স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, গতকাল (রবিবার) আমরা দেখলাম প্রেস ক্লাবের সামনে একা একজন পুলিশকে পেয়ে কীভাবে পেটানো শুরু হয়েছিল। তা সবাই দেখেছেন। সেখানে পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। গতকাল সোমবার সকালে মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজে ‘পুলিশ মেমোরিয়াল ডে-২০২১’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ প্রেস ক্লাবে পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, যারা পুলিশের সমালোচনা করে তাদের মুখে ছাই পড়ুক। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইজিপি। এ সময় জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রেস ক্লাবের সামনে ও ভেতরে বহিরাগতদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। বহিরাগতরা ও পুলিশ ক্লাবে ঢুকে পড়ল। তাহলে কি প্রেস ক্লাব অনিরাপদÑ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রেস ক্লাব অনিরাপদ হয়নি। আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, আমিও আধাঘণ্টা ধরে দেখেছি, আপনারাই ছবি তুলে প্রচার করেছেন। সেটার মধ্যে এই দৃশ্যও দেখেছেন একজন পুলিশ এক জায়গায় একা দাঁড়িয়েছিল। তাকে বড় বড় লাঠি দিয়ে পেটানোর দৃশ্যও আপনারা দেখেছেন। চরম ধৈর্যের সঙ্গে পুলিশ পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। প্রেস ক্লাবের ভেতরে কোনোদিন আমাদের পুলিশ ঢোকে না। এদিন যেভাবে ইটপাটকেল ছুড়ছিল সে সময় দু-একজন হয়ত ঢুকেছে। ক্লাবের রীতি অনুযায়ী সেখানে পুলিশ ঢোকে না। কিন্তু যেভাবে ইটপাটকেল ও মারামারির সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে উচিত ছিল মারামারি না করা। টিয়ার গ্যাসের বিষয়ে তিনি বলেন, ঘটনা যখন অতিমাত্রায় চলে যায় তখন পুলিশ টিয়ার গ্যাস মেরেছে। এটা সরানোর কৌশল মাত্র।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নে ও উন্নয়নে নিরাপত্তা স্থিতিশীল রাখার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে পুলিশ। এই বাহিনী শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করে না, জঙ্গি নির্মূলেও পুলিশ কাজ করছে। জঙ্গি উত্থানের সময় পুলিশকে আহত করা হয়েছিল, সে চিত্র আমরা রাজশাহীতে এক জঙ্গিবিরোধী অভিযানে দেখেছি। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ সদস্য মারা যাচ্ছেন। ২০২০ সালে বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন পদের ৪৫৭ জন পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। তার মধ্যে ২০৮ জন কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। তিনি আরও বলেন, পুলিশ সদস্যরা আন্তরিকতা, কর্মনিষ্ঠা এবং নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার মতো চরম ত্যাগে দায়িত্ব পালনের যে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন, সে জন্য পুলিশ বাহিনীসহ দেশবাসী গর্বিত। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নত দেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রধান যে কাজটি দরকার সেটি আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পুলিশ কিন্তু তা সঠিকভাবে করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, করোনায় যখন আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলাম, যখন আমাদের কাছে করোনার কোনো প্রতিষেধক ছিল না, করোনায় মৃত্যুবরণকারী মায়ের লাশ হাসপাতাল থেকে সন্তান যখন নিতে আসছিল না, তখন পুলিশ সেই মায়ের লাশ বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে জানাজা ও দাফনের ব্যবস্থা করেছে। এই সময়ে তারা দুস্থ অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত জামায়াত-বিএনপি, শিবির, হেফাজত ও দুর্বৃত্তদের হামলায় ২৮ জন সদস্যের পরিবারকে ২ কোটি ৭২ লাখ টাকার আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০২০ সাল থেকে আজীবন রেশনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
সিনিয়র সচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন বলেন, জীবন মৃত্যুতে কারও হাত নেই। তবে চেষ্টা থাকবে কারও যেন অকালে বা অকারণে মৃত্যু না হয়। দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য জীবন দেওয়া গৌরবময় বিষয়। নতুন নতুন অপরাধ যুক্ত হচ্ছে। অপরাধের ধরন বদলে যাচ্ছে। অনেক ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ সদস্যদের কাজ করতে হচ্ছে। পুলিশের সক্ষমতা বেড়েছে। যেকোনো বিষয়ে মানুষ বিচার প্রত্যাশা করলে প্রথম আশ্রয়স্থল পুলিশ। সেজন্য আমরা বলি, পুলিশ হবে মানবিক, পুলিশ হবে জনতার। বিভিন্ন সংকটে অত্যন্ত ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে পুলিশ। তিনি আরও বলেন, আমাদের সবাইকে দেশ ও মানুষের জন্য সহানুভূতিশীল হতে হবে। শুধু চাকরি করি এই মানসিকতা থেকে বের হতে হবে। উন্নত বাংলাদেশের প্রথম কাজ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা। সেটা পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে যাচ্ছে।
আইজিপি বেনজীর আহমেদ বলেন, যারা পুলিশের সমালোচনা করে তাদের মুখে ছাই পড়ুক। কোনো দেশের সঙ্গে যখন যুদ্ধ লাগে তখন বিকল্প ফোর্স হিসেবে পুলিশ যুদ্ধ করে। আর শান্তির সময় দেশের মধ্যে দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে, বনশত্রুদের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য পুলিশ যুদ্ধ করে। এই যুদ্ধ ক্রমাগত, অবিরত ও অবিরাম। আর যুদ্ধ হলেই অবিরামভাবে আসে মৃত্যু। সে কারণে প্রতি বছর আমরা ডজন ডজন সহকর্মীকে হারাই। পুলিশে এই মৃত্যুর মিছিল, শাহাদৎবরণকারীদের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আমরা আর কোনো মৃত্যু দেখতে চাই না। আমাদের পরিবারও তা দেখতে চায় না। কিন্তু তারপরও আমরা দেশের প্রয়োজনে যে শপথ নিয়েছি সে শপথের প্রয়োজনে, পেশাগত দায়িত্বের প্রয়োজনে, জনগণের প্রতি ভালোবাসা, দেশমাতৃকার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রয়োজনে আমাদের সহকর্মীদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। করোনাকালে ৮৫ জন সদস্যকে হারিয়েছি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইজিপি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মেমোরিয়াল ডে’র সঙ্গে আরেকটি উৎসব উদযাপন করে সেটি হচ্ছে ‘ব্লু রেবন ডে’। মূলত ওইদিন দেশবাসী পুলিশের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ব্লু রেবন পুলিশকে পরিয়ে দেয়, নিজেরা গাড়িতে, বাড়িতে ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নীল রঙে সাজায়। আগামী বছর থেকে এই অনুষ্ঠানটি আমরা চালু করতে চাই।
প্রেস ক্লাবের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ কারও প্রতিপক্ষ নয়, তাহলে পুলিশকে কেন প্রতিপক্ষ বানানো হয়। একটি গ্রুপ আছে যারা দেশের ভালো কিছু দেখে না এবং সমালোচনা করে, তাদের এমনকি তারা পুলিশের সমালোচনা করেন তাদের মুখে ছাই পড়ুক। এ দেশের প্রকৃতিতে যারা বড় হয়ে ছুরি মারতে চায় তাদের মুখে আমরা দেশবাসী সবাই মিলে ছাই ছুড়ে দিতে চাই।