‘‘আই তো ইয়োরে ওয়ান্টিনি লাইফে, ইউ তো পুওরে ওয়ান্টেছ”, ইংরেজির ভেজাল মেশানো ‘বাংরেজি’ এই ‘প্যারোডি’ (ব্যঙ্গ) গান লিখেছিলেন সেকালে দাদাঠাকুর নামে খ্যাত শরৎ চন্দ্র পণ্ডিত (১৮৮১-১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ)। রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে পাবেন ‘ইউটিউব’-এ। জনপ্রিয় মূল গানটি ছিল রজনীকান্ত সেনের (১৮৬৫-১৯১০ খ্রিস্টাব্দ) “আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে, তুমি অভাগারে চেয়েছ;”। সমাজের অসংগতিকে বিদ্রুপাঘাত করতেই ব্যঙ্গ রচনা। ‘বাংরেজি’ বলার ঢং (‘ফ্যাশন’) উঠেছিল সমাজে। শুরুটা কি হয়েছিল আদালতে! সেকালে ঢেঁকির বিরোধ নিয়ে বেড়ার ধারে মারামারির সাক্ষী উঠেছে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে। ম্যাজিস্ট্রেটের জিজ্ঞাসাহোয়াট ইজ ‘বেরা’? মোক্তারবেড়া ইজ নাথিং স্যার বাট বাউন্ডারি। সাম বাম্বু খাড়া খাড়া, আদার বাম্বু পাথাল থোড়া, ইজ কল্ড বেড়া।
সাহেব ম্যাজিস্ট্রেটহোয়াট ইজ ‘ঢেংকি’? মোক্তারঢেঁকি ইজ নাথিং স্যার বাট ওয়ান কাইন্ড অফ রাইস মিল। টু ওমেন ধাপাড়-ধুপুড়, ওয়ান ওম্যান খাওজানিং, ইজ কল্ড ঢেঁকি। সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট ওঃ, নাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড।
সাধ করে তো মোক্তার সাহেব এই ভেজাল মেশাননি। পেটের দায়ে অতিকষ্টে সাহেবকে ঢেঁকি বোঝাতে হয়েছিল ও-ভাবে। কিন্তু, ভেজাল মেশানো ‘বাংরেজি’ ঠাঁট (‘ফ্যাশন’) হয়ে গেল সমাজে। ব্যঙ্গ করতেও ছাড়েননি কবি-গীতিকাররা। দাদাঠাকুরের এরকম ‘বাংরেজি’ আরও ব্যঙ্গ-গান আছে, পাবেন ‘ইউটিউব’-এ। সেই উদ্ভট বোল থামেনি তাতে। পরবর্তীকালে কাজী নজরুল ইসলামও (কর্মকাল ১৯১৯–১৯৪২ খ্রিস্টাব্দ) লিখেছেন, “রবো না কৈলাসপুরে আই অ্যাম ক্যালকাটা গোয়িং”। ‘বাংরেজি-ভাইরাস’ মহামারী হয়ে এখন সমাজ-শরীরে ‘অ্যান্টিবডি’ হয়ে গেছে। উপহাস করতে গেলে উপহাসেরই পাত্র হতে হবে। ব্যঙ্গ রচনা আর হবে কী করে!
আগে চলত ‘ইংরেজী’, এখন চলে না ‘ইংরেজি’ না লিখলে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৩৬ সালে ‘বাঙ্গালা বানানের নিয়ম’ করে স্ত্রীলিঙ্গ এবং জাতি, ব্যক্তি, ভাষা ও বিশেষণ-বাচক অ-তৎসম শব্দেও ঈ-কার চল রাখে। আমাদের ‘বাংলা একাডেমী’ (হালে, একাডেমি) শুধু নিজের ঈ-কারটা ঠিক রেখে অ-তৎসম সবার ই-কার হ্রস্ব করে ১৯৯২ সালে ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ বানিয়ে এবং সে-অনুসারে ১৯৯৪ সালে ‘বাংলা বানান-অভিধান’ দিয়ে। ‘বাঘিনী’ হয়েছে ‘বাঘিনি’; তেজ পরখের সাহস কার, সংখ্যায় নাকি হ্রাস পাচ্ছে! ‘পন্থী’ হলো ‘পন্থি’, এখন বামপন্থির সবই হ্রসমান ‘হাওয়াপন্থি’-র রমরমাতে। ‘সয়তান’ ঠিক করেছে ‘শয়তান’ করে। ‘অফিস’ বহাল রেখে ‘পুলিশ’ করেছে ব্যতিক্রমে। ‘বাংলা’ ও ‘বাংলাদেশ’ লিখতে বলেছে, কারণ, সংবিধানে তাই আছে। সংবিধানে তো ‘বাঙালী’ ও ‘বাংলাদেশী’ লেখা এখনো, অভিধানে যে ‘বাঙালি’ ও ‘বাংলাদেশি’ হলো! সব ই-কার হ্রস্ব করে ‘ক’-এ ঈ-কার আমদানি করেছে সর্বনাম, বিশেষণ ও ক্রিয়া-বিশেষণ পদের যুক্তিতে। ‘বাঙালী’ এখন ‘বাঙালি’ হয়ে চারদিকে ‘ইংরেজি’ দেখে ‘কী’ ‘কী’ করছে! তাতে ঈ-কার হারানো ‘ইংরেজি’-র ‘কিবা’ বিক্রিয়া হচ্ছে! বিকার বাড়ছে বাংলায়। এখন ‘সাক্ষ্য’, ‘প্রমাণ’, ‘গ্রহণ’, করানোই মুশকিল; অনেকেই শুধু ‘স্বাক্ষ্য’, ‘প্রমান’, ‘গ্রহন’ করে! ‘কৌঁসুলি’-কে ‘কৌশুলী’ লেখে। ‘দৃস্টি’, ‘বৃস্টি’, ‘সৃস্টি’-তে হচ্ছে অনাসৃষ্টি। ‘দুক্ষ’ দেখে ‘দুঃখ’ লাগে। ‘জীবন’ যায় ‘জিবন’-এ। ‘শূন্য’ হারায় ‘শুন্য’-তে। লেখা ‘পরা’, আর মাস্ক ‘পড়া’ দেখে ‘পরবেন’ নাকি ‘পড়বেন’ আকাশ থেকে! ‘রাষ্ট্র’-কে ‘রাস্ট্র’ বানিয়ে শেষ করছে।
বাঙালিকে আইন, অভিধান, সংবিধান মানানো কি এতই সোজা! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্ষদ ১৯৬৭-তে বাংলা ভাষা সোজা করতে ‘সরলায়ন’ কমিটি করেছিল। ১৯৬৮-র ফেব্রুয়ারিতে সুপারিশ দিলে কমিটির সদস্য হয়েও ডক্টর এনামুল হক, আবদুল হাই ও মুনীর চৌধুরী বিরোধিতা করে ২৪ ফেব্রুয়ারি যুক্ত বিবৃতিতে বলেছিলেন“এইরূপ কাজে হাত দিলে নিশ্চিতরূপে ভ্রান্তি বিভ্রান্তিতে পরিণত হইবে এবং পূর্ব-পাকিস্তানের ‘বাঙলা’ ভাষার দ্রুত উন্নয়ন বিশেষভাবে ব্যহত হইবে।” নিশ্চিত সেটাই হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। সঙ্গে বেড়েছে ইংরেজির বাতিক আরও। যে পারে সে ছাড়ে না কিছুতেই, পারে না যে সেও ইংরেজি আঁকড়ায় বিশ্বায়ন আর তথ্য-প্রযুক্তির হুজুগে। পাকিস্তানি জমানার শুরুতে ১৯৪৯ সালে কমিটি বানিয়ে ‘পাকিস্তানের মানুষের প্রতিভা ও কৃষ্টির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ’ করতে আরবি অথবা রোমান হরফে বাংলালিপি বানাবার চেষ্টা হয়েছিল, ব্যর্থ করেছিল বাঙালি। স্বাধীন বাঙালি ডিজিটালের ‘এসএমএস’, ‘স্ট্যাটাস’, ‘কমেন্টস’-এ বাংলাবুলিটাও লেখে রোমান হরফে (ইংরেজি হরফ আদতে রোমানই)। বাংলা কিছু লেখে শুধু একুশে গ্রন্থমেলাতে। বাঙালি কেন বাঙালিকে ইংরেজির ঠাঁট দেখাবে! দেখাবার আর জায়গা নেই, তাই কিলায় ভূতে!
সাবেক ব্রিটিশ-ভারতের দেশগুলোতে ইংরেজির প্রসঙ্গ উঠলে ‘ম্যাকলের সন্তান-সন্ততি’ ((Macaulay’s Children) কথা আসে। ব্রিটিশ-ভারতে সরকারিভাবে ইংরেজি চালুর আসল কারিগর Thomas Babington Macaula-এর নাকি ঔরসজাত কোনো ছেলেপুলেই ছিল না। বিয়েই করেননি সাহেব, খাসলতের বদনামিও রটেনি। তার চিন্তাধারা এ-সব দেশের যারা অন্তরে বয়ে বেড়ায় কালে কালে, তারাই ধর্মসন্তান হয়ে সন্তানের অভাব পূরণ করেছে ম্যাকলের। গভর্নর জেনারেলের কাউন্সিলের প্রথম Law Member হয়ে ১৮৩৪-এ ভারতে এসে ১৮৩৫-এর ফেব্রুয়ারিতে রিপোর্ট দেন ফারসি উঠিয়ে অফিস-আদালতে এবং সংস্কৃত ও ফারসি উঠিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষাতে ইংরেজি চালুর বুদ্ধি দিয়ে। (বাংলার ঠাঁই আগেও ছিল না এ-সবে) তাইতে প্রথম গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিংক English Education Act-1835 জারি করেন।
১৮১৩ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘চার্টার’ (সনদ) নবায়ন হয়েছিল ২০ বছরের জন্য, ভারতীয়দের শিক্ষার পেছনে কোম্পানিকে বছরে এক লাখ রুপি খরচ করার শর্তটাও ছিল। কোম্পানি খরচ কিছু করত ফারসি ও সংস্কৃতের পেছনে। ১৮৩৩-এ আরও ২০ বছরের জন্য ‘চার্টার’ নবায়ন হয়। এবারে ম্যাকলের কথা, ভারতীয়রা অ-মাতৃভাষাতেই (ফারসি ও সংস্কৃত) যদি শেখে তবে ইংরেজিই উত্তম। কারণ, ভারতীয় ও আরব্যদের তাবৎ বিদ্যার চেয়ে ইউরোপীয় যে-কোনো ভালো গ্রন্থাগারের একটা তাকও বেশি সমৃদ্ধ (a single shelf of a good European library was worth the whole native literature of India and Arabia.)। সীমিত সামর্থ্যে তাবৎ ভারতীয়কে শেখানো অসম্ভব। তাই, কোটি কোটি মানুষের ওপর শাসন জারি রাখতে সর্বসামর্থ্য লাগাতে হবে এক জাতের দোভাষী লোক বানাতে, যারা শরীরের রক্তে ও চামড়ার রঙে ভারতীয় হয়েও প্রবণতায়, চিন্তায়, চেতনায় ও মস্তিষ্কে হবে ইংরেজ। সেই জাতের কাছেই তাদের মাতৃভাষার উন্নয়নভার ছাড়া হবে, তারাই পশ্চিমা ভাণ্ডার থেকে নিয়ে নিজেদের জ্ঞানবিজ্ঞানে লাগিয়ে গোটা জনগোষ্ঠীর জ্ঞানার্জনের উপযোগী করবে (“We must at present do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern,– a class of persons Indian in blood and colour, but English in tastes, in opinions, in morals and in intellect. To that class we may leave it to refine the vernacular dialects of the country, to enrich those dialects with terms of science borrowed from the Western nomenclature, and to render them by degrees fit vehicles for conveying knowledge to the great mass of the population.’’ Minute on Indian Education, Feb, 1835)
ইংরেজি তাই পিতৃভাষা ম্যাকলের ধর্মসন্তানদের। পিতৃভাষাই বড় তাই মাতৃভাষার চেয়ে, বোধে আসে না রাষ্ট্রভাষা। পশ্চিমা ভাণ্ডার থেকে জ্ঞানবিজ্ঞান নিয়ে মাতৃভাষায় কাজে লাগাবার পিতৃ-ইচ্ছার শেষ কথাটা মনেই ধরে না দু-শো বছর, অর্থকরী পিতৃভাষার টানে। রাজভাষা ইংরেজিকে হেলা করে মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ে ইংরেজ রাজত্বে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার স্বাধীন দেশে বাংলার কদর করলেই পিছিয়ে পড়তে হবে! ৫০টা বছর কম নয় জীবনে। আর ৯টা বছর বেশি হলেই সরকারি লোক কর্মশক্তি ফুরিয়ে যায় অবসরে।
রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন-সংগ্রামের ভিতের ওপর গড়া আমাদের বাংলা একাডেমি, যেমন আমাদের বাংলাদেশ। ই-কার উ-কারের দৈর্ঘ্য মাপার চেয়ে আসল কাজটা ছিল রাষ্ট্রের সব কাজে বাংলাকে বসাবার মাল-মসলা জোগানো। আইনেই আছে শুরু থেকে। ৩ ডিসেম্বর ১৯৫৫ থেকে তার কিছুটা হলেও আইন-জ্ঞানবিজ্ঞানওয়ালাদের বইপুস্তক আর পরিভাষার অজুহাত কমত। শুনছি, এখন নাকি বাঙালির লেখা ইংরেজির বাংলা-অনুবাদ করবে সফটওয়্যারে। পিতৃভাষাই আগে থাকবে মাতৃভাষার চেয়ে, রাষ্ট্রভাষাটা কোথায় রবে! বাঙালিকেই উল্টো এখন ইংরেজি থেকে ‘ঢেঁকি’ বুঝতে হবে ডিজিটালের সফটওয়্যারের কাছে। মাতৃভাষার মাধুরী মেশিনে মেশাবে! দিনে দিনে রস হারিয়ে বাঙালি যে কথাবার্তায় কর্কশ হচ্ছে! “যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী / সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।” (আবুল হাকিম, ১৬২০-১৬৯০ খ্রিস্টাব্দ) মন্ত্রটা সত্যিই ইংরেজি-ভূত-ঝাড়া নয়! “বিনে স্বদেশীয় ভাষা পুরে কি আশা!” বলেছিলেন নিধুবাবু (রামনিধি গুপ্ত, ১৭৪১-১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ) শুধু বাংলায় ‘টপ্পা’ বাঁধতে! ইংরেজির মোহে ধর্মত্যাগী, দেশত্যাগী ব্যর্থ মাইকেল শেষে ‘দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন’ (১৮২৪-১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ) হয়ে “মাতৃভাষা-রূপে খনি” পেয়েছিলেন শুধু বাংলায় সমাধি পেতে!
শুনছি, ইংরেজি মাধ্যমের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও হবে। পরপারে বসে ম্যাকলে সাহেব মাথা কুটবেন (ছেঁড়ার মতো চুল অবশিষ্ট ছিল কিনা সঠিক জানা নেই!) সে-কথাটা কেন গিয়েছিলেন ভুলে! “মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!” (অতুলপ্রসাদ সেন, ১৮৭১-১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ) ছেড়ে গাইতে হবে দাদাঠাকুরের প্যারোডি “তোমার বাঁচার নাইকো আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!” এটাও পাবেন ‘ইউটিউব’-এ।
লেখক প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক
moyeedislam@yahoo.com