হরিদাসের বুলবুল ভাজা ও বাংলা ভাষা

১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া তরুণ মজুমদারের ‘শ্রীমান পৃথ্বিরাজ’ সিনেমাটি যারা দেখেছেন রবি ঘোষের অভিনয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া সেই গানটি স্মরণ করুন :

‘হরিদাসের বুলবুল ভাজা টাটকা তাজা খেতে মজা

এ ভাজা খেলে পরে রোচবে না আর খাজা-গজা।

মহারানী ভিক্টোরিয়া এ ভাজা খায় রোজ কিনিয়া

ভাজা খেয়ে বোঝে না সে কেবা রানী কেবা প্রজা।’

পণ্যের বিশ্বায়নের অপর এক নাম ম্যাকডোনাল্ডাইজেশন। এই খাবারের চেইন শপের বার্গার প্রতীকী বিশ^খাবার। বিভিন্ন দেশীয় মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতাপারচেজিং পাওয়ার প্যারিটির তুলনা করার সময় হিসাব করা হয় একই মানের, একই স্বাদের একটি বার্গারের দাম নিউ ইয়র্কে কত, দিল্লিতে কত, সাংহাইয়ে কত, দুবাইয়ে কত? পৃথিবী জুড়েই আছে ম্যাকডোনাল্ডসের খাবার দোকান। পণ্যের সঙ্গে যে ভাষাটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়েছে, তা ইংলিশ।

ভাষা ছড়িয়ে দেওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে খাবার। চকোলেট, চিপস, বার্গার, সালাদ, পিৎজা, কোল্ড ড্রিংকস, চকোলেট মিল্ক, কফি (চা বহু আগেই বাংলায় আত্তীকৃত হয়েছে), চৌমিন, কেচাপ, ফ্রায়েড চিকেন, ম্যাঙ্গো জুসএসব শব্দ ভাষার স্ককীয়তা ধরে রেখে শিশুদের মুখে উঠে এসেছে। এগুলো অনুবাদ করার চেষ্টা করে লাভ নেই, শিশুরা নেবে না। শুধু খাবারের নামই নয় আরও অনেক বুদ্ধিবৃত্তিক শব্দ এসেছে। এসব শব্দের একটি কি দুটি কেউ না কেউ ধারণ করেছেন। হয়তো সেই শব্দ ব্যবহার করে লেখালেখিও করেছেন। এর মাধ্যমে হয়তো আরও চার-পাঁচজনের শব্দটা জানা হবে, কিন্তু ক্রমাগত ব্যবহৃত হতে না থাকলে শব্দটি মূল ভাষায় থাকলেও আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে। আর খাবারের নামগুলোর বাংলা অভিধানে ঢুকতে যত বাধা দেওয়া হোক না কেন, একসময় ঠাঁই করে নেবে।

আমি এত খাবার থাকতে গানের হরিদাসের বুলবুল ভাজার কথা বলেছি এ কারণেই যে, গানের ভেতর বিশ্বায়নের একটি ডাক ছিল, একটি আবহ তৈরি হয়েছিল। বাংলার হরিদাস বুলবুল ভাজা বিক্রি করে আর বিলেতে বসে মহারানী ভিক্টোরিয়া প্রতিদিন কেনেন এবং মজা করে খান। অন্য দিন হয়তো কিনবেন রাজকুমারী ইসাবেলা, কোনো দিন রাজ গুস্তাভ, কোনো দিন রুশ নারী ভ্যালেন্তিনা। এটাই তো পণ্যের বিশ^ায়ন। তাদের মুখে যদি ‘বুলবুল ভাজা’ উচ্চারিত হয়, তাহলে বাংলা ভাষাও তো পৌঁছে গেল বিশে^র দরবারে। একমাত্র বুলবুল ভাজা দিয়ে বিশ^ায়নের প্রতিযোগিতায় নামার চেষ্টা করছি না

আমাদের দুর্বলতা ভাষায় নয়, আমাদের ঔপনিবেশিক মনের, আমাদের কৌশলের। পৃথিবীর যতটা প্রয়োজন তার পঁচাত্তর ভাগ পাট বাংলাদেশ থেকে সারা পৃথিবীতে পাঠিয়েও আমরা ‘পাট’ নামটি প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। দুটি স্বাধীনতার (১৯৪৭, ১৯৭১) প্রায় পঁচাত্তর বছর পেরোলেও আমাদের বলতে হয় ‘জুট’। পাট বললে বিদেশিরা বোঝে না, বুঝবেও না। আমাদের বুঝিয়ে দিতে হয় তাদের ভাষায়। যারা আমাদের কাছে থার্মোমিটার বিক্রি করল, অফসেট প্রিন্টিং মেশিন বিক্রি করল, কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক বিক্রি করল, এমনকি মিনারেল ওয়াটার বিক্রি করল তারা কি কখনো এসবের বাংলা শিখে আমাদের বাংলায় বুঝিয়ে-সুজিয়ে বিক্রি করেছে? সরাসরি উত্তর না। আমার এবং আমার ভাষার দুর্বলতা আমার কাছে যেমন জানা, বিক্রেতা তা না জানলেও তার পণ্যের এবং তার ভাষার সক্ষমতাটা তার জানা।

এই গানটিতে একটি সাম্যবাদী আহ্বানও ছিল : মহারানী এ ভাজা খাওয়ার পর এতটাই আপ্লুত হয়ে পড়েনকে রানী আর কে প্রজা তিনি তাও বুঝতে পারেন না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন অন্তত ‘খিচুড়ি’ নিয়ে গেছে, নামটা যদিও বলে বিকৃত উচ্চারণআমরা যদি বুলবুল ভাজা, কাঁচাগোল্লা, ফখরুদ্দীনের কাচ্চি বিরিয়ানি, রসমালাই খাওয়া শেখাতে পারতাম এবং সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারতাম, খাবারের নামগুলো আগে তাদের অভিধানে ঢুকত। বাংলা পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা ইউনেসকো কি বলেছে এই অহংকার নিয়ে থেকে বাংলার এতটুকু খেদমতও করতে পারব না?

আমরা যেহেতু বিভিন্ন ধরনের অক্ষমতার কারণে অন্য ভাষায় আমাদের শব্দ চালান করতে পারছি না, আমরা অন্য ভাষার যেসব শব্দ হামেশাই মুখে নিচ্ছি, তা বাংলায় গ্রহণ করছি না কেন?

অ্যানাটমি ও প্যাথলজির বাংলা অনুবাদ করে কী লাভ? হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার বাংলায় ভাষান্তর করতে গেলে তো আরও কঠিন কিছু করে ফেলব। ফোন হ্যাং হয়ে গেছে কিংবা ই-মেইল হ্যাক হয়ে গেছে বললে আমরা যা বুঝি বাংলায় কি এর চেয়ে সহজে ভালো কিছু বোঝানো সম্ভব হবে?

থিসিস বাংলা অভিসন্দর্ভ খুবই চমৎকার শব্দ, কিন্তু থিসিস বললে কলেজপড়–য়া ছেলেটি যা অনুমান করে নিতে পারে, অভিসন্দর্ভ কি তাকে সে ধারণা দেয়? আমি যখন গরম পানিতে টি-ব্যাগ চুবাই, তারপর যে ঘটনাটি ঘটেভেতর থেকে চায়ের নির্যাস ব্যাগ চুঁইয়ে চুঁইয়ে গরম পানির সঙ্গে মিশে যায় একটি মাত্র বাংলা শব্দ ব্যবহার করে আমি কি এ পরিস্থিতিটির বর্ণনা করতে পারব? কিন্তু ইংরেজিতে সম্ভব।

আমি ইংরেজি থেকে বাংলা, বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদও করি। বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের সময় আমার কাক্সিক্ষত শব্দ এবং বাক্যবিন্যাস যত সহজে পাই, ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদে উপযুক্ত এবং কাক্সিক্ষত শব্দের জন্য অনেক বেশি হা-পিত্যেশ করতে হয়। বাংলা ভাষার দুর্বলতাগুলো মেনে নিয়ে ভাষাটার যুগোপযোগী সমৃদ্ধি ঘটানো প্রয়োজন, নতুবা আমরা আরও অনেক পিছিয়ে যাব।

বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় শক্তি এর বর্ণ, শব্দ, বাক্য গীতিময়তা, ধারণক্ষমতা ইত্যাদির কোনোটিই নয়। সবচেয়ে বড় শক্তি বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী বিশাল জনগোষ্ঠী। কোনো ভাষার প্রশংসনীয় যেসব গুণাগুণের কথা বলা হয়, তার সবই ছিল ল্যাটিন ভাষার, সবই ছিল হিব্রুর, এমনকি সংস্কৃত ভাষারও। কিন্তু তিনটি ভাষাই কার্যত মৃত, কারণ এ ভাষার বাস্তব ব্যবহারের জনগোষ্ঠী নেই। গবেষকের পাঠে ভাষা টিকে না। অসাধারণ সাহিত্যকর্মও ভাষা টিকিয়ে রাখতে পারে না। ভাষায় টিকিয়ে রাখে ভাষা ব্যবহারকারী মানুষ। কেবল বয়স্ক মানুষ ব্যবহার করে, তাহলে কি ভাষা টিকবে? প্রশ্নই আসে না। এ ভাষাও ভয়ংকর বিপদাপন্ন।

ভাষাবিজ্ঞানীরা ২০০০ সালে ভাষার বিপণ্নতার একটি শ্রেণিবিন্যাস করেছেন :

১. সংকটাপন্ন ভাষা : যে ভাষা ব্যবহারকারী সবার বয়স ৭০-এর বেশি, অধিকাংশই প্রপিতামহ।

২. তীব্র বিপন্ন ভাষা : যে ভাষা ব্যবহারকারী সবার বয়স ৫০-এর বেশি, পিতামহের বয়সী।

৩. বিপন্ন ভাষা : যে ভাষা ব্যবহারকারী সবার বয়স ২০-এর বেশি, পিতা-মাতার বয়সী।

৪. ক্ষয়িষ্ণু ভাষা : শিশুদের কিছু অংশ যে ভাষা ব্যবহার করে, অন্য শিশুরা করে না, তবে বড়রা করে।

৫. হুমকিগ্রস্ত ভাষা : ভাষা ব্যবহারকারী শিশুর সংখ্যা কমে আসছে।

৬. আপাতত নিরাপদ ভাষা : শিশুরা সবাই যে ভাষা ব্যবহার করছে। এতে নিশ্চিত থাকার কোনো কারণ নেই। এই ভাষায় শিশুদের ধরে রাখতে না পারলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই ভাষাই হুমকিগ্রস্ত বা ক্ষয়িষ্ণু ভাষায় পরিণত হতে পারে।

এই বিন্যাসটিকে সামনে নিয়ে যে কথা বলব তা হচ্ছে ষাটোর্ধ্ব আমি কিংবা আমার সমকালীন কিংবা আরও কুড়ি বছর কনিষ্ঠ সবাই বাংলা ভাষার জন্য কী করলাম, কতটা অবদান রাখলাম, এগুলো সব অর্থহীন হয়ে পড়বে, যদি শিশুরা বাংলাচর্চা অব্যাহত না রাখে।

এবারের প্রশ্নটি সম্ভবত ভাষাশিক্ষার ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর হয়ে কেউ যদি আমাদের প্রশ্ন করেন : বাংলাচর্চা করে কী লাভ? আমাদের কাছে কি সততার সঙ্গে বলার মতো কোনো জবাব আছে?

যে শিশুটি ইংরেজি মাধ্যমে ভালো করে পড়াশোনা করছে, কেবল যদি চাকরি পাওয়ার মাপকাঠিতে হিসাব করি, তাহলে এই শিশুটির চাকরির সুযোগ তুলনামূলক বেশি, ভালো চাকরির সুযোগও বেশি, বিদেশে বেশি বেতনের চাকরিতে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি। তাহলে বাংলা ভাষার জন্য আমার উথলে ওঠা আবেগের খেসারত সেই শিশু দেবে? সম্ভবত একটি সৎ উত্তর হতে পারে, তাকে দুটো ভাষাই ভালো করে শিখতে হবে, যদি ইংরেজি তাকে বেশি সুযোগ দেয় সেদিকেই যাবে।

ভালো বাংলা জানা প্রার্থীকে চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এমন বিজ্ঞপ্তি কখনো কারও চোখে পড়েছে? আর একটি সমাধান বাংলা ভাষার আর্থিক গুরুত্ব বৃদ্ধি করা, তাত্ত্বিকভাবে এ কথা বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবে এটা সহজে হওয়ার নয়। ত্রিধারার শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি মাধ্যম এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বাংলা ভাষার উন্নয়নে বিশাল অবদান রাখবে এ প্রত্যাশা যৌক্তিক নয়। অবশ্য বাংলা মাধ্যম প্রধান ভরসা কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মধ্যবিত্ত এবং এমনকি নিম্নমধ্যবিত্ত বাবা-মাও তাদের সন্তানের জন্য ইংরেজি মাধ্যমই পছন্দ করছেন।

আমার রচনাটিতে হতাশার যে চিত্রটি ভেসে উঠছে তা হয়তো এখনকার জন্য দুশ্চিন্তার নয়, হয়তো আরও পঞ্চাশ বছর কি একশ বছরের জন্যও তেমন আশঙ্কার নয় তারপর কথাগুলো সত্য হতে শুরু করবে। আমি জেনেশুনেই বলছি এখনকার নামিদামি বাঙালি লেখকদের বই তাদের নাতি-নাতনিরা পড়তে পারে না, কারণ তারা কবিতা ও উপন্যাস পড়ার মতো বাংলা শেখেনি। আর পঞ্চাশ বছর পর লেখকদের সন্তানদের অনুবাদ করে বাবার বা মায়ের লেখা বইয়ের কাহিনী শোনাতে হবে যদি তারা শুনতে আদৌ আগ্রহী হয়।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক