মন্ত্রিসভায় ৩ আইনের খসড়া অনুমোদন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে পর্যালোচনার নির্দেশ

করোনা মহামারীর মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে কি-না, আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে শিগগিরই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব এ তথ্য জানান।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মন্ত্রীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠকে বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভস আইন, বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন, বাংলাদেশ শিল্প-নকশা আইন এবং আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট  (আইভিআই) প্রতিষ্ঠার চুক্তি অনুসমর্থনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ডেকে আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্তে আসতে বলা হয়েছে। তারা পর্যালোচনা করবে কখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে। দ্রুত খোলা যায় কি-না, কী পদ্ধতিতে খুলবে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে। নিরাপত্তা ও লেখাপড়া সবই ঠিক রাখতে হবে। সেইসব দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন ‘আপনারা বসে চিন্তাভাবনা করেন আমরা খুলে দিতে পারি কি-না।’ শিক্ষক ও কর্মচারীদের ভ্যাকসিন নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এমনটাই জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা গেট ভেঙে হলে প্রবেশ করছেন। এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছি কি-না এ প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আনোয়ার বলেন, ‘এটা আলোচনা হয়েছে যে, যারা আবাসিক শিক্ষার্থী তাদের নিরাপত্তাটাই হচ্ছে বড় ঝুঁকির বিষয়। তাদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কীভাবে স্কুল-কলেজ খোলা যায়, সেটা দেখার জন্য বলা হয়েছে।’

তবে কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘সরকার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এই সপ্তাহে না হলে আমরা আগামী রবি-সোমবারের মধ্যে বসব। বিশেষজ্ঞ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসনের সবাইকে নিয়ে বসে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারব। একটা আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হবে। সরকার খোলার পরিবেশটা পর্যালোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। দফায় দফায় তা বাড়িয়ে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

জাতীয় আর্কাইভস আইন : আর্কাইভসের ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল ও ১ লাখ টাকা অর্থদ- রেখে ‘বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভস আইন, ২০২১’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ১৯৮৩ সালের অর্ডিনেন্স দিয়ে জাতীয় আর্কাইভস পরিচালনা করা হচ্ছে। জাতীয় আর্কাইভস পরিচালনায় একটি উপদেষ্টা পরিষদ থাকবে। এখানে একজন মহাপরিচালক থাকবেন, অধ্যাদেশে এ মহাপরিচালক ছিলেন না। খসড়া আইনে রেকর্ড নষ্ট করার যে বিধান ছিল তা বাদ দেওয়া হয়েছে। যত রেকর্ড থাকবে কালিয়াকৈরের ডাটা সেন্টারে রাখতে হবে। দেশের সব রেকর্ডরুমে যা আছে সেগুলোকে নির্দিষ্ট সময় পরে আর্কাইভে জমা করতে হবে। নির্দিষ্ট ফি দিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলে কর্তৃপক্ষ আর্কাইভস সামগ্রী সরবরাহ করবে। তবে গোপন কোনো দলিল সরবরাহ করা হবে না।

পেটেন্ট আইন : শাস্তি বাড়িয়ে ‘বাংলাদেশ পেটেন্ট আইন, ২০২১’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বর্তমান পেটেন্ট ও ডিজাইন আইন ১৯১১ সালের। পরে ২০১৬ সালে আইনটিকে দুই ভাগ করে একটি পেটেন্ট আইন, অপরটি ডিজাইন আইনে রূপান্তর করা হয়। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী নতুনত্ব ও উদ্ভাবনী বিষয় থাকলে প্রযুক্তিগত যেকোনো পণ্য উদ্ভাবনী পেটেন্ট যোগ্য হবে। নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কোনো একটি পেটেন্টের একক বা যৌথ উদ্ভাবনকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উদ্ভাবকের পেটেন্টের সুরক্ষা দেওয়া হবে। পেটেন্ট মালিক ২০ বছরের জন্য পেটেন্ট রাইট পাবেন। ২০ বছর পর এটা পাবলিক সম্পদ হয়ে যাবে।

শিল্প-নকশা আইন : বৈঠকে ‘বাংলাদেশ শিল্প-নকশা আইন, ২০২১’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। শিল্প-নকশার নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। বিশেষায়িত কোনো শিল্প-নকশার জন্য আবেদন সাপেক্ষে আরও পাঁচ বছরের মেয়াদ বাড়ানো হবে।

আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট : আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউট (আইভিআই) প্রতিষ্ঠার চুক্তি অনুসমর্থনের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ১৯৯৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটের চুক্তি হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে। এর পূর্ণ সদস্য হওয়ার জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন প্রয়োজন। পূর্ণ সদস্য হলে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং এ সম্পর্কিত গবেষণা, প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা পাওয়া যাবে। এতে দেশের ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়বে। নতুন আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনের প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশে নতুন ভ্যাকসিন উৎপাদন আরও সহজতর হবে। এতে স্বল্পমূল্যে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ভ্যাকসিনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন যোগ্যতা অর্জনের পথও সুগম হবে, যা বিদেশে বাংলাদেশের ভ্যাকসিনের বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।

বৈঠকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ও নয়াদিল্লির জাতীয় জাদুঘরের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ে মন্ত্রিসভাকে অবহিত করা হয়। এ ছাড়া অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে মন্ত্রিসভা।

বাঙালি ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমেই সবকিছু অর্জন করেছে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাঙালির ভাষা আন্দোলন কেবল ভাষার জন্যই আন্দোলন ছিল না বরং এ আন্দোলন ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই ভাষা আন্দোলন আমাদের বাঙালি জাতি হিসেবে সার্বিক অর্জনের আন্দোলন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল বিকেলে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির ভাষণে এসব কথা বলেন। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘১৯৫২ সালের আন্দোলন কেবলমাত্র ভাষা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এ আন্দোলন ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।’ ১৯৭১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে শহীদ মিনারে জাতির পিতা প্রদত্ত ভাষণের উদ্ধৃতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সেটা আমাদের করে দিয়ে গেছেন, যেটা ধরে রেখে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

তিনি বলেন, ’৫২তে রক্ত দেওয়ার পরই বাংলা ভাষা রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছিল তা কিন্তু নয়। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারেও যেমন এই রাষ্ট্রভাষার কথা বলা হয়েছিল এবং ’৭০-এর নির্বাচনেও এই রাষ্ট্রভাষার কথা আসে। কারণ ’৫৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তখন যে শাসনতন্ত্র করা হয় তাতে উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ’৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অনশনরত অসুস্থ বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে বের করে তার দাদা টুঙ্গিপাড়া নিয়ে গেলেও সুস্থ হয়ে ফিরেই পুনরায় ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আবারও আন্দোলন শুরু করেন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদানের দাবি তখন জাতির পিতা তার বিভিন্ন ভাষণে করে গিয়েছেন। তিনি ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস জানার জন্য পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়ে প্রকাশিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ সিরিজের বইগুলো পড়ে দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমি চাই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এটা পড়বেন। তাছাড়া যারা গবেষণা করেন তাদেরকে বলব মহামূল্যবান দলিল আপনারা এখানে পাবেন।’

দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনুষ্ঠানে প্রারম্ভিক বক্তৃতা করেন। অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, শিক্ষা এবং মানব সম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক শামসুন্নাহার চাপা, সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান এবং দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফি। দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ আলোচনা সভাটি গণভবন থেকে সঞ্চালনা করেন।