কোম্পানীগঞ্জে আ.লীগের দু’পক্ষে সংঘর্ষ, সাংবাদিকসহ গুলিবিদ্ধ ৪

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিবদমান দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে বসুরহাট পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের সমর্থকদের মধ্যে চরফকিরা ইউনিয়নের চাপরাশিরহাট বাজারে ওই সংঘর্ষ বাধে। এতে চারজন গুলিবিদ্ধসহ উভয়পক্ষের কমপক্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন সাংবাদিকও আছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিপেটা ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে পুলিশ।

এদিকে তার অনুসারীদের ওপর হামলার অভিযোগ এনে আজ শনিবার কোম্পানীগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছেন কাদের মির্জা।

সংঘর্ষের পর বসুরহাট পৌরসভার মেয়র ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই আবদুল কাদের মির্জা ফেইসবুক লাইভে এসে অভিযোগ করেন, চাপরাশিরহাটে তার লোকজনের ওপর সাংসদ একরাম চৌধুরী ও নিজাম উদ্দিন হাজারীর লোকজন পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। হামলায় তার অন্তত ৫০ সমর্থক আহত হয়েছে বলেও দাবি করেন সাম্প্রতিক সময়ে নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে দেশব্যাপী আলোচিত কাদের মির্জা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল বিকেল ৫টার দিকে চাপরাশিরহাট পূর্ববাজার এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল। এ সময় সাবেক ওই চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি মিছিল বাজারের দলীয় কার্যালয়ের দিকে যায়। হঠাৎ করে ওই মিছিলে আবদুল কাদের মির্জার সমর্থক জামাল উদ্দিন লিটনসহ কিছু লোক বাধা দেয়। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে বাগ্বিত-া শুরু হয়। একপর্যায়ে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিপেটা ও ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে। আধা ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।

সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হওয়া স্থানীয় সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির নোয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তিনি বার্তা বাজার ডটকম নামে একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের নিজস্ব প্রতিবেদক।

গুলিবিদ্ধ অন্যরা হলেন কামাল উদ্দিন (৫০), বড় রাজাপুর গ্রামের আবদুল ওয়াহিদের ছেলে সাইদুর রহমান (২৬), চরকাঁকড়া ইউনিয়নের সিরাজুল ইসলামের ছেলে নুরুল অমিত (২০) এবং বসুরহাট পৌরসভার আবুল কালামের ছেলে রায়হান (২০)।

অন্য আহতরা হলেন চরফকিরা ইউনিয়নের মো. কাঞ্চন (৬০), মুছাপুর ইউনিয়নের আবুল খায়েরের ছেলে মাসুদ (২৫), চরকাঁকড়া ইউনিয়নের আবদুস সাত্তারের ছেলে কামরুল হাসান (৩০), চরফকিরা ইউনিযনের আবদুল মান্নানের ছেলে ফরহাদ (৪০), বসুরহাট পৌরসভা এলাকার আদনান (২৪), মারুফ (২৫)।

নোয়াখালী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) সৈয়দ মহিউদ্দিন আবদুল আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গুলিবিদ্ধ আহত সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির ও কামাল উদ্দিনের বুকে ও গলায় গুলি লেগে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

সংঘর্ষের পর বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা তার ভেরিফাইড ফেইসবুক আইডিতে লাইভে এসে তার নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ করে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। এ সময় তিনি হামলার ইন্ধনদাতা হিসেবে নোয়াখালীর সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী এবং ফেনীর সাংসদ নিজাম হাজারীর নাম বলেন। পুলিশের ‘সহযোগিতায়’ ওই হামলায় তার অনুসারী ৫০ নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলেও দাবি করেন কাদের মির্জা।

এছাড়া রাত সাড়ে ৯টার দিকে বসুরহাট পৌরসভার হলরুম থেকে তার অনুসারী নেতাকর্মীদের ওপর ‘হামলা’ ও গোলাগুলির প্রতিবাদে কোম্পানীগঞ্জে আজ শনিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচির ঘোষণা দেন কাদের মির্জা। চরপার্বতী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হক তানভির বলেন, হরতালে কোম্পানীগঞ্জে এবং কোম্পানীগঞ্জমুখী সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকবে।

অন্যদিকে সংঘর্ষের বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদল টেলিফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিকেলে আমার বাড়িতে ওবায়দুল কাদেরসহ দলীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের প্রতিবাদে আগামীকালের সংবাদ সম্মেলন বিষয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা চলাকালে বাড়ির বিভিন্ন দিক থেকে অনবরত গুলি আসতে থাকে। এ সময় সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। হামলায় আমার অন্তত ৫০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে।’

সংঘর্ষের বিষয়ে জানতে চাইলে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহিদুল হক রনি গতকাল রাতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ ঘটনাস্থলে অবস্থান করছে। বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এ ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি। পরবর্তী সময়ে এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কাদের মির্জার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন আ.লীগ নেতাদের : সংঘর্ষের আগে গতকাল বেলা ১১টায় কাদের মির্জার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নোয়াখালী সদর ও পৌরসভা আওয়ামী লীগ।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল ওয়াদুদ পিন্টু। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আবদুল কাদের মির্জা একেক সময় একেক রকমের বিবৃতি দিয়ে বেড়াচ্ছে। টেন্ডারবাজি ও নিয়োগ বাণিজ্য সম্পর্কে কাদের মির্জা যেসব বক্তব্য দিয়েছে আমরা তার চ্যালেঞ্জ করছি। সে এগুলোর সত্যতা প্রমাণ করুক।’

তিনি আরও বলেন, ‘আবদুল কাদের মির্জা মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার আগে কখনো আওয়ামী লীগ বা দলের নেতাদের বিরুদ্ধে কিছুই বলেননি। কিন্তু দলের মনোনীত প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই তিনি উন্মাদের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রপরিচালনা থেকে শুরু করে আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা ওবায়দুল কাদের এমপিসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন মন্ত্রী, এমপিসহ নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিম, সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী এমপি, ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী, একরামুল করিম চৌধুরীর স্ত্রী, সন্তানের ওপর কেন এতটা বিরাগভাজন হলেন আমরা তা বুঝে উঠতে পারছি না।’

কোম্পানীগঞ্জ থানার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন কাদের মির্জার : সংঘর্ষের আগে গতকাল সকাল ১০টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার সামনে পূর্বঘোষিত অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন আবদুল কাদের মির্জা। নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি ও ওসি (তদন্তকে) প্রত্যাহারের দাবিতে এবং নোয়াখালীর ‘অপরাজনীতি’ বন্ধের দাবিতে কাদের মির্জা এই কর্মসূচি দেন।

অনুসারীদের লাঠি নিয়ে কর্মসূচিতে আসার আহ্বান কাদের মির্জার : গতকাল বিকেল পৌনে ৩টার দিকে বসুরহাট পৌরসভার হলরুমে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন কাদের মির্জা। সেখানে তিনি পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে আজ শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত থানার সামনে অবস্থানের ঘোষণা দেন। এ সময় তার অনুসারীদের প্রত্যেককে লাঠিসোটা নিয়ে শনিবারের অবস্থানে আসতে বলেন। তিনি বলেন, ‘কোনো অপশক্তির কোম্পানীগঞ্জের মাটিতে স্থান নেই। আমি এদের লিস্ট দেব। এরা কোম্পানীগঞ্জে এলেই মাইজদী আর দাগনভূঞা পাঠিয়ে দেবেন। তারা সেদিকে থাক। লাঠিসোটা নিয়ে আসবেন। হাজার হাজার নারী-পুরুষ সবাইকে আসতে হবে।’