দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যে চার উদ্ভাবনে গতি এনেছিল

যুদ্ধের ভয়াবহতা সভ্যতাকে পিছিয়ে দেয়। তবে যুদ্ধের সময়ে অনেক যুগান্তকারী উদ্ভাবনও হয়েছে। সেগুলো সভ্যতাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নতুন মাত্রা পাওয়া এমনই চার উদ্ভাবন নিয়ে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

জেট ইঞ্জিন

১৯৪৪ সালের ২৬ জুলাই রয়্যাল এয়ার ফোর্স 544 Sqn-এর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট এ ই ওয়াল জার্মানির মিউনিখে একটি পুনরুদ্ধার মিশনে তার de Havilland Mosquito বিমানটি উড়িয়ে যাচ্ছিলেন। এই বিমানটি ছিল সে সময়ের সবচেয়ে দ্রুততম বিমানের একটি। যদিও এটি ছিল নিরস্ত্র। প্রায় ৩০ হাজার ফুট ওপর দিয়ে এটি উড়তে সক্ষম ছিল। ওয়াল ও তার সহযোগী পাইলট অফিসার এ এস লোবান ভাবেননি যে অন্য কোনো বিমান তাদের পথরোধ করতে পারে। যুদ্ধ তখনো কঠিন রূপ ধারণ করেনি, সেই সঙ্গে তারা ভেবেছিলেন আকাশপথে কোনো ঝামেলা হলেও তারা সামলে নিতে পারবেন। বড় কোনো সমস্যা হবে না এমনটাই তারা ভেবেছিলেন। হঠাৎ করেই লোবানের নজরে পড়ল একটি শত্রুবিমান খুব কাছে চলে এসেছে। ওয়াল ইঞ্জিন চেপে ধরলেন। চেষ্টা করলেন ৪০০ মাইল বেগে বিমান ঘুরিয়ে নিচ দিক দিয়ে যেতে। দুজনেই অবাক হয়ে খেয়াল করলেন, বিমানের এই গতি যথেষ্ট নয়। চোখের পলকে শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমানটি তাদের বিমানটিকে দেখে ফেলল। তাদের দিকে আক্রমণ শুরু হলো অপর বিমান থেকে গুলি ছোড়ার মাধ্যমে। প্রায় ১৫ মিনিট যুদ্ধ চলল। নিরস্ত্র মসকুইটো কোনোভাবে নিজেদের বাঁচিয়ে পালিয়ে এলো। বিমানের কিছুটা ক্ষতি হলেও ওয়াল ইমার্জেন্সি ল্যান্ড করে নিজেদের জীবন বাঁচান। ওয়াল ও লোবান সে মুহূর্তেই যুদ্ধক্ষেত্রের ইতিহাসে নতুন যুদ্ধবিমান  Messerschmitt Me 262 সম্পর্কে জানলেন।

জেট এয়ারক্রাফটের উন্নতি নিয়ে সবার আগে ভেবেছিল নাৎসিরাই। ১৯৩৯ সালের ২৭ আগস্ট (যুদ্ধ শুরুর মাত্র পাঁচ দিন আগে) তারা বিশ্বের সর্বপ্রথম জেট এয়ারক্রাফট Heinkel He 178  তৈরি করে। Me 262 (Projekt 1065 নামেও পরিচিত) এর কাজও শুরু হয় যুদ্ধের আগেই। যুদ্ধবিমানের অগ্রগতি থেমে ছিল মূলত প্রযুক্তিগত আর রাজনৈতিক বেশ কিছু কারণে। এই বিমানের মূল নকশা কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে এটি নিয়ে কাজ থেমে থাকেনি। ১৯৪২ সালের ১৮ জুলাই Me 262 (বর্তমানে এর তৃতীয় ভার্সন চলছে) প্রথমবারের মতো আকাশে ওড়ে। ১৯৪৪ সালের আগে এটির নিয়মিত নির্মাণকাজ হয়নি।

Me 262-কে বোমারু হিসেবে ব্যবহার করার জন্য অনুমতি দিয়েছিলেন হিটলার। যার কারণে বোমারু দলে জেট বোমারু বিমানের সংখ্যা ছিল বেশি। তবে সবগুলোর মধ্যে বোমারু হিসেবে Me 262-এর কার্যকারিতাই ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে প্রথমবার আকাশে ওড়ার দুই সপ্তাহ পর প্রথম হত্যাকা-ে অংশ নেয় এই জেট বিমান। মাস শেষে জার্মান পাইলটরা দাবি করে নিজেদের ছয়টি জেট হারলেও ১৯টি যুদ্ধবিমানকে হারিয়েছে। এই বিমানের পর জার্মানিরা জেট বোমারু Arado Ar 234 তৈরি করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংল্যান্ডের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া শেষ শত্রু বিমান এটি। যুদ্ধ শেষে নাৎসিরা এক ইঞ্জিনের প্লেন Heinkel He 162 ১৬২ নামে আরও একটি জেট বোমারু বিমান তৈরি করে। লড়াইয়ের অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে অন্যান্য যুদ্ধ বোমারু বিমান আকাশে উড়লেও  Heinkel কখনো মারাত্মক কোনো হুমকির মুখোমুখি হয়নি। যুদ্ধবিমান তৈরিতে সেরা হলেও ফুয়েলের অভাবের কারণে অবশ্য জার্মানিদের কিছুটা বেগ পোহাতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, যুদ্ধময়দান ছাড়া বেসামরিক অঙ্গনেও জেট ইঞ্জিন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

রাডার

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর সকালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়োয়ে অবস্থিত সেনাবাহিনীর রাডারে একটি সিগন্যাল ধরা পড়ে। রাডার অপারেটর তথ্যটি জানাতে দ্রুত ছুটে যান উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে। তাকে গিয়ে জানান, রাডারের সংকেত অনুযায়ী কিছু বিমান এগিয়ে আসছে পার্ল হারবারের দিকে। আর এটি সত্য হলে বিমান হামলার মুখোমুখি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান ও নৌ-ঘাঁটিটি। কিন্তু তরুণ অপারেটরের কথার কোনো গুরুত্ব দেননি কর্মকর্তারা। এর মূল কারণ ছিল কেউই আসলে তখন পার্ল হারবারে আক্রমণের আশা করেনি। তারা ভেবেছিল অনভিজ্ঞ অপারেটর হয়তো ভুলভাল কোনো কিছু দেখেছে অথবা সেগুলো আমেরিকান কোনো বিমানই হবে। এটি ছিল পার্ল হারবারে জাপানের বিমান আক্রমণের এক ঘণ্টা আগের কথা। সে সময় রাডারের তথ্যের ওপর ভরসা করে যদি তারা প্রস্তুতি নিতেন, তাহলে হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস আজ অন্যরকম হতো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক আগে থেকেই রেডিও ওয়েভ ব্যবহার করে কোনো বস্তুকে চিহ্নিত করার বিষয়টি নিয়ে কাজ করে আসছিলেন বিজ্ঞানীরা। যেমন : ১৯০৪ সালে জার্মানিতে আবিষ্কৃত হয় টেলিমোবাইলোস্কোপ নামক একটি ডিভাইস, যা জাহাজের সংঘর্ষ প্রতিরোধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর রেঞ্জ ছিল প্রায় তিন হাজার মিটার। ১৯২৫-২৬ সালে আমেরিকান ও ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা রেডিও ওয়েভ ব্যবহার করে পৃথিবীর আয়নোস্ফিয়ারের পরিমাপ করেন। এটিকে আদি রাডার বলা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে প্রায় সব দেশই গোপনে রাডার টেকনোলজির ওপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিল। জাপান, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নেদারল্যান্ডসের হাত ধরেই মূলত আধুনিক রাডারের উৎপত্তি ঘটে। রাডারের কারণে শত্রুদের আক্রমণের তথ্য আগেই পাওয়া যেত, যার কারণে আর্মিরাও নিজেদের প্রস্তুত করার জন্য বেশখানিকটা সময় পেতেন। এই রাডার ব্যবহারে পিছিয়ে ছিল না হাঙ্গেরি, কানাডা, সাউথ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া অথবা নিউজিল্যান্ড কেউই। রাডারের ব্যাপক উৎপাদন সর্বপ্রথম সোভিয়েত ইউনিয়নে শুরু হয়। লেলিনগ্রেড ইলেক্ট্রোফিজিক্যাল ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী পি. কে. ওশেপেকভ ১৯৩৪ সালে, তার তৈরি রাডার দিয়ে তিন কিলোমিটার দূরের বিমান ডিটেক্ট বা শনাক্ত করতে সক্ষম হন। তার এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই বছরে  RUS–1 ব্যাপকভাবে উৎপাদন করা হয়ে।  RUS–2-এর দেখা মিলেছিল ১৯৩৯ সালে ওশেপেকভেরই হাত ধরে। তবে এরপর ভিন্ন একটি কারণে ওশেপেকভ গ্রেপ্তার হওয়ায় রাডারের উন্নয়ন প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। প্রথম এয়ারবর্ন রাডার ‘জেনেসিস ২’ তৈরি হয়েছিল এই সোভিয়েত ইউনিয়নেই। যেটা ব্যবহার হয়েছিল পেতলাকভ পি-টু ডবল ইঞ্জিন বিমানে। পি-টু মূলত একটি হালকা ধরনের বোমারু বিমান। আধুনিক রাডারের ব্যবহার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুরু হলেও বর্তমানে এর ব্যবহার ব্যাপক বিস্তৃত। বিশ্বের সব এয়ারপোর্টের গ্রাউন্ড স্টেশনে, সমুদ্রের যাত্রীবাহী জাহাজে, মিসাইল ডিটেকশন, শত্রুপক্ষের জাহাজ অথবা বিমান আক্রমণের আগাম তথ্য পেতে সব দেশেই অসংখ্য রাডার স্টেশন ব্যবহার করা হচ্ছে।

পারমাণবিক শক্তি

১৯৩০ এর দশক ছিল পদার্থবিজ্ঞানে দুর্দান্ত সাফল্যের একটি বছর। ১৯৩৩ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ড আবিষ্কার করেন একটি লিথিয়াম কণাকে বিভক্ত করতে প্রোটন accelerator ব্যবহার করা হয়। আর এই পদ্ধতিতে প্রচুর শক্তি ব্যয় হয়। এ তথ্য জানালেও রাদারফোর্ড নিজে অথবা আলবার্ট আইনস্টাইন ও নীলস বোর কেউই বিশ্বাস করতেন না যে খুব দ্রুত এই উদ্ভাবনের বাস্তবিক কোনো প্রয়োগ হবে। তবু পারমাণবিক রাজ্যের দুয়ার সব সময়ই ছিল প্রশস্ত। এ ঘটনার কয়েক বছর পর, ১৯৩৯ সালে, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারকে নিউক্লিয়ার গবেষণায় অর্থ প্রয়োগের জন্য চাপ দিতে থাকে। যুদ্ধ তখন দ্বার গোড়ায়। লক্ষ্যটা এমন কিছু ছিল না যে কম খরচে শক্তি অথবা কোনো অস্ত্র কিনতে হবে, বরং যুদ্ধ শেষে বিজয়ী নির্ধারণ করাটাই ছিল উদ্দেশ্য।

আমেরিকানরা এই তালিকায় এগিয়ে ছিল। কুখ্যাত ম্যানহাটন প্রকল্পের ফলাফল ইতিহাসের প্রথম অ্যাটম বোমা।১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমায় এই বোমা নিক্ষেপ করা হয় এবং এর তিন দিন পর নাগাসাকিতে। সরাসরি এই হামলায় আড়াই লাখের মতো মানুষ মারা যায়। এই হামলা ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল এর পরের প্রজন্মকেও। ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসে জয় নির্ধারণ হয়ে গেলেও এই নিউক্লিয়ার শক্তির কালো মেঘের ছায়া তখনো ছিল জাপানের ওপর। যারা এই হামলায় বেঁচেও গিয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগই স্বাভাবিক জীবনযাপনে আর ফিরতে পারেননি। পারমাণবিক শক্তি আসলেই কোনো নিরাপদ সমাধান কি না তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।

পেনিসিলিন

১৯২৮ সালে আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেছিলেন এ তথ্য সত্যি। তবে ১৯৩৯ সাল নাগাদ যত দিন এটি অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে ব্যবহার শুরু না হয়, তত দিন পর্যন্ত এর সঠিক গুরুত্ব কেউ বুঝতে পারেনি। পেনিসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক ছিল স্ট্যাফিলোকোক্কি ও স্ট্রেপটোকোক্কির কারণে তৈরি হওয়া ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের বিরুদ্ধে কাজ করা প্রথম ওষুধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাধারণ মানুষ যেখানে ভীষণ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে, ঠিক তখন কয়েকজন গবেষক দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন পেনিসিলিনকে কীভাবে ওষুধে রূপান্তরিত করা যায় তা নিয়ে। এ দলে ছিলেন বিজ্ঞানী ও অক্সফোর্ডের স্যার উইলিয়াম ডান স্কুল অব প্যাথোলজির ডিরেক্টর লর্ড হাওয়ার্ড ওয়াল্টার ফ্লোরে। পেনিসিলিন টিমের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তিনিই। মিত্রশক্তিকে তারা শেষ পর্যন্ত বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে পরমাণু গবেষণার মতো পেনিসিলিনও একটি অস্ত্র। তবে এটি মানুষ মারার নয়, বরং মৃতপ্রায় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার অস্ত্র। অন্যদিকে জার্মানির ল্যাবেও পেনিসিলিয়ামের মোল্ড নিয়ে পরীক্ষা হওয়ার কথাও চলছিল। কিন্তু তত দিনে হিটলারের উন্মত্ত ইহুদি ক্রোধ সে দেশে বৈজ্ঞানিক গবেষণার পুরো পদ্ধতিকে নষ্ট করে দিয়েছে। বহু ইহুদি বিজ্ঞানী ভয়ে দেশ ছেড়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন জার্মান জৈব রসায়নবিদ স্যার আর্নেস্ট বরিস চেন। নাৎসিদের ক্ষমতা দখলের পরই তিনি ইংল্যান্ডে পালিয়ে এসে যোগ দেন অক্সফোর্ডে ফ্লোরের গবেষণাগারে।

চেন ও রসায়নবিদ এডওয়ার্ড আব্রাহামের প্রথম কাজ ছিল পেনিসিলিনের বিশুদ্ধকরণ ও ঘণীকরণের সঠিক পদ্ধতিটি আবিষ্কারের। তাদের পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর পদ্ধতি প্রয়োগ করেন পুরো পেনিসিলিন টিমের মধ্যে প্রধান সংযোগকারী ও জৈব রসায়নবিদ নর্মান হিটলি। তার অদ্ভুত দক্ষতা ছিল যেকোনো সমস্যার সমাধানে যথাযথ উপায় বাতলে দেওয়ার ক্ষেত্রে। উৎপাদিত পেনিসিলিনকে পানিতে রেখে তার অম্লতা পরিবর্তন করে পেনিসিলিন উৎপাদনের হার বাড়িয়ে দেন তিনি। আবার পেনিসিলিন উৎপাদনের পাত্রের পরিকল্পনাও তারই। আর পদে পদে জার্মান আক্রমণের ভয়ের মধ্যে গবেষণা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার সমাধানে তিনি উপায় বার করলেন টিমের প্রত্যেকে যেন তাদের কাপড়ে কিছুটা পেনিসিলিয়াম রেণু ঘষে নেয়। ধরা পড়লে যে যেখানে যাক সেখানেই যেন ফের শুরু করতে পারে গবেষণার কাজ। সে দুর্দিন অবশ্য দেখতে হয়নি। ১৯৪০ সালের মে মাসে প্রথমবার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ইঁদুরের ওপর সফল প্রয়োগ হলো পেনিসিলিনের। সেই তথ্য ফ্লোরে ও চেন প্রকাশ করলেন ল্যানসেট পত্রিকায়। পুরো ১৯৪০ সাল জুড়ে চলল ইঁদুরের ওপর ট্রায়াল আর মানুষের শরীরে প্রয়োগের মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে পেনিসিলিন উৎপাদনের কাজ। এরই মধ্যে ঘটল এক ঘটনা।

অ্যালবার্ট আলেক্সান্ডার নামে একজন পুলিশকর্মীর মুখ গোলাপের কাঁটায় ছিঁড়ে গিয়েছিল। যার কারণে তিনি সেপ্টিসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মরণাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হলেন। ১৯৪১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তার ওপর প্রয়োগ করা হলো পেনিসিলিন। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন তিনি। কিন্তু মানবদেহে পেনিসিলিনের ডোজ, তার প্রয়োগকাল কোনো কিছুরই সঠিক ধারণা ছিল না তখন। পর্যাপ্ত পেনিসিলিনের অপ্রতুলতায় শেষে মার্চ মাসে মারা গেলেন পুলিশকর্মীটি। এরপরই বিপুল পরিমাণে পেনিসিলিন উৎপাদনের জন্য ব্রিটিশ সরকার বা ফার্মা জায়েন্ট গ্ল্যাক্সোর কাছে সাড়া না পেয়ে ফ্লোরে চললেন আমেরিকা, সঙ্গে ছিলেন হিটলি।

আমেরিকার ইলিনই প্রদেশের পিওরিয়ায় ইউ এস ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের নর্থ রিজিওন রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে হিটলি পেনিসিলিনের উৎপাদনের পদ্ধতির আরও উন্নতির কাজ শুরু করেন। সঙ্গে ছিলেন অ্যান্ড্রু জ্যাকসন মেয়ার। কথা ছিল এই মেয়ারই পরে হিটলিকে এড়িয়ে পেনিসিলিনের পেটেন্ট নেবেন ওষুধ কোম্পানি মার্কের সঙ্গে। এদিকে বৃহৎ আকারে পেনিসিলিনের বাণিজ্যিক উৎপাদনে দরকার ওষুধের কোম্পানিগুলোর সহায়তা। এবার তাদের সাহায্যের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ব্যর্থতার পর ফ্লোরের পুরনো যোগাযোগ কাজে লেগে গেল। পুরনো বন্ধু আলফ্রেড নিউটন রিচার্ডস তখন সেখানকার কমিটি অব মেডিকেল রিসার্চের প্রধান। তার উদ্যোগে মার্ক, ফাইজার, লিলি, লিডারলে প্রভৃতি কোম্পানিগুলো এগিয়ে এলো। মাত্র দুবছরের মধ্যে মিত্রশক্তির চাহিদা মেটানোর মতো বিপুল পরিমাণে শুরু হলো পেনিসিলিনের উৎপাদন। খবর কাগজ, ম্যাগাজিন ‘মির‌্যাকেল ড্রাগ’ পেনিসিলিনের বিজ্ঞাপনে ছেয়ে গেল। ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল পৃথিবীর প্রথম কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক।

১৯৪৩ সাল পর্যন্ত পেনিসিলিনের ব্যাপক উৎপাদন রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। এ বছরে আমেরিকার ওয়ার প্রোডাকশন বোর্ড পরিকল্পনা করে ইউরোপে তাদের যে সেনারা যুদ্ধ করছে তাদের জন্য বিপুলসংখ্যক ওষুধ তৈরি করার। যুদ্ধের সরাসরি ফলাফল আর ওয়ার প্রোডাকশন বোর্ডের কারণে ১৯৪৫ সালের জুন মাস থেকে প্রতি বছর এর উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৬৪৬ বিলিয়ন ইউনিটে।