শিক্ষকতা আমাদের দেশে একটি একক বৃহত্তম নিয়োগ বাজার। এই বাজারে কে বা কারা প্রবেশ করতে পারবেন, আর কারা পারবেন না, এ নিয়ে বহু বছর যাবৎ কারোরই সঠিক কোনো তত্ত্বাবধান ছিল না। নিয়োগের বৃহত্তম এলাকা বলে সমাজের অনেক অসাধু ব্যক্তিবর্গ এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। যারা শিক্ষক হবেন তাদের মানসিকতা হতে হবে সমাজের অন্য যে কোনো পেশার চেয়ে আলাদা। তারা হবেন প্রকৃত অর্থে সৃজনশীল, শিক্ষার্থীদের তৈরি করবেন ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক নিয়োগে এলাকার প্রভাবশালী কিংবা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রভাব দেখা গেছে। একসময় তো স্থায়ী রূপই পেয়ে বসল এটা। স্থানীয় সাংসদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির প্রধান হিসেবে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ চূড়ান্ত করতেন। আর সে নিয়োগ তো শুধু শিক্ষক নিয়োগ নয়, লাখ লাখ টাকার খেলা! কেউই আমরা চিন্তা করিনি এই সব সিদ্ধান্ত নিয়ে গোটা জাতির কত বড় সর্বনাশ আমরা করছি।
আশার কথা হলো বিলম্বে হলেও কর্তৃপক্ষের কিছুটা বোধোদয় হয়েছিল এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে এনটিআরসিএ (নন-গভর্নমেন্ট টিচার্স রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেশন অথোরিটি) গঠিত হয়েছিল। নিয়ম অনুয়ায়ী এনটিআরসিএ কর্তৃক পরিচালিত পরীক্ষায় পাস করতে হবে, তবেই একজন শিক্ষকতার জন্য আবেদন করতে পারবেন। চমৎকার সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু সেখানেও দেখা গেল বহু সমস্যা। প্রভাবশালীরা কখনোই চায়নি এই ধরনের প্রতিষ্ঠান থাকুক, কারণ তাতে তাদের অবৈধ ব্যবসা থাকবে না। শত বাধার মুখেও সরকার এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছে বলে, ধন্যবাদ পেতে পারে।
২০০৫ সালে যাত্রা শুরু করেছিল এনটিআরসিএ। কিন্তু শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি অদক্ষতার ছাপ রেখে চলেছে। অনেক জায়গায় রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। অনেক জায়গায় ভুয়া নিবন্ধন দিয়ে চাকরিপ্রাপ্তির ঘটনাও ঘটেছে। নিবন্ধন মূল্যায়নে দেখা গেছে অনেক অসংগতি।
২০১০ সালে গঠিত জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিল, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের জন্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের আদলে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে, যারা যোগ্য ব্যক্তিদের শিক্ষকতার জন্য বাছাই করবেন। এগারো বছর পরে শেষ পর্যন্ত জানা
গেল শিক্ষক নিয়োগের জন্য ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠনের কাজ শুরু করেছে সরকার। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা স্তরের বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগে আরও স্বচ্ছতা আনতে সরকারি কর্মকমিশনের আদলে ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠন করতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এটি হলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)।
এনটিআরসিএর ১ম থেকে ১৫তম নিবন্ধন পরীক্ষায় মেধাতালিকায় মোট ৬ লাখ ৩৪ হাজার ১২৭ জন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৮২১ জনের বয়স ৩৫ বছর পার হওয়ায় তারা চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন না। আবার অনেকে বিভিন্ন চাকরি নিয়ে চলে গেছেন। গণবিজ্ঞপ্তির জন্য গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ৫৭ হাজার ৩৬০টি শূন্য পদের তালিকা দিয়েছিল শিক্ষা বিভাগ। এখন পর্যন্ত নতুন করে আরও ৩০ হাজারের বেশি শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রর্থীরা অপেক্ষা করছেন। গত জানুয়ারি মাসে তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা এখনো হয়নি। ২০০৫ সাল থেকে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের জন্য সনদ দিত এনটিআরসিএ। কিন্তু এই সনদ থাকলেও নিয়োগের ক্ষমতা ছিল গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটির অর্থাৎ এলাকার প্রভাবশালীদের হাতে।
২০১৫ সালে এই পদ্ধতির পরিবর্তন আনে সরকার। ১২তম নিবন্ধন পরীক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে মেধা তালিকা করা হয় উপজেলাভিত্তিক। শিক্ষার্থীদের সনদ দেওয়ার আগে পাস হয় নতুন আইনও। কিন্তু মেধা তালিকা করলেও তাদের নিয়োগ দেননি এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান, যেটি তার করার কথা। এনটিআরসিএ কেন করেনি সেটা একটা জিজ্ঞাসা বটে। এনটিআরসিএর এই সব কারণে ঝুলে গেছে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া। দুই বছর ধরে বন্ধ নিয়োগ। অথচ এই সময়ে অবসরে গেছেন অনেক শিক্ষক। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংখ্যা ১ লাখের কাছাকাছি হবে। অন্যদিকে, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও নিয়োগ না পাওয়ায় হতাশায় ভুগছেন তরুণ প্রার্থীরা।
এনটিআরসিএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেও চাকরি পায়নি এমন অভিযোগও আছে। অথচ শিক্ষক নিয়োগ ঠিকমতো না হলে শিক্ষার গুণগতমান বজায় রাখা কঠিন। এনটিআরসিএ ১ম থেকে ১৪তম সমন্বিত মেধা তালিকা থেকে ২০১৮ সালে দ্বিতীয় গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে প্রায় ৪০ হাজার পদে নিয়োগ দেয়। নিয়োগের পর একাধিক মামলা হয়। বর্তমানে আদালতের রায়ে ১ম থেকে ১৫তম নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়ে একটি সম্মিলিত মেধা তালিকা তৈরি করা হয়। বেশ কয়েকটি নিবন্ধন বাদ দেওয়ার গুঞ্জন ওঠে। এসব কারণে ৪০০-এর অধিক রিট মামলা করেন প্রার্থীরা।
শিক্ষানীতি-২০১০ এর আলোকে আইনের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসিত সংবিধিবদ্ধ একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের আইনগত কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে নয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিকে আগামী ২৫ মার্চের মধ্যে ‘জাতীয় শিক্ষা কমিশন’ গঠনের আইনগত কাঠামো তৈরি করতে বলা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরীক্ষা ও আইন)-কে কমিটির আহ্বায়ক করে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের যুগ্ম সচিব পর্যায়ের একজন প্রতিনিধি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একজন প্রতিনিধি, বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলের একজন প্রতিনিধি রাখতে বলা হয়েছে এ কমিটিতে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব (আইন) এ কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। দেখা যাচ্ছে কমিটির বেশিরভাগ সদস্যই সরকারি আমলা। বিষয়টি যেন এনটিআরসিএর মতো অদক্ষ কমিটিতে পরিণত না হয় সেদিকে মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি দিতে হবে।
এর আগে এ কমিশন গঠনে আইনের খসড়া তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষকে। তারা খসড়া তৈরি করে গত বছরের সেপ্টেম্বরে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। প্রস্তাবিত এই কমিশন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ সব পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগ দেবে। প্রার্থীরা পরীক্ষা দিয়ে সরাসরি চাকরি পাবেন। মেধাতালিকা বা সুপারিশ করার মতো প্রক্রিয়া থাকবে না। একই পদ্ধতিতে সম্প্রতি পিএসসি নন-ক্যাডারে বিভিন্ন সরকারি স্কুলে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দিয়েছে।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা আনতে ও প্রার্থীদের ভোগান্তি কমাতে এই জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা হচ্ছে। কিন্তু একটি শক্তিশালী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হলে সেখানে অধিক সংখ্যায় শিক্ষক প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। শিক্ষার পরিবেশ ও মান ঠিক রাখতে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : শিক্ষক ও শিক্ষাবিষয়ক গবেষক
masumbillah65@gmail.com