বাংলা বানান ও শব্দ ব্যবহারে কিছু প্রচলিত ভুল

ইংরেজিতে একটি শব্দের একটিই বানান, পৃথিবী জুড়েই তা এক। আমেরিকা তার নিজস্ব স্টাইলে কিছু ইংরেজি বানান লেখে, যা ইংল্যান্ডের বানানের সঙ্গে মেলে না (colour-color)। সেটা ব্যতিক্রম, তা মোটেই বাংলা বানানের মতো যথেচ্ছ নয়। বাংলায় আছে প্রায় দেড় লাখ শব্দ, তার সবটার বানান মনে রাখা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আর তা সম্ভব নয় বলেই অভিধান থাকে। অভিধান থেকে শব্দের অর্থ এবং বানান দুটোই পাওয়া যায়। দেখা যায় একই শব্দের একাধিক বানানও চলে, ফলে শব্দের সংখ্যাও আরও বেড়ে যায়। বাংলা বানানের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটি হলো, বানানে একক রীতি না-হওয়া। বাংলা বানানে নীতি হচ্ছে সংস্কৃতের বানান এই, অন্য শব্দের বানান এই, দেশি শব্দের বানান এই। পৃথিবীর সব ভাষায়ই মৌলিক এবং আগন্তুক ভাষার মিশ্রণ ঘটেছে। কিন্তু বাংলা ভাষার ইতিহাসে যেভাবে ঘটেছে তা অন্যত্র বোধহয় তুলনীয় নয়। তাই এখানে বানানের যে জটিলতা তা এই ইতিহাসের কারণেই এবং তা এই ভাষার নিজস্ব।

আর বাংলা ভাষার পণ্ডিতরা বামপন্থি রাজনীতিকদের মতো, তাদের পক্ষে ‘সহমত’ হওয়া কঠিন। তাদের যত মাথা তত মত। আর এসব করে বাংলা বানান এখনো একক রীতিতে পৌঁছাতে পারেনি।

প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাংলা একাডেমি চেষ্টা করছে, কিন্তু তাদের উদ্যোগ বিভ্রান্তি আর বিশৃঙ্খলাই বাড়াচ্ছে। এর সমাধান কবে হবে, আদৌ হবে কি না, কেউ জানে না। তারপরও ভরসা রাখতে হবে বাংলা একাডেমির ওপর। কারণ কোনো ভাষার বানানরীতি ঠিক করা ব্যক্তির কাজ নয়। এটা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। বাংলা একাডেমি আমাদের সেই প্রতিষ্ঠান। বাংলা একাডেমি যোগ্য হোক, দক্ষ হোক, বাংলা বানানের একটা একক রীতি তৈরি করুক এই প্রত্যাশা করছি। তবে ভাষা ও বানান বিষয়ে আমাদের সচেতনতার মাত্রা অত্যন্ত শোচনীয়। আমরা প্রায়ই বানান ভুল করি। ভুল শব্দ প্রয়োগ করি। একেবারে সাধারণ শব্দগুলোর বানানেও ভুল হয়। মাতৃভাষায় সীমাহীন অদক্ষতা বাঙালি ছাড়া আর কোনো জাতির আছে বলে মনে হয় না! তারপরও দেখি কারও মধ্যে বিকার নেই, অনুশোচনা নেই। এমনকি শুদ্ধ করে লেখার কোনো তাগিদও নেই!

বই পড়া আর মাস্ক পরা আমাদের কাছে কেবলই ‘পড়া’। করোনা পরীক্ষার ‘কিট’ আর নর্দমার কীট একাকার হয়ে যায় ‘কীট’ বানানে। টিকা আর টীকার পার্থক্যও বেশির ভাগ মানুষ জানে না। অভিধান মতে, টীকা মানে হচ্ছে ব্যাখ্যা। আর টিকা মানে হচ্ছে, বসন্তাদি রোগের প্রতিষেধক হিসেবে সুচ দ্বারা ওই রোগের বীজ শরীরে প্রবেশ করানো;vaccination।

সাধারণরা তো বটেই, অসাধারণরাও যে ভুলগুলো করে থাকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি তুলে ধরছি : করোনাকালীন সময়ে নয়, লিখতে হবে করোনাকালে বা করোনার সময়ে। ‘চলাকালীন সময়ে’ হয় না, হয় চলাকালে বা চলার সময়ে। মৃত্যুর সম্ভাবনা নয়, আশঙ্কা। যা কিছু নেতিবাচক, তা হবে ‘আশঙ্কা’। আর ইতিবাচকগুলোই কেবল ‘সম্ভাবনা’। জবাবদিহিতা নয়, কথাটা জবাবদিহি। দীর্ঘসূত্রিতা নয়, দীর্ঘসূত্রতা। পরবর্তীতে নয়, পরবর্তীকালে বা পরবর্তীসময়ে। উচিৎ নয়, উচিত। অনুষ্ঠিতব্য নয়, অনুষ্ঠেয়। ধারণে ‘মূর্ধন্য ণ’ কিন্তু ধরন দন্ত ন।

‘বানানে কী যায় আসে’, ‘কমিউনিকেট করতে পারলেই হলো’, এসব কথা যারা বলেন, তারা ঠিক বলেন না। অন্তত মাতৃভাষায় লেখালেখির ক্ষেত্রে। তারা আসলে নিজেরা বানান জানেন না, জানতেও চান না। যেকোনো যোগাযোগমাধ্যমে লিখলে শুদ্ধ করে লেখা উচিত। আমরা অনেকের লেখা বা মন্তব্য পছন্দ করি। তখন প্রশংসা করে লিখি : ‘চমৎকার লিখনী।’ এটা লিখন, লেখন হতে পারে, লিখনী নয়। লেখনীও হতে পারে। লেখনী অর্থ, যা দ্বারা লেখা হয়, কলম। আবার, লেখনী মানে লেখার ধারা, রচনার প্রণালি। মন্তব্যটি হতে পারে : চমৎকার লেখন, লিখন, লেখা। কিংবা ‘সুন্দর লেখনী,’ লিখা বা লিখনী নয়। সাধারণত ‘শোনা’, ‘লেখা’ শুদ্ধ, ‘শুনা’, ‘লিখা’ অশুদ্ধ। তবে কেবল পুরাঘটিত ক্রিয়ার বেলায় ‘শুনা’ ‘লিখা’ প্রযোজ্য। যেমন, আপনি শুনে থাকবেন, আমি শুনেছি, আমি লিখেছি, লিখে রাখব, লিখিত হয়েছে ইত্যাদি। তা ছাড়া, লিখুন, শুনুন ইত্যাদি ব্যবহৃত হয় অনুজ্ঞাবাচক ক্রিয়ার ক্ষেত্রে। লিখা, শুনা, শিখা অনেকটা সাধু রূপের চলিত প্রকরণ। যেমন, শুনিয়াছি> শুনেছি; লিখিয়াছি> লিখেছি; শুনিতে> শুনতে; লিখিতে> লিখতে ইত্যাদি। আমরা ওই সাধু রূপটাকে মনে রাখতে গিয়েই চলিতে এই ভুলটা করি।

যাকে বলে ‘সমোচ্চারিত শব্দ’ সেগুলোর বানানও আমরা অনেক ক্ষেত্রে ভুল করি। আমরা এখনো অনেকে দোষ ‘শিকার’ করি, আবার পাখিও ‘স্বীকার’ করি! ‘পরা’ আর ‘পড়া’ নিয়েও আমরা বেশ সমস্যায় পড়ি। কেবল পরিধান করা অর্থে ‘পরা’ এবং বাকি সব ক্ষেত্রে ‘পড়া’ এটা আমরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুলে যাই! ‘হ্যাঁ’ বানানে চন্দ্রবিন্দু দিতে চায় না কেউ; ‘হ্যাঁ’ বানানে চন্দ্রবিন্দু হবে। আরেকটা ট্রিকি বানান হচ্ছে ‘জি’, যেমন) ‘হ্যালো, জি বলছি’। এটাকে কেউ জ্বী লেখে, কেউ জ্বি, কেউ জী। শুদ্ধ বানান হচ্ছে ‘জি’।

বাক্যের নিহিতার্থে শব্দের ব্যবহার হয়। ২৫শে মার্চের ‘কালরাত’ আর ‘কাল রাতে আমার ঘুম হয়নি’ কিংবা ‘স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনায়’ সব ‘কাল’-ই একই বানান। কিন্তু সব মানে এক নয়। বাক্যের মানে অনুযায়ী অনেক শব্দের বানান নির্ভর করে। ‘আমি লক্ষ করছি’ আর ‘আমার এক লক্ষ টাকা দরকার’ একই ‘লক্ষ’ ভিন্ন মানে ধারণ করছে।

ইংরেজিতে দুটো বহুবচন পরপর বসলেও বাংলায় দুটো বহুবচন পরপর বসবে না। ইংরেজিতে  all the students  হলেও বাংলায় ‘সব ছাত্ররা’ না হয়ে ‘সব ছাত্র’ হবে। ‘সব নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা’ না লিখে লিখতে হবে ‘সব নিহতের প্রতি শ্রদ্ধা।’ একই কারণে ‘সকল বন্ধুদেরকে নিমন্ত্রণ’ না লিখে লিখতে হবে ‘সকল বন্ধুকে নিমন্ত্রণ।’ রেডিওতে ‘সব লিসেনার্সদেরকে ওয়েলকাম’ না বলে বলতে হবে ‘সব লিসেনারকে ওয়েলকাম।’

‘প্রস্তাব’ মানে হচ্ছে সুপারিশ বা recommendation. পক্ষান্তরে ‘প্রস্তাবনা’ হচ্ছে ভূমিকা বা মুখবন্ধ। অনেকে দুটিকে গুলিয়ে ফেলেন। ‘সংসদ অধিবেশনে বিএনপির তিন সাংসদ সোচ্চার’। ওটা হবে ‘সরব’। সোচ্চার মানে নিজে উচ্চারিত। গণ্ডগোল বা হইচই করাটা সোচ্চার নয়। আমাদের গণমাধ্যমে প্রায়ই ‘ভোর রাতে’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। এটা ভুল। ‘ভোরে’ অথবা ‘রাতে’ হবে। আমাদের দেশে ‘সর্বজনীন’ এখনো ‘সার্বজনীন’ হয়ে আছে। সেটা মানবাধিকার সনদের ক্ষেত্রে যেমন আছে, দুর্গোৎসবেও আছে! পত্রিকায় লেখা হয়, সেতুমন্ত্রী ‘পায়ে হেঁটে’ নির্মাণকাজ পরিদর্শন করেন। তিনি কি হাতেও হাঁটেন? অথবা লেখা হয়ে থাকে, পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। মুঠো তো হাতেই। হাতের মুঠো কেন লেখা হবে? এমন অনেক শব্দই আছে যা ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়।

পরিশেষে একটা বাস্তব ঘটনা। একবার আমার প্রয়াত সহকর্মী সুবল কুমার বণিক (সাহিত্য, ভাষা, বানান, ব্যাকরণে যার ছিল অসাধারণ দখল) আমার কাছে ‘আকাশপ্রদীপ’ কী, জানতে চাইলেন। আমি খানিকক্ষণ ভেবে বললাম, আকাশে বা উঁচুতে যে প্রদীপ জ্বালানো হয়। সুবলদা মিটি মিটি হাসলেন। বললেন, ভাবার্থ ঠিক আছে। কিন্তু একেবারে যথাযথ মানেটা হয়নি।

এমন একটা সাধারণ শব্দের মানে বলতে না পারায় আমি বেশ লজ্জিত হই। লতা মুঙ্গেশকরের বিখ্যাত গান ‘আকাশপ্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে, আমার নয়ন দুটি শুধুই তোমারে চাহে ব্যথার বাদলে যায় ছেয়ে’ কতবার শুনেছি। অথচ ‘আকাশপ্রদীপ’ শব্দটির মানে জানি না! বাংলা ভাষার প্রসিদ্ধ তিন অভিধান ঘেঁটে শব্দটির অর্থ দেখে অবাক হয়ে গেলাম!

সুবলচন্দ্র মিত্রের ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ অনুয়ায়ী আকাশদীপ শব্দের অর্থ হলো, লক্ষ্মী-নারায়ণের উদ্দেশে কার্তিক মাসে উঁচু বাঁশ প্রভৃতির ওপর শূন্যদেশে যে প্রদীপ দেওয়া হয়। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সংকলিত ও সম্পাদিত ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ অনুযায়ী হিন্দুগৃহে দেবোদ্দেশে আকাশে যে দীপ দেওয়া হয়; বাঁশ পুঁতিয়া তার আগায় এই দীপ বাঁধিয়া দেওয়া হয় এবং কার্তিক মাস-ভোর প্রতি সন্ধ্যায় ঐ দীপ জ্বালা হয়। রাজশেখর বসু সংকলিত ‘চলন্তিকা আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান’ অনুযায়ী, কার্তিক মাসে উঁচু বাঁশ ইত্যাদির ওপরে যে প্রদীপ দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ‘আকাশপ্রদীপ’ জ্বালানোর সঙ্গে হিন্দু বিশ্বাসের যোগ আছে। হিন্দু পুরাণ মতে, আশ্বিন মাসের অমাবস্যায় মহালয়ার দিন পূর্ব-পুরুষকে উদ্দেশ করে তর্পণ করা হয়। তার পরের একটা মাস মৃত পূর্ব-পুরুষরা ধরাধামে আসেন। থেকে যান স্বজনদের সঙ্গে। আনন্দ উৎসব উদযাপনে শামিল হন কটা দিন। কালী পূজার অমাবস্যায় তাদের ফিরে যাওয়ার পালা। ফিরে যাবেন পরলোকে। কে পথ দেখাবে তাদের? তাই আকাশপ্রদীপ জ্বেলে রাখা হয় রাতভর!

হিন্দু পুরাণ ও সংস্কৃতিতে বারবার ফিরে এসেছে অতীতের কাছে ফিরে যাওয়া। অতীত মানে স্মৃতি। সেই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও যত্ন মিশে রয়েছে ওই কার্তিক মাসের সাঁঝবেলায় জ্বালিয়ে রাখা আকাশপ্রদীপে! এমন অনেক ছোট ছোট শব্দ, কত কাহিনী-ইতিহাস বুকে নিয়ে নিঃশব্দে টিকে রয়েছে। অথচ আমরা তা জানি না, জানতেও চাই না! মাতৃভাষার রসও পুরোপুরি আস্বাদন করতে পারি না!

লেখক লেখক ও কলামনিস্ট

chiros234@gmail.com