আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে ফেরা

পৃথিবীতে সর্বোচ্চ মাত্রার আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের ঘটনা খুব বেশি নয়। ২০১৯ সালে নিউজিল্যান্ডের হোয়াইট আইল্যান্ডে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণ ছিল সর্বোচ্চ মাত্রার। সে আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে ফেরা মানুষের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা

হঠাৎ প্রচন্ড বিস্ফোরণ

২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় দুপুর ২টা নাগাদ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিউজিল্যান্ডের হোয়াইট আইল্যান্ড আগ্নেয়গিরিতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্লেন্টি উপকূলে হোয়াইট আইল্যান্ড অবস্থিত। আধা সক্রিয় এই আগ্নেয়গিরিটি ঘুরে দেখার জন্য প্রায়ই দুঃসাহসী পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকত। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো অন্যান্য আগ্নেয়গিরির তুলনায় এর বিস্ফোরণের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকলেও দ্বীপ ভ্রমণে উৎসাহী পর্যটকদের কাউকেই কোনো সতর্কসংকেত দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি কর্র্তৃপক্ষ। বিস্ফোরণের সময় ৪৭ জন উপস্থিত ছিলেন। ২২ জন বিস্ফোরণে মারা যান। এদের ভেতরে দুজনের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়নি, পরে তাদের মৃত ঘোষণা করা হয়। ২৫ জনকে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়, যাদের বেশির ভাগই ছিল ভীষণ আহত। তাৎক্ষণিক ভূমিকম্প, বিস্ফোরণের ধাক্কাসহ ভারী বৃষ্টিপাত, বিষাক্ত গ্যাসে দূষিত বায়ু এমন অবস্থা করে রেখেছিল, যেখানে সপ্তাহব্যাপী কিছু দেখাই সম্ভব ছিল না। আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞরা এটাকে ফ্রিয়াটিক বিস্ফোরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ফ্রিয়াটিক বিস্ফোরণে ভূ-অভ্যন্তরীণ ম্যাগমা যখন পানির সংস্পর্শে আসে, তখন প্রচণ্ড তাপমাত্রাবাহী ম্যাগমা পানিকে বাষ্পায়িত করে ফেলে। ফলে ভূ-অভ্যন্তরীণ আগ্নেয়গিরির বিষাক্ত গ্যাস আর বাষ্প মিলিত হয়ে ভূমিকম্পের সঙ্গে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটায়। আগ্নেয়গিরির ফ্রিয়াটিক বিস্ফোরণে পৃথিবীর বিরল ঘটনাগুলোর একটি। এতে দুর্যোগের মাত্রা অনেক বিস্তৃত হয়। নিউজিল্যান্ডের হোয়াইট আইল্যান্ডের ঘটনাটি বিশ্বের নবম ফ্রিয়াটিক বিস্ফোরণ।

দেওয়া হয়নি কোনো সতর্কবার্তা

নিউজিল্যান্ড বিশ্বের প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। তাৎক্ষণিকভাবে সেখানকার ভূতাত্ত্বিক বিপদ চিহ্নিত করার জন্য আছে সরকারি প্রতিষ্ঠান জিওনেট (GeoNet)। ঘটনার পর জিওনেটের আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জানা যায়, ‘বিস্ফোরণটি হুট করে দ্রুততম সময়ের ভেতরে ঘটে গিয়েছে। সেখানে আগে থেকে ভূতাত্ত্বিক তথ্য নিয়ে এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।’ কিন্তু সেই কথা মানতে নারাজ সাধারণ নাগরিক এবং ভুক্তভোগীরা। কারণ হোয়াইট আইল্যান্ড নিউজিল্যান্ডের আধা সক্রিয় আগ্নেয়গিরির মধ্যে অন্যতম এবং সেটি যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের আগে সাধারণত অনেকগুলো ছোট ছোট বিস্ফোরণ ঘটে থাকে। তখন কেন লোকদের সতর্ক করা হলো না এটাই জনগণের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। তা ছাড়া ভবিষ্যতে পাশেই অবস্থিত রুপেহু পর্বত এবং টঙারিরো (Tongariro) পর্বতের জন্য এই বিস্ফোরণ হুমকিস্বরূপ। তা ছাড়া দ্বীপে ঘোরাঘুরির সুবিধার্থে অনুসরণের জন্য কোনো সাধারণ নীতিমালাও দেওয়া নেই। পর্যটকদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ ছাড়া এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে আসলেই কিছু করার নেই।  

জ্যাফ হপকিন্স

নিউজিল্যান্ডের ধর্মযাজক জ্যাফ হপকিন্স তার মেয়ে লিলানির সঙ্গে এক দিনের ভ্রমণে দ্বীপটিতে এসেছিলেন। যে জাহাজে করে হপকিন্সদের হোয়াইট আইল্যান্ডে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেটি বিস্ফোরণের সামান্য আগে দ্বীপ ছেড়ে চলে যায়। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গেই নৌকার কর্মীরা সিদ্ধান্ত নেন তারা আবার দ্বীপে ফিরে যাবেন। সেখানে ফিরে অবস্থান করা মানুষদের সাহায্য করবেন। যে কোম্পানি এই ভ্রমণ আয়োজন করেছিল তার নাম হোয়াইট আইল্যান্ড ট্যুরস। ভ্রমণে ব্যবহৃত জাহাজটির ডিজাইন করা হয়েছিল এমনভাবে যেন সৌন্দর্যপিপাসুরা চারপাশের সৌন্দর্য দেখতে পারেন। কিন্তু সেই চরম মুহূর্তে সেটি ভাসমান চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপ নেয়। কিন্তু যখনই নতুন কোনো আহত ব্যক্তি ছোট নৌকায় থেকে জাহাজে ভিড়ছিলেন, তখনই কর্মচারীরা সাহায্য প্রার্থনা করেন। তারা জানান, তাদের আরও ডাক্তার প্রয়োজন। জ্যাফ হপকিন্স এবং তার মেয়ে লিলানি হপকিন্স প্রাথমিক চিকিৎসায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন বলে তারা আহতদের চিকিৎসার জন্য সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন।

জ্যাফ হপকিন্স সেই সময়ের স্মৃতি হাতড়ে বললেন, ‘আমি কখনোই হোয়াইট আইল্যান্ড আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণে আহত মানুষের কান্না ভুলতে পারব না। বিস্ফোরণের পর তাদের নৌকায় করে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিল। ব্যথায় চিৎকার করে কাঁদছিল সেই মানুষগুলো। উত্তপ্ত বাষ্পের মধ্যে আসতেই তাদের মুখের চামড়া খসে পড়েছিল। বাদবাকি অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোও ছিল ফোসকা পড়া, ছিল ছাই আর বাষ্পে মাখামাখি। উদ্ধারকারী দল নৌকায় করে তাদের পাশের ছোট্ট দ্বীপে নিয়ে যায়। অনেক মানুষ শর্টস, টি-শার্ট পরে ছিলেন, যার কারণে তাদের মুখ-হাতের কনুই, কবজি, পা পুড়ে গিয়েছিল। যাদের মুখ পুড়ে গিয়েছিল তাদের পোড়া চামড়া আলগা হয়ে গাল থেকে ঝুলছিল। আঙুল ও কনুইয়ের অবস্থাও ছিল একই রকম। নৌকার কর্মচারীদের অভিব্যক্তি ছিল ভয়াবহ। একে একে আহত লোকরা আসতে থাকলে ভয়ার্ত চোখে-মুখ নিয়ে তারা জানালেন তাদের সব ধরনের সাহায্য দরকার। মারাত্মক আহতদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন আমাদের। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম অনেক মানুষ পানিতে ভাসছেন। অনেকেই দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার জন্য ভয়ে সাঁতার কাটা শুরু করেছিলেন। যে ২৩ জনকে উদ্ধার করা হয়, তারা ছিলেন মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়া। আশপাশে শুধু চিৎকার আর ভয়ার্ত চিৎকার। আহত মানুষের চিৎকারে ভারী হয়ে যাচ্ছিল বাতাস। হুট করেই আমি শুনতে পাই একজন চিৎকার করছেন, ‘বাঁচাও! আমি আগুনে পুড়ে যাচ্ছি। আমি আগুনে পুড়ে যাচ্ছি।’

২৫ জন মানুষের মধ্যে এক দম্পতি আমার মনে স্থায়ী দাগ কেটে গিয়েছে। ইউরোপিয়ান নববিবাহিত এই দম্পতি ম্যাথিউ উরেই এবং লরেন বার্হাম তাদের মধুচন্দ্রিমার রাত স্মরণীয় করার জন্য ভার্জিনিয়ার রিচমন্ড থেকে এই দ্বীপে এসেছিলেন রয়েল ক্যারিবিয়ান এক জাহাজে চড়ে। আমি মেয়েটাকে তার নাম জিজ্ঞেস করলাম। দুজনের পদবি আলাদা হওয়ায় তিনি তার নাম বলতে সংকোচবোধ করছিলেন। তখন বার্হামের স্বামী তাকে দেখিয়ে বললেন, ‘ও আমার স্ত্রী।’ ঠিক সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা জিজ্ঞেস করল, ‘আমার স্বামী কেমন আছে?’ এটি শুনে ম্যাথিউ জিজ্ঞেস করল, ‘আমার স্ত্রী কেমন আছে?’ তাদের ভালোবাসা আমাকে দারুণভাবে স্পর্শ করেছে। আমি প্রার্থনা করছিলাম যেন তারা দুজনেই সেরে ওঠেন। এক একজন করে লোকের কাছে যাচ্ছিলাম আর মৃত্যুপথযাত্রীদের অভয় দিয়ে বলছিলাম তোমরা মারা যাবে না। লরেন জানালেন এটা তার জীবনের সবচেয়ে বাজে দিন। উত্তরে আমাকে অভয় দিয়ে বলতে হচ্ছিল, হ্যাঁ সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তোমার এখনো জীবন থেকে পাওয়ার অনেক কিছু আছে। মেয়েটি নিরাশ কণ্ঠে উত্তর দিল, ‘আমার মনে হচ্ছে না আমি আসলে বাঁচব।’ আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে জোর গলায় বললাম, ‘তুমি পারবে। তুমি শক্তিশালী। তুমি যোদ্ধা। তুমি অবশ্যই এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। তোমার একটা ভবিষ্যৎ আছে।’ উরে ও বার্হামকে আলাদা দুটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। একজনকে ক্রাইস্টচার্চে এবং আরেকজনকে অকল্যান্ডে।

নিউজিল্যান্ডে চারটি বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটের সবগুলোই প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত থাকে। ম্যাথিউয়ের মা, জ্যানেট উরেই-এর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি বললেন, ‘এটি আমার জীবনের হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি। দিনটি ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। কিন্তু আমি খুব পজিটিভ থাকার চেষ্টা করে গিয়েছি পুরোটা সময়। নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হয়েছে যখন ম্যাট জানিয়েছেন আমার ছেলে ভালো আছে। আমাদের সঙ্গে সেখানে অনেক পরিবারই ছিল যারা তাদের স্বজনদের কোনো সংবাদই পাচ্ছিল না। জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে ঝুলে থাকা প্রতিটি মুহূর্তকে তখন খুব দামি মনে হচ্ছিল।’

একটানা তিনি বলে গেলেন, ‘আমার ছেলের শরীরের ৩৩% পুড়ে গিয়েছিল। শরীরের অনেক স্থানেই ছিল পোড়া দগদগে ঘা। সেখানে প্লাস্টিক সার্জারি বা স্কিন গ্র্যাফটিং করা দরকার হচ্ছিল। কত স্বপ্ন নিয়ে সে এই ভ্রমণে গিয়েছিল। কত প্ল্যান করে তারা দুজনে ভ্রমণটিকে আনন্দদায়ক করতে চেয়েছিল, যাতে তাদের মধুচন্দ্রিমা আরও নিখুঁত হয়ে ওঠে।’ আর আমি মনে মনে ভাবছিলাম একটা আনন্দভ্রমণ কীভাবে জীবনকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারে! লরেনের মা বারবারা বার্হামের সঙ্গে কথা বলতে গেলে জানলাম তিনি তখন প্লেনে। নিউজিল্যান্ডে উড়ে আসছেন তার মেয়েকে এক ঝলক দেখার জন্য। তখনো তিনি জানেন না তার মেয়ে কেমন আছে। দুজন মা-ই ইউরোপ থেকে সন্তানের জন্য পাগলের মতো ছুটে আসছেন। তারা নিজেরাও জানেন না তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে।

স্টিফানি ব্রাউইট

২৩ বছর বয়সী স্টিফানি ব্রাউইট তখন মাত্র মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়েছেন। হুট করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বোনের জন্মদিন পালন করতে নিউজিল্যান্ডে যাবেন তারা। বাবা পল ব্রাউইট তার দুই মেয়ে স্টিফানি আর ক্রিস্টালকে সঙ্গে নিয়ে মুহূর্তের সিদ্ধান্তে আগ্নেয়গিরি দেখার জন্য হোয়াইট আইল্যান্ডের জাহাজে চেপে বসেন।  সেটি ছিল এক দিনের ভ্রমণ। বাবা-মেয়ের খুনসুটিতে খুব আনন্দদায়ক সময় কাটছিল তাদের। যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা বিস্ফোরণের সেই নারকীয় মুহূর্তের মুখোমুখি হলেন।

স্টিফানির ভাষায়, ‘যখন দ্বীপটিতে নামলাম তখন দ্বীপের সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। অনেকগুলো গ্যাস পকেট ছিল দ্বীপটিতে, যা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ক্রিস্টালের উদ্ধার করা ফোন থেকে যে ছবিগুলো পেয়েছিলাম তাতে স্পষ্ট প্রমাণ ছিল যে, ট্যুর গাইডরা জানতেন আমরা বিপদের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। কিন্তু তারা স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। ক্রিস্টালকে তিনি বলছিলেন, কিছু কারণে আমাদের ট্যুর সংক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছে। বিস্ফোরণের ওই মুহূর্ত চলে এলে আমি শুনলাম আমাদের ট্যুর গাইড দৌড়াও বলে চিৎকার করছেন। মুহূর্তের মধ্যে আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না আমি কী করব। ক্রিস্টালের ফোনে শেষ সময়টুকুর ভিডিও আছে। ভিডিও দেখলে বোঝা যায় ক্রিস্টাল দৌড়াচ্ছে, বিস্ফোরণের পর পড়ে যাচ্ছে। এ অংশটুকু দেখে আমি কান্না ধরে রাখতে পারিনি। আমি বেঁচে আছি অথচ তারা বেঁচে নেই কেন এই প্রশ্ন আমাকে কুরে কুরে খায়।’

একটানা তিনি বলে যান, “ক্রিস্টাল আমাদের একটু পেছনে পড়ে যাচ্ছিল। একটু পরপর বাবা আর আমি পেছন ফিরে দেখছিলাম সে কোথায় আছে। কিন্তু ততক্ষণে বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। শক্তিশালী এক ধাক্কায় আমার শরীর উড়ে গিয়ে পড়ল কোনো একখানে। আমি ওই ধাক্কায় গড়িয়ে যাচ্ছিলাম। নিজের ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না তখন। আমি গড়াচ্ছি আর একই সঙ্গে তীব্র উত্তাপে আমার শরীর পুড়ে যাচ্ছে। ভেবেই নিয়েছিলাম আমি এ যাত্রায় বাঁচব না। জীবনে ঘটে যাওয়া দুঃসহ এ ঘটনা আমার জীবন পুরো উল্টাপাল্টা করে দিয়েছে। সে সময় আমি কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। যখন অল্প আলো এসে পড়ল আমি দেখলাম আমার শরীরের চামড়া উঠে গিয়ে গায়ের সঙ্গে ঝুলছে। কিছুক্ষণ পর আমি শুনতে পেলাম আমার বাবা আমার নাম ধরে ডাকছেন। এরপর অনেকক্ষণ আমি আর কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না। আবার ২০ মিনিট পর আমি শুনতে পেলাম বাবা ডাকছেন। আমি ভেবেছিলাম তাকে চিরতরে হারিয়েই ফেলেছি। বাবার ডাক শুনে এত ভালো লেগেছিল তখন! বাবা বারবার ডেকে আসলে আমাকে জাগিয়ে রাখার চেষ্টা করছিলেন। আমি নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম যদি একবার জ্ঞান হারাই আর কখনো আমার জ্ঞান না-ও ফিরতে পারে। শুনলাম আমাদের ঠিক ওপরেই হেলিকপ্টারের শব্দ। বাবা সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিলেন এবং কেউ একজন আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। আমার শরীর মারাত্মকভাবে পুড়ে গিয়েছিল। সেজন আমার কানের কাছে বলে যাচ্ছিলেন, ‘ঠিক হয়ে যাবে, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ শক্তি সঞ্চয়ের প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম আমি।

ফাকেটনে হাসপাতালে তিন সপ্তাহ কোমায় ছিলাম। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে গত বছর মে পর্যন্ত আমি হাসপাতালে ছিলাম পুরোটা সময়। কোমা থেকে জ্ঞান ফিরলে আমি জানতে পারলাম আমার বাবা এবং বোন দুজনকেই হারিয়েছি। আমি মাঝে মাঝে পাগলের মতো হয়ে যাই তাদের কষ্টের কথা চিন্তা করলে। এ ঘটনা মনে পড়লে আমি ভীষণ কষ্ট পাই।

হাসপাতালের প্রতিটি দিন আমি বেঁচে ছিলাম আমাদের কুকুর আর্লোর দিকে তাকিয়ে। এখন আমি, আমার মা আর আর্লো ছাড়া আমাদের পরিবারে আর কেউ নেই। নিউজিল্যান্ডে যাওয়ার ছয় মাস আগে আমরা আর্লোকে এনেছিলাম। আর্লো তখন খুব ছোট ছিল। ভ্রমণের আগে দুই সপ্তাহের জন্য আমরা ওকে ক্যানেলে (পরিবারের অবর্তমানে কুকুর দেখে রাখার জন্য নির্দিষ্ট স্থান) রেখে গিয়েছিলাম। আমরা তখনো জানতাম না দুই সপ্তাহের মেয়াদ এত বেশি হয়ে যাবে। পোড়া ক্ষত শুকিয়ে আসার সময় আমি ভেবেছিলাম আর্লো আমাকে আর চিনতে পারবে না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আমার কণ্ঠ শুনেই সে দৌড়ে চলে আসে। আমি বেঁচে আছি আর্লোর জন্য। ক্রিস্টাল চেয়েছিল ভেটেরিনারি নার্স হবে। সেজন্য আর্লোকে আমাদের কাছে এনেছিলাম। আর্লো আমার কাছে আমার বোনের প্রতিচ্ছবি। যখনই আমি আর্লোর দিকে তাকাই আমি তার চোখে আমার বাবা আর বোনকে দেখতে পাই।”