ভোজ্য তেলের দামে ব্যবসায়ীদের চাওয়াকেই প্রাধান্য দিল সরকার। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় আমদানি পর্যায়ে ৩ স্তরের ভ্যাটের পরিবর্তে এক স্তরের ভ্যাট নির্ধারণের সুপারিশ করেছিল ট্যারিফ কমিশন। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দাম বাড়ানোর মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে হলো। গতকাল বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে পণ্য বিপণনসংক্রান্ত সরকারি ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির বৈঠকে নতুন দাম নির্ধারিত হয়। নতুন দাম অনুযায়ী, প্রতি লিটার সয়াবিন (খোলা) মিলগেটে ১০৭ টাকা, পরিবেশক মূল্য ১১০ টাকা এবং খুচরা মূল্য ১১৫ টাকা। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন মিলগেট মূল্য ১২৩ টাকা, পরিবেশক মূল্য ১২৭ টাকা ও খুচরা বিক্রয়মূল্য ১৩৫ টাকা। পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন মিলগেট মূল্য ৫৯০ টাকা, পরিবেশক মূল্য ৬১০ টাকা এবং খুচরা বিক্রয়মূল্য ৬৩০ টাকা। প্রতি লিটার পাম সুপার (খোলা) মিলগেট মূল্য ৯৫ টাকা, পরিবেশক মূল্য ৯৮ টাকা ও খুচরা বিক্রয়মূল্য ১০৪ টাকা।
বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিতভাবে সভা করে ভোজ্য তেলের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করা হবে। পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে পর্যাপ্ত মজুদ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে কোনো অবস্থাতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট না হয়। এ জন্য সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত ছয় মাসে তেলের দাম ৬৫ শতাংশ বেড়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘শিপিং কস্টও বেড়েছে। এ ছাড়া জাহাজের তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছে। অপরিশোধিত সয়াবিন ও পামতেলের আমদানিতে আরোপিত ভ্যাট ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় আরও বেশি যৌক্তিক হারে নির্ধারণের জন্য ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে রাজস্ব বোর্ডকে অনুরোধ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভ্যাট নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে না পারায় দাম বাড়াতে হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে যে দাম রয়েছে তাতে সরকার এই খাত থেকে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ইতিমধ্যে পূরণ করে ফেলেছে। দেশের স্বার্থে এনবিআর চাইলে এক স্তরের ভ্যাটে ফিরে যেতে পারত। যেহেতু ভ্যাট কমছে না অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি তাই ব্যবসায়ীদের লোকসান হবে এ কথা চিন্তা করে দাম বাড়ানো হয়েছে।’
২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করে। তখন ভোজ্য তেল আমদানির ওপর এক স্তরের পরিবর্তে তিন স্তরের শুল্ক আরোপ করা হয়। ওই অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম স্বাভাবিক ছিল। ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারেও দাম বাড়তে থাকে। গত বছরের শুরুর দিকে একবার ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এক স্তরের ভ্যাট নির্ধারণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। করোনাকালে বিশ^বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হলে ওই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।
গত বছরের অক্টোবর থেকে বিশ^বাজারে আবারও সয়াবিনের দাম বাড়তে থাকে। নভেম্বরে দেশের বাজারে সয়াবিনের দাম বাড়ানোর আবেদন করে আমদানিকারকদের সংগঠন ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য ট্যারিফ কমিশনকে নির্দেশনা দেয়। গত ১১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজার পর্যবেক্ষণ করে কমিশন একটি প্রতিবেদন দেয়।
ট্যারিফ কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। বর্তমানে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ১ হাজার ২০০ ডলার এবং অপরিশোধিত পাম অয়েল ১ হাজার ১৮০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। কমিশন মনে করছে, প্রতি লিটারে খোলা সয়াবিন তেলের মিলগেট মূল্য ৯৭, পরিবেশক মূল্য ১০১ ও খুচরা মূল্য ১০৯ টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে। প্রতি লিটারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের মিলগেট মূল্য ১১২, পরিবেশক মূল্য ১১৬ ও খুচরা মূল্য ১২৪ টাকা নির্ধারণ করা যেতে পারে।