পুরুষের অভিবাসন ব্যয় বাড়লেও কমছে নারীর

পুরুষদের অভিবাসন ব্যয় বাড়লেও কমছে নারীদের। তবে সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় হয়েছে মানব পাচারসহ নানা কারণে। কুয়েতে বাংলাদেশি এমপি পাপুল আটকের ঘটনায় সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ঘটনা । দেশটিতে অভিবাসী ব্যয় প্রকৃত খরচের তুলনায় দেশটিতে ৪২১ শতাংশ বেশি ব্যয় হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বাহরাইনে যেতে প্রকৃত খরচের চেয়ে বেশি ব্যয় হয়েছে ৩৮৭ শতাংশ। পর্যায়ক্রমে কাতারে ৩৭২ শতাংশ, ওমানে ৩২৩, লেবাননে ৩১২, জর্দানে ৩০৮, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৯১ ও সৌদি আরবে ২৮৭ শতাংশ বেশি খরচ হয়েছে। এ সময় গতকাল নারী অভিবাসনবিষয়ক এক ওয়েবিনারে এমন মতামত তুলে ধরেন বক্তারা।

অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ), গবেষণা সংস্থা র‌্যাপিড ও দৃষ্টি রিচার্স সেন্টার যৌথভাবে এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে। ‘বাংলাদেশের অভিবাসন ও লিঙ্গ : একটি অনিয়মিত প্রকৃত দৃশ্যপট’ শীষক ওয়েবিনারে পাঁচটি জেলার ওপর পরিচালিত জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন। ইআরএফ সভাপতি শারমিন রিনভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম। বক্তারা বলেন, অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি প্রবাসী আয়। ধীরে ধীরে নারী অভিবাসন বাড়লেও যথাযথ তথ্যের অভাবে বিদেশে গিয়ে নির্যাতন ও ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থার উন্নয়নে নারীদের বিদেশে নেওয়ার আগে কোন কাজের জন্য নেওয়া হচ্ছে সে বিষয়ে প্রকৃত তথ্য দিতে হবে। যে কাজের জন্য নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি সময় নারীদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা খুব কম থাকলেও ২০০৪ সাল থেকে তা বাড়ছে। আর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগের পর থেকে এটা নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। যদিও নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে এখনো সামাজিক বাধা রয়েছে। আর এ কারণে ঢালাওভাবে প্রবাসী নারীদের বিষয়ে নেতিবাচক প্রচারণা না করে ইতিবাচক ঘটনাও তুলে ধরতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীন বলেন, একটি নির্যাতনের ঘটনাও আমরা টলারেট করি না। তবে যারা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের অধিকাংশ নির্যাতিত হওয়ার বিষয়টি ঠিক না। দেশ বিবেচনায় বাংলাদেশের নারী অভিবাসন খুব কম। এর অন্যতম কারণ আমাদের সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত। সমাজ বাস্তবতা বিবেচনায় একজন পুরুষ যত সহজে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, একজন নারী পারেন না। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে একজনের দেখাদেখি আরেক জন বিদেশে যান। যে কারণে সিলেট, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, টাঙ্গাইলের মতো আগে থেকে যেসব এলাকার লোক বাইরে তারাই বেশি যাচ্ছেন। আর উত্তরবঙ্গের লোক বাইরে কম যান।

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, নব্বইয়ের দশকে ৩৫ বিলিয়নের অর্থনীতির বাংলাদেশ এখন ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের দেশ হয়েছে। দেশের অর্থনীতির আকার যত দ্রুত বেড়েছে সেভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের মতো বৈশি^ক চিত্রও এ রকম। এখন দেশ থেকে দক্ষ ও শ্রমিক রপ্তানির ওপর জোর দিতে হবে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৃষ্টি রিসার্চ সেন্টারের প্রিন্সিপাল। ইনভেস্টিগেটর তেরেসা ব্লানশেটের নেতৃত্বে পাঁচটি জেলায় পরিচালিত জরিপের ফল তুলে ধরা হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বরগুনা, পটুয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মানিকগঞ্জ জেলার একটি করে ইউনিয়নের মোট ১২৫টি গ্রামের ৬ হাজার ৮৪৮ খানার ৮ হাজার ৪৩৭ জনের ওপর এ জরিপ করা হয়। যেখানে নারী অভিবাসী ছিলেন ১ হাজার ৩২৭ জন বা ১৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আর পুরুষ ৭ হাজার ১১০ জন। দেশের মোট জনশক্তির ৩৭ দশমিক ১০ শতাংশ থাকেন সৌদি আরবে। আর মোট নারী অভিবাসীর ৭৫ শতাংশ থাকেন দেশটিতে। পুরুষদের অভিবাসন ব্যয় বাড়লেও নারীদের কমছে। অভিবাসীদের ১৪ শতাংশের মতো নারী বিনা খরচে বাইরে গেছেন। পুরুষদের বেলায় যেখানে অনেক বেশি খরচ করতে হয়েছে।

জরিপের তথ্য তুলে ধরে তেরেসা ব্লানশেট বলেন, একটি সময় বাংলাদেশের অভিবাসন বলতে শুধু পুরুষদের বলা হতো। তবে বাংলাদেশ থেকে মোট ৪৪টি দেশে শ্রমিক যান। এর মধ্যে ২২টি দেশে নারীরা যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনটা এসেছে ২০০৪ সাল থেকে। এরপর ২০১৫ সালে সৌদি সরকারের সঙ্গে এক চুক্তির পর ২০১৭ সালে এটি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আর পুরুষদের অভিবাসন ব্যয় বাড়লেও নারীদের ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে কমেছে। যেসব নারী বিদেশে গেছেন তাদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ৮০ শতাংশ আগে গৃহকর্মী ছিলেন। আর ১৬ শতাংশ তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক ছিলেন। তালাকপ্রাপ্ত বা বিধবা নারীদের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি।

জরিপে অন্তর্ভুক্ত এসব জেলার মধ্যে নারী-পুরুষের অনুপাতে সবচেয়ে বেশি নারী বিদেশে আছেন বরগুনা জেলা থেকে। আর সবচেয়ে কম গেছেন বাহ্মণবাড়িয়ার নারীরা।

নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির বলেন, নারীদের বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় সমাজে নানা নেতিবাচক কথা হয়। এসব বাধা পেরিয়ে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের সেবা বাড়াতে হবে। আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও র‌্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক ড. এম আবু ইউসুফ, আইএলওর প্রতিনিধি ইগোর বস প্রমুখ।