে নিলে সন্তানহারা এই পিতার আশঙ্কাকে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে দীপন ও অভিজিৎ হত্যা মামলার রায় কার্যকরের বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মামলা দুটিতে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ প্রয়াস গ্রহণ করা দরকার।
স্মরণ করা যেতে পারে, মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের দাবিতে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালেই ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে খুন করা হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে জঙ্গি হামলার শিকার হন মুক্তমনা লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও অধিকারকর্মীরা। তবে, তারও প্রায় এক দশক আগে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং খ্যাতনামা কবি-লেখক হুমায়ুন আজাদ হত্যাচেষ্টার ঘটনাও অনেকটা একই সূত্রে গাঁথা। এসব ঘটনায় সারা দেশে তুমুল প্রতিবাদন্ডবিক্ষোভ সত্ত্বেও জঙ্গি তৎপরতার রাশ টেনে ধরা যায়নি। যার ফলে একের পর এক জঙ্গি হামলার শিকার হয়ে নিহত হন কিংবা হত্যাচেষ্টার শিকার হন দেশে নানা ক্ষেত্রের বিশিষ্ট লেখক-কবি-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীরা। এখন প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন এবং বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার দৃষ্টান্তমূলক রায়ের সূত্র ধরে সাম্প্রতিক অতীতের এই জাতীয় ঘটনাগুলোর অমীমাংসিত বিচারিক প্রক্রিয়া নিষ্পত্তির দিকে নিয়ে যেতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আন্তরিক হওয়া উচিত।
খেয়াল করা দরকার দুটি হত্যা মামলাতেই আদালত বলেছে হত্যাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ করে দেওয়া। একটা সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেবল জঙ্গি হামলাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করেই সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এজন্য সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও উদার ও সহনশীল হতে হবে। একই সঙ্গে ভাবতে হবে একটা দেশে কীভাবে বহু মতাদর্শের মানুষের সামাজিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা যায়। কেননা, সমাজ ও রাষ্ট্রের সব পরিসরে মানুষের মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা না গেলে কখনোই সাংস্কৃতিক কিংবা সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত হবে না।