কী শেখাচ্ছি নিজের সন্তানকে

একটি শিশুর জন্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম হয় একজন মা ও বাবারও। শিশুকে বড় করার নানা কলাকৌশল নিয়ে কথা বলি আমরা। শিশুকে কত কিছু শেখানোর চেষ্টা করি, কত কিছু বানানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আমরাই কি জানি শিশুকে কী শেখাতে হবে, কেন শেখাতে হবে এবং কীভাবে শেখাতে হবে? কজন ভাবি যে, সদ্য মা বা বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া মানুষ হিসেবে আমাদের জন্যও উপযুক্ত শিক্ষার দরকার আছে?

আমরা আমাদের সন্তানদের ছেলে হিসেবে বড় করছি, মেয়ে হিসেবে তৈরি করছি। কিন্তু মানুষ হিসেবে কতটা তৈরি করতে পারছি? মা-বাবা হিসেবে কতটা ভালো মানুষ হিসেবে বড় হয়ে ওঠার শিক্ষা দিতে পারছি তাদের? সেই পরিবেশই বা কতটা সৃষ্টি করে দিতে পারছি? অথবা নিজেরাই বা সেই শিক্ষা কতটা পেয়েছি?

প্রিয় সন্তানকে সর্বান্তকরণে ধার্মিক বানানোর চেষ্টা করছি। খুব ভালো কথা! কিন্তু তাই করতে গিয়ে মুক্তচিন্তার জানালা-দরজা বন্ধ করে দিয়ে যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাসে উৎসাহিত করছি না তো? সুশিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার নামে শিক্ষা দিচ্ছি মূলত টাকা তৈরির কল হয়ে ওঠার। উদার, মুক্তমনা, পরোপকারী, দেশপ্রেমিক এবং সর্বোপরি মানবিক মানুষ হিসেবে বড় হয়ে ওঠার শিক্ষা দিচ্ছি না মোটেই।

দেব কেমন করে? ওসব তো নিজের মধ্যেই নেই। আর

থাকতে যে হয়, সেই বোধও তো নেই। কারণ মানুষ হিসেবে আমরা পরিণত হলেও মা বা বাবার ভূমিকায় সম্পূর্ণ নতুন এবং শেখার আছে অনেক কিছুই। উদার হতে গেলে ছাড় দেওয়া শিখতে হয়, অন্যের মত সহ্য করতে হয়, এমনকি নিজের ধারণা ও বিশ্বাস থেকেও কখনো কখনো সরে আসতে হয়। এসব করতে কি শেখাই আমাদের সন্তানদের, নাকি কোনো দৃষ্টান্ত নিজেরা স্থাপন করতে পারি ওদের সামনে?

কেবল শেখাই, নিজের ভালোটা বুঝতে শেখ। এতে করে ওরা নিজের ভালোটা এত ভালো বুঝতে শেখে যে, একসময় নিজের মা-বাবাকে ত্যাগ করতেও ওদের বিবেকে বাধে না। বৃদ্ধ মা-বাবা তখন হয়ে যান গলার কাঁটা। তারা আগেভাগে পৃথিবী থেকে চলে গেলেই সন্তানরা বেশি খুশি। কারণ তখন আর এরা কোনো দরকারে আসছেন না। মাঝখান থেকে ব্যয় বৃদ্ধি করছেন অহেতুক বেঁচে থেকে। অসুখ করলেও সন্তানরা তাদের চিকিৎসা করানোতে অনাগ্রহী। তারা হয়তো ভাবেন, কী দরকার তাদের রোগ সারিয়ে আয়ু লম্বা করে দেওয়ার? বেশিদিন বাঁচলে খরচও বাড়বে। বাজে খরচ করতে আমরাই তো একসময় মানা করেছিলাম। নিজের ভালোটা বুঝতে শিখিয়েছিলাম! সে নিজের সঞ্চয়ে বাধা আসে এমন সব ধরনের খরচ কমিয়ে ফেলা শিখে নিয়েছে।

আমরা শিখিয়েছিলাম, যেভাবে পারো এগিয়ে যাও। অন্যকে গুঁতিয়ে, ল্যাং মেরে; এমনকি প্রাণে মেরে হলেও তারা এগিয়ে যাওয়া শিখে গেছে। সামনে রঙিন পৃথিবী দেখার মোহ নিয়ে কেবল দৌড়াচ্ছে তারা। পেছনে পড়ে যাচ্ছে বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ; এমনকি মা-বাবাও। পেছনে তাকানোর সময় নেই ওদের। আমরাই মানা করেছি। বন্ধুকে সাহায্য করতে মানা করেছি, প্রতিবেশীর কথা ভাবতে মানা করেছি, আত্মীয়-স্বজনকে বাতিলের খাতায় রাখতে বলেছি। কেবল নিজের ভালোটা কীসে হয়, তাই নিয়ে চিন্তা করতে বলেছি। ওরা তাই তাই করছে এখন! বরং যতটা আশা করেছিলাম, তার চেয়েও বেশি করে করছে। ওদের কী দোষ!

শিক্ষিত হওয়ার নামে, বড় হওয়ার নামে আমরা ওদের রেসের ঘোড়া হতে শিখিয়েছি। জন্মের পর থেকেই ওরা কেবল দেখছে প্রতিযোগিতা আর প্রতিযোগিতা। সবাই দৌড়াচ্ছে অন্য সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। সামনে এগিয়ে যাওয়ায় যত আনন্দ, তার চেয়ে ঢের বেশি আনন্দ অপরকে পেছনে ফেলতে পারলে। নিজের সাফল্যের চেয়ে অন্যের পরাজয় দেখে তখন বেশি আনন্দ। অন্যকে হারিয়ে আনন্দ পাওয়া কি সাফল্য, নাকি মানসিক অসুস্থতা? এই পার্থক্য বোঝার অবস্থায় আমরাই নেই, তো ওদের কীভাবে বুঝতে শেখাব?

আমাদের শিশুদের অনেক রকমের নীতিকথা শিখিয়েছি কিন্তু তার খুব কমই নিজেরা জীবনে অনুসরণ করেছি। ওরাও যা শেখার তাই শিখেছে। নীতিকথাকে পাগলের প্রলাপ ভাবতেও দ্বিধা করেনি, কারণ ওসবের প্রয়োগ তারা দেখেনি কখনো। নিজেরা চোখে-মুখে মিথ্যে কথা বলে সন্তানকে সত্যবাদী যুধিষ্ঠির বানাতে চাই। এই দ্বিচারিতার মানে ওরা ঠিক বুঝে ফেলেছে।

আমার সন্তান কোনোদিন দেখল না আমরা কারও জন্য কিছু করছি, কারও বিপদে স্বার্থত্যাগ করছি। অসহায় গরিব প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের জন্য আমার হাত থেকে কিছু খসেনি কোনোদিন। অথচ আজ আশা করছি আমার সন্তান ভালো মানুষ হবে, অন্যকে নিয়ে ভাববে। বললেই হলো? ওরা তাই কোনো কিছু ত্যাগ করতে পারছে না। কেবল ভোগ আর বিলাসিতা এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা করছে অন্যকে ঠকিয়ে।

এরকম আরও হাজারো উপায়ে আমরা মা-বাবারা আমাদের প্রিয় সন্তানদের নষ্ট করছি। আজ যদি কোনো সন্তান তার মা-বাবার খোঁজ না নেয়, খেতে-পরতে না দেয়, অসুখ-বিসুখে চিকিৎসা না করায়, জোর করে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়; তার দায় কিছুটা মা-বাবাকেও নিতে হবে।

ছোটবেলা থেকেই ওরা শুনছে, ‘নিজের ভালো পাগলেও বোঝে আর তুমি বুঝতে পার না?’ একটু বড় হয়ে যখন ওরা কারও কোনো কাজ করে দেয়, মা-বাবার ভূমিকায় থেকে আমরা বকা দিয়ে বলি, ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াচ্ছ? তোমার দরকারে তোমার কোন আপনজন এসে করে দেয়, দেখি!’ 

বড় হয়ে গেলে আরেকটি প্রবাদ-বাক্য শেখাই, ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।’ একই ঢঙের আরেকটি কথাও খুব জনপ্রিয় করেছি আমরা, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম।’ আবার শ্বাস লম্বা করে মানুষকে বলতে শুনি, ‘এ জগতে কে কার?’ সন্তান ভুল করলে বকা দিয়ে বলি, ‘এই যুগে একটু চালাক-চতুর না হলে চলতে পারবে না।’ ওরা ঠিক বুঝে যায় এই চালাক-চতুর হওয়া মানে কী।

ওরা কারও জন্য কিছু করতে চাইলে আমরা বাধা দিয়ে বলি, ‘তোমাকেই কেন করতে হবে? দেশে আরও মানুষ আছে না?’ সারা পৃথিবীর সব মানুষের সব দায়িত্ব কি তুমি একা নিয়ে বসে আছ? তোমার নিজের সংসার আছে না, নিজের ভবিষ্যৎ আছে না?’

আমরা মা-বাবা হিসেবে, সমাজের একজন হিসেবে এভাবেই প্রতিনিয়ত শিশুদের স্বার্থপর হওয়ার শিক্ষা দিয়ে যাব, অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ালে তিরস্কার করব, নিজের ভালোটাই কেবল ভালো করে বুঝতে শেখাব; আবার আশা করব তারা ভালো মানুষ হবে? যারা দুএকজন এই ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকেও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, সেখানে আসলে আমার আপনার বিশেষ কোনো কৃতিত্ব নেই। তাছাড়া হাজারে একজন ভালো মানুষ তৈরি হলে, তাই দিয়ে কোনো ধারণা তৈরি হয় না।

আসুন এমন কিছু করি, যাতে আমাদের শিশুরা শিখুক- সবাই বাঁচলেই কেবল আমি বাঁচতে পারব, সবাই মিলে ভালো থাকতে পারব।

লেখক: শিক্ষা ও উন্নয়নকর্মী

skbiswas78@gmail.com