প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের (পিএলএফএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদ থেকে আব্দুল হামিদ মিয়াকে অব্যাহতি না দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে গত রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রিমিয়ার লিজিংয়ের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, প্রিমিয়ার লিজিংয়ের এমডি পদ থেকে আব্দুল হামিদ মিয়ার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত কার্যকর না করার জন্য পর্ষদকে পরামর্শ দেওয়া হলো। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত প্রশাসকের আগাম অনুমোদন ছাড়া এমডির পদ থেকে যাতে আব্দুল হামিদ মিয়াকে অব্যাহতি সংক্রান্ত কোনো মেমো পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করা না হয় সে বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, প্রিমিয়ার লিজিংয়ের এমডি আব্দুল হামিদ মিয়া সম্প্রতি পর্ষদের কাছে পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন। আব্দুল হামিদ মিয়া ২০১৬ সালের সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানের এমডি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার ধারাবাহিক অবনতি হয়েছে। ২০১৬ সালে কোম্পানিটি ১৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা নিট মুনাফা করে, যা ২০১৯ সালে ২ কোটি ২৪ লাখ টাকায় নেমে আসে। আর করোনার সময়ে খেলাপির বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণে ছাড় পাওয়ার পরও ২০২০ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিজিংয়ের নিট মুনাফা হয়েছে ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিট মুনাফার পুরোটাই কাগজে-কলমে। প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের অর্থ সংকটে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ঋণ নেওয়া বেশিরভাগ গ্রাহক খেলাপি হওয়ায় ব্যক্তিশ্রেণির আমানতকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ধারের অর্থও পরিশোধ করতে পারছে না। ঋণের সুদ পরিশোধেও ব্যর্থ হচ্ছে। জাতীয় সংসদে প্রকাশিত ব্যাংকের ঋণখেলাপির তালিকায় যে ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে, তার একটি প্রিমিয়ার লিজিং।
প্রিমিয়ার লিজিং থেকে ঋণ নেওয়া বড় গ্রাহকদের প্রায় সবার নামই আছে খেলাপির খাতায়। এ তালিকায় আছে রহিমআফরোজ, নাভানা, সাইফ পাওয়ারটেক, ওয়েস্টার্ন মেরিন, বিশ্বাস টেক্সটাইল, মাহিদ এক্সপো, এসএ অয়েল, মোস্তাফা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক সাহাবুদ্দিন আলমের এসএ অয়েল লিমিটেডের কাছে প্রিমিয়ার লিজিংয়ের পাওনা রয়েছে ৪৯ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি হয়ে রয়েছে ঋণটি।
প্রিমিয়ার লিজিং থেকে ঋণ নিয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইব্রাহিম রেহেনা ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেডের ৫১ কোটি, কেয়ার স্পেশালাইড হাসপাতালের ৫০ কোটি, মাহিদ এক্সপো ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইলের ৫৯ কোটি, বিশ্বাস টেক্সটাইলের ৪৭ কোটি, অ্যাডভান্স রেডিমিক্স কংক্রিট ইন্ডাস্ট্রির ৪১ কোটি, ওয়েস্টার্ন মেরিনের ৩০ কোটি, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ডের ২৭ কোটি, সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের ৩৯ কোটি, রহিমআফরোজের ৩৫ কোটি, নাভানা গ্রুপের ২৪ কোটি এবং মোস্তফা গ্রুপের ১৯ কোটি টাকা নাম লিখিয়েছে খেলাপির খাতায়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি ঋণ ও লিজিং হিসেবে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০০১ সালে যাত্রা করা প্রিমিয়ার লিজিংয়ের মোট আমানত ৮০৭ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রায় ৯০০ আমানতকারীর জমা আছে ৯৫ কোটি টাকার সঞ্চয়। মোট ১ হাজার ৭২০ কোটি টাকা সম্পদের প্রিমিয়ার লিজিং ঋণ, মেয়াদি আমানত ও কলমানি হিসেবে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ধার করেছে ৭০০ কোটি টাকার বেশি। আমানত ও ধারের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।
আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম মহিউদ্দিন আজাদকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। প্রশাসক এখন প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কর্মকা-, ঋণ বিতরণে অনিয়ম, ঋণ আদায় পরিস্থিতিসহ নানা বিষয় খতিয়ে দেখছেন। এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও তদারকি জোরদার করা হয়েছে।
আব্দুল হামিদ মিয়া প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের এমডি পদে দায়িত্বে রয়েছেন এবং তার আমলেই প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে। দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী হিসেবে থাকার কারণে প্রিমিয়ার লিজিংয়ের ঋণ ও খেলাপি গ্রাহক সম্পর্কে তিনি সবকিছুই জানেন। এ কারণেই এমডি পদ থেকে তার পদত্যাগ বা পর্ষদ থেকে তাকে অব্যাহতি এমন যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পর্ষদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।