লক্ষণ তো দেখছি, কারণটা কী

জ্বর কোনো রোগ নয়, রোগের লক্ষণ মাত্র, রোগের কারণ থাকে অন্যত্র। করোনাতে যেমন জ্বর আসে, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, চিকনগুনিয়া, ডেঙ্গুতেও তেমনি জ্বর হয়। এমনকি আমাশয়, প্রস্রাবের সংক্রমণ, ডায়রিয়াতেও জ্বর হয়। অপারেশনের পর ইনফেকশন হলে জ্বর হয়। এরকম কত কারণেই যে জ্বর হয় তার হিসাব করা কঠিন। কিন্তু সব কারণ খুঁজে বের করেই তার নিরাময় করতে হয়। গত কয়েক মাসে রাষ্ট্রীয় ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, ৬টি চিনিকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে লোকসানের বোঝা রাষ্ট্রের পক্ষে আর বহন করা সম্ভব নয়। কর্তাবাবুরা কাতর স্বরে বলছেন, কী করব বলুন! কারখানাগুলো লাভজনক নয়। দেখুন না বছর বছর লোকসানের বোঝা কেমন বেড়েই যাচ্ছে। তাই চোখের জলে বিদায় দেওয়ার মতো কষ্ট লাগলেও কারখানাগুলো নাকি বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। রোগের যেমন লক্ষণ দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিয়ে কারণ অনুসন্ধান করেন বিজ্ঞানীরা, তেমনি জীবন ও সমাজের সব ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য। রাষ্ট্রীয় কারখানার ক্ষেত্রে লোকসান হলো রোগের লক্ষণ, কিন্তু দেখতে হবে রোগটা কী এবং রোগের কারণ কী?

দেশের ১৫টি চিনিকলের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ২ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন হলেও বর্তমানে বছরে চিনি উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৭০ হাজার টনের মতো অর্থাৎ উৎপাদন ক্ষমতার মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ। আখের স্বল্পতাই    উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী চিনি উৎপাদন না হওয়ার অন্যতম কারণ। আখচাষিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনবার আখের দাম বৃদ্ধির পরও মিল এলাকায় লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক হচ্ছে না আখচাষ। বর্তমানে মিলগেটে প্রতি মণ আখের দাম ১৪০ টাকা। সে হিসেবে ১০০ কেজি আখের দাম ৩৫০ টাকা। যদিও সুগার ক্রপ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের দাবি বাংলাদেশে আখের চিনি আহরণের হার ১২ শতাংশ। কিন্তু গত মৌসুমে করপোরেশনের গড় চিনি আহরণ হার ছিল ৫.৮৩ শতাংশ। সে অনুযায়ী ১০০ কেজি আখ থেকে চিনি পাওয়া যায় ৫ কেজি ৮৩০ গ্রাম। ৬০ টাকা কেজি হিসেবে যার বর্তমান বাজারমূল্য ৩৫০ টাকা। কিন্তু আখ থেকে শুধু চিনি উৎপাদন হয় না। ১০০ কেজি আখ থেকে মলাসেস বা ঝোলাগুড় পাওয়া যায় ১৫ কেজি, ২৫ টাকা কেজি হিসেবে যার বাজারমূল্য ৩৭৫ টাকা। বাগাস বা ছোবড়া পাওয়া যায় ৩৫ কেজি, ৫ টাকা কেজি হিসেবে যার দাম ১৭৫ টাকা। প্রেস মাড যা জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা হয় তা পাওয়া যায় ৫ কেজি, যার দাম ৫০ টাকা। তাহলে চিনি ও অন্যান্য উপজাত যা পাওয়া যায় তার মোট দাম ৩৫০+৩৭৫+১৭৫+৫০=৯৫০ টাকা।

অর্থাৎ ১০০ কেজি আখ থেকে যে চিনি এবং অন্যান্য উপাদান পাওয়া যায় তা বিক্রি করে পাওয়া যায় ৯৫০ টাকা আর আখের দাম ৩৫০ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত  হবে  উৎপাদন উপকরণ চুন, সালফারের দাম, জ্বালানি খরচ, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা, আখ পরিবহন খরচ এবং যন্ত্রপাতি মেরামতসহ অন্যান্য খরচ। তাহলে লোকসান কেন হয়? 

জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটিতে বিএসএফআইসির প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে চিনিকলের লোকসানের কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়। কারণগুলো হলো- উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রয়মূল্য কম, পুঞ্জীভূত ঋণ ও সুদ, আখের উন্নত জাতের উদ্ভাবন না হওয়া, কারখানার আধুনিকায়ন না হওয়া ও দক্ষ জনবলের অভাব। এগুলোর জন্য দায়ী কে আর দায় চাপানো হলো কার ওপর?

এছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্র্তৃক অপরিশোধিত চিনি আমদানি এবং কম দামে তা বাজারজাত করার কারণে চিনিকলগুলো এক অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে যায়। ফলে  সরকারি খাতের চিনিকলগুলো গত পাঁচ বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। এছাড়া, এসব কারখানার জন্য ব্যাংকঋণ নেওয়া আছে আরও প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। এই পুঞ্জীভূত দেনা আর লোকসান মিলে চিনিকলগুলোর নাভিশ্বাস উঠে গেছে। একটা হিসাবে দেখা যায় গত বছর পর্যন্ত চিনিকলগুলো ভ্যাট ট্যাক্স বাবদ সরকারকে দিয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। আর সরকার কর্র্তৃক প্রদত্ত ট্রেড গ্যাপ পূরণের প্রতিশ্রুত টাকার পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। সরকার সেটা প্রদান করেনি। এগুলো সময়মতো দিলে ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হতো। 

দেশে বর্তমানে ৬টি চিনি পরিশোধন কারখানা রয়েছে। এসব কারখানাগুলো ব্রাজিল ও থাইল্যান্ড থেকে র-সুগার আমদানি করে পরিশোধন করে বাজারজাত করছে। এসব পরিশোধন কারখানাগুলোর বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৩২ লাখ মেট্রিক টন। শর্ত ছিল পরিশোধন কারখানাগুলো তাদের উৎপাদিত চিনির ৫০ ভাগ বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। কিন্তু তারা শর্ত ভঙ্গ করে বিদেশে রপ্তানি না করে উৎপাদিত সমুদয় চিনিই দেশে বাজারজাত করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কৃষিভিত্তিক চিনিশিল্প ও আখচাষিরা।

বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও কৃষিপ্রধান দেশে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পই পারে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে। সে লক্ষ্যেই দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে স্থাপন করা হয়েছিল কৃষিভিত্তিক চিনিশিল্প। চিনিশিল্পগুলো শুধু চিনি উৎপাদনই করত না। স্বল্পসুদে আখচাষিদের মধ্যে বীজ, সার ও কীটনাশক বিতরণ করে। প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়। আখচাষিদের প্রশিক্ষণ দেয়। আখের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, শীতকালীন সবজি, ডাল ও তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে আখচাষিদের উদ্বুদ্ধ করে। আখচাষিদের মেধাবী ছেলেমেয়েদের এককালীন বৃত্তি প্রদান করে। মিলজোন এলাকায় রাস্তাঘাট ও ব্রিজ-কালভার্ট মেরামত করে। আখচাষিদের উৎপাদিত সমুদয় আখ সরকার নির্ধারিত দামে কিনে থাকে। বন্ধ করার সময় এসব কিছুই বিবেচনা করা হলো না।

বর্তমানে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২০ লাখ মেট্রিক টন এবং এর মধ্যে ১৫টি চিনিকল থেকে উৎপাদন হয় ৭০ হাজার মেট্রিক টন। চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাজারের চাহিদার মাত্র চার শতাংশ পূরণ করতে পারে সরকারি খাতের চিনিকলগুলো। অথচ এর বিপরীতে কলগুলোতে লোকসানের  পরিমাণ কেবল গত অর্থবছরে ছিল ৯৭০ কোটি টাকা। এই লোকসানের শাস্তি হিসেবে সরকার সম্প্রতি  ছয়টি কলের আখমাড়াই কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। এই চিনিকলগুলো হচ্ছে কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড়, শ্যামপুর, রংপুর ও সেতাবগঞ্জ  চিনিকল।

স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে  বাংলাদেশ সুগার মিলস করপোরেশন গঠিত হয়। পরে ১৯৭৬ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশ সুগার মিল্স করপোরেশন ও বাংলাদেশ ফুড অ্যান্ড অ্যালাইড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনকে একীভূত করে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন গঠন করা হয়।  

তখন এটিকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়। চিনিকল এবং বিভিন্ন ধরনের খাদ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানসহ মোট ৬৮টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিএসএফআইসি’র অধীনে ছিল। পরে ৫০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাবেক মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এসবের বেশিরভাগেরই এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। বর্তমানে করপোরেশনের আওতায় ১৫টি চিনিকল রয়েছে। খাদ্য কথাটা লেখা থাকলেও করপোরেশনের মূল কাজই চিনি নিয়ে। অথচ করপোরেশন শুরুই হয়েছিল চিনি ও চিনিজাত খাদ্য পণ্য তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে। এদিকে চিনিশিল্পের সহযোগী শিল্প হিসেবে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, একটি ডিস্টিলারি কারখানা এবং চিনি কলের যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য কুষ্টিয়া শহরে রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোম্পানি (বিডি) লিমিটেড নামে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা রয়েছে। এটি পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি।

করপোরেশনের অধীনে ১৯ হাজার ৮৯ একর জমি রয়েছে। মোট সম্পদের পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। করপোরেশনের অনুমোদিত জনবলের সংখ্যা ১৬ হাজার ২৩৫। বর্তমানে কর্মরত আছেন ৯ হাজার ১৬ জন। তাদের মধ্যে কর্মকর্তা ১৭৪, কর্মচারী ৪ হাজার ৪০১ ও  শ্রমিকের সংখ্যা ৩ হাজার ৯০১ জন। অর্থাৎ প্রয়োজনের অতিরিক্ত শ্রমিক আছে এ অজুহাত দেওয়ার উপায় নেই বরং শ্রমিক কর্মচারী কর্মকর্তা অনুপাত নিয়ে প্রশ্ন করা যায়। এর বাইরে আখমাড়াই মৌসুমে অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। একটা ছোট্ট হিসাব বড় প্রশ্নের জন্ম এবং জবাব দুটোই দিতে পারে। যেমন সেতাবগঞ্জ চিনিকলে ৪৫০ শ্রমিকের মোট বেতন ৩৫ লাখ টাকা আর এমডিসহ কর্মকর্তা কর্মচারীর বেতন প্রায় ১ কোটি টাকা। অন্যদিকে আখের স্বল্পতার কারণে মিলভেদে বছরে আখমাড়াই কার্যক্রম ৪৭ থেকে ১২৬ দিন পর্যন্ত চলে। তাহলে কারখানা লাভজনক হবে কীভাবে? এর ওপর আবার গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ২০০২ সালে চিনি আমদানির অনুমতি দেওয়ার পর থেকেই বিপাকে পড়েছে  রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকলগুলো। নানা ধরনের সহায়তা পাওয়ায় দেশে উৎপাদিত চিনির তুলনায় আমদানি করা চিনির মূল্য কম হওয়ায়, আর বিক্রি করতে না চাওয়ায় অবিক্রীত থাকছে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার চিনি।

আখের চিনি বিট-এর চিনির চেয়ে ভালো এ কথা জানা সত্ত্বেও বিক্রি করা যায় না কেন? এ প্রশ্ন সবার। সামরিক বাহিনী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড যারা মাসে প্রতি সদস্য ৪ কেজি চিনি পান তাদের রেশন হিসেবে দিলেও বছরে ২ লাখ টনের বেশি চিনি প্রয়োজন। কিন্তু হায়! বিক্রি হয় না বলে গলে যায়, নষ্ট হয় চিনি।

আর লোকসান গুনতে গুনতে রুগ্ণ হয়ে পড়েছে চিনিকলগুলো। ফলাফল মৃত্যু পরোয়ানা জারি। কিন্তু রোগী মরলেও রোগ তো দূর হলো না। এই দুর্নীতি লুটপাট  অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোরও যে মৃত্যু ঘটাবে তাতো নিশ্চিত।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

rratan.spb@gmail.com