অন্য কারও নামে নিবন্ধন করা মোবাইল ফোনের সিম কার্ড ব্যবহার পুলিশ সদস্যদের জন্য নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। একই সঙ্গে ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো, ইন্সটাগ্রাম ও টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দায়িত্ব পালনকালে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহার না করা এবং দায়িত্বরত অবস্থায় গেমস খেলা, ভিডিও দেখা, গান শোনা, ইউটিউব দেখা ও ফেইসবুক চালানো থেকে বিরত থাকারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আলাদা আলাদা আদেশে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এর পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক ওই নির্দেশনার ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. হায়দার আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের চাকরিতে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘসময় দায়িত্বরত থাকতে হয়। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ হয়তো ইউটিউব দেখে বা ফেইসবুক চালানো বা গান শুনে সময় পার করতে চান। এতে অনেক সময় তাদের মনঃসংযোগ অন্যদিকে চলে যায়। তাই গান শোনা, ভিডিও দেখা ও ফেইসবুক চালানো থেকে বিরত থাকার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এ নির্দেশনার পর তাদের যে তদারকি কর্মকর্তা থাকেন তিনিও বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করে নজরে আনতে পারেন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘অন্য কারও নামে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে কেউ কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা একটি শাস্তিমূলক অপরাধ। এটা শুধু পুলিশ সদস্যের জন্যই নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও একই অপরাধ। তাই সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে পুলিশ যাতে এসব না করে সেজন্যই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেউ অন্যের নামে সিম ব্যবহার করলে বা এসব সিম ব্যবহার করে অপরাধমূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করলে আমাদের ডিজিটাল সার্ভিলেন্সে ধরা পড়ে। তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জবাবদিহিতা ও কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবে। তবে কোনো পুলিশ সদস্যের নিজ নামে নিবন্ধিত একাধিক সিম ব্যবহারে সমস্যা নেই।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স শাখা থেকে সম্প্রতি জারি করা এক আদেশে বলা হয়, অন্য কারও নামে নিবন্ধন করা মোবাইল ফোনের সিম পুলিশ সদস্যের ব্যবহার করা অনৈতিক ও বিধিবহির্ভূত। এছাড়া ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, ইমো, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার প্রভৃতি) কোনো ধরনের অ্যাকাউন্ট, পেজ, গ্রুপ খোলা ও ব্যবহার করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া, লাইক দেওয়া বা কমেন্টস করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা বাঞ্ছনীয়। যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ডিভাইস বা নম্বর থেকে পুলিশের কোনো ইউনিট বা অন্য সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অ্যাকাউন্ট, পেজ বা গ্রুপ খোলা যাবে না। এ বিষয়ে নিজ নিজ ইউনিট প্রধানদের অধীন সব কর্মকর্তা বা সদস্যকে পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা অনুসরণ করতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জারি করা তৎকালীন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়েছিল, ‘কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনকালে দাপ্তরিক বা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অনিয়ন্ত্রিতভাবে মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। এতে দায়িত্ব পালন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাসহ নিজ নামে ইস্যু করা অস্ত্র-গুলি ও অন্যান্য সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা বিঘিœত করে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’ ওই আদেশে এসকর্ট ডিউটি ও ভিআইপি ডিউটিসহ সব ধরনের অপারেশনস বা ডিউটিতে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। যার মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনকালে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মোবাইল ফোন ব্যবহার করবেন না। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়ার সময় কোন কোন পুলিশ সদস্য মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন তার মোবাইল নম্বর নামের পাশে উল্লেখ করতে হবে। পুলিশ সদস্যদের কর্তব্যরত অবস্থায় সেলফি বা ছবি তোলা থেকে বিরত থাকতে হবে। দায়িত্বরত অবস্থায় তোলা সেলফি বা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে। দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় মোবাইল ফোনে গেমস খেলা, ভিডিও দেখা, গান শোনা, ইউটিউব দেখা, ফেইসবুক চালনো, অনলাইন পত্রিকা বা নিউজপোর্টাল পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কর্তব্যরত অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের (অনুমোদিত পুলিশ সদস্য ব্যতীত) মোবাইল ফোন ব্যবহার দৃষ্টিগোচর হলে তা কর্তব্যে অবহেলা হিসেবে গণ্য করা হবে বলেও পুলিশ সদর দপ্তরের ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়।
পুলিশ সদস্যদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা-২০১৯’ অনুসরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় এমন কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, কমেন্টস, লাইক শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী কোনোরকম তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে এমন বা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা যাবে না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে এমন কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড করা এবং লাইক, কমেন্টস বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো সার্ভিস বা পেশাকে হেয়প্রতিপন্ন করে এমন কোনো পোস্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। লিঙ্গ বৈষম্য বা এ সংক্রান্ত বিতর্কমূলক কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করা যাবে না। জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনো বিষয় লেখা, অডিও বা ভিডিও প্রকাশ করা যাবে না। ভিত্তিহীন, অসত্য ও অশ্লীল তথ্য প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্য কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য সংবলিত কোনো পোস্ট, ছবি, অডিও বা ভিডিও আপলোড, কমেন্ট, লাইক বা শেয়ার থেকে বিরত থাকতে হবে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কন্টেন্ট ও ফ্রেন্ড নির্বাচনে সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন এবং অপ্রয়োজনীয় ট্যাগ, রেফারেন্স বা শেয়ার করা পরিহার করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপব্যবহার বা অ্যাকাউন্টে ক্ষতিকর কন্টেন্টের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে দায়ী হবেন এবং সেজন্য প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।