সরকারি অর্থ অপচয় রোধে শক্ত হওয়ার কড়া নির্দেশনা দিয়ে বেসরকারি প্রশাসনকে কঠোর বার্তা দিয়েছে সরকার। এই নির্দেশনা সংবলিত মন্ত্রিপরিষদ সচিবের একটি চিঠি পেয়েছেন ১৩ সচিব ও ১৫টি সংস্থার প্রধানরা। চিঠিতে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, ভেরিয়েশন (ব্যয় বৃদ্ধি) এবং নিজ উদ্যোগে অর্থ ব্যয় করে ভূতাপেক্ষা অনুমোদন বন্ধ করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের প্রত্যয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সচিবদের আরও সতর্ক হওয়ার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে কাজ করে সে বিষয়েও নজর দিতে বলা হয়েছে। আগে যেকোনো প্রকল্পে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা গেলেও এবার ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত নিজেদের তদারকি করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চিঠি পাওয়ার পর সব মন্ত্রণালয় থেকে অধীনস্থ সংস্থাগুলোকে কার্যকর ভূমিকা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা পাওয়ার কথা স্বীকার করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. মাহবুবুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আমরা একটি চিঠি পেয়েছি। এ চিঠি পাওয়ার পর ১৫ ফেব্রুয়ারি আমরা সব সংস্থাকে এ বিষয়টি আমলে নিয়ে কাজ করতে বলেছি। গত ১৪ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয়সহ উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় নানা বিষয় উঠে এসেছে। সেখান থেকে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছে তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা এ বিষয়ে সবকিছু কার্যকর করে তা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার জন্য বলা হয়েছে।’
সরকারি প্রকল্পের অর্থব্যয়, প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি ও কাজ বরাদ্দে অনিয়ম নিয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কয়েক দফা তাগাদার পর এই চিঠিটি নিয়ে প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চিঠিতে সংশ্লিষ্টদের বলা হয়, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বাস্তবায়নের একটি পূর্ব শর্ত হলো উন্নয়ন প্রকল্পের সঠিক ও সময়োচিত বাস্তবায়ন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষ করে পূর্তসংক্রান্ত কাজে দীর্ঘসূত্রিতা এবং দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় নীতিমালা (পিপিআর) মোতাবেক অর্পিত ক্রয় ও সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি এবং সার্বিকভাবে আর্থিক বিধিবিধান ও আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। এছাড়া প্রকল্পের ফিজিবিলিটি ও ডিজাইনের যথার্থতা সঠিকভাবে যাচাই না করায় প্রকল্প বাস্তবায়নে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে প্রকল্প গ্রহণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না এবং সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিংয়ের উদাহরণ টেনে চিঠিতে আরও বলা হয়, অর্পিত ক্রয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রধান প্রকৌশলীদের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। ইদানীং দেখা যাচ্ছে অভিজ্ঞতা নেই এমন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো যে কাজ করছে তা তাদের নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের অঙ্গীভূত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিতে হবে বলে চিঠিতে বলা হয়েছে। এতে বর্তমানে সরাসরি সরকারি প্রকল্পের কাজ নেওয়ার বিষয়টি সেই প্রতিষ্ঠানের আর করার সুযোগ থাকছে না বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব চিঠিতে আরও বলেন, বর্তমানে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় (এমটিবিএফ) সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে বাজেট দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে এক বছরের প্রাক্কলন ও পরের দুই বছরের প্রক্ষেপণ মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়। অর্থাৎ তিন বছরের ‘ইনভেলাপ’-এর ওপর ভিত্তি করেই মন্ত্রণালয় বা বিভাগ তাদের প্রকল্প গ্রহণ বা প্রকল্পে বরাদ্দ প্রস্তাব করার কথা। কিন্তু দেখা যায়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব/সচিব তাদের বাজেট ইনভেলাপ যাচাই না করেই প্রকল্প গ্রহণ করছে এবং প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টিং অফিসার হিসেবে প্রত্যয়ন দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সচিব প্রত্যয়ন দিচ্ছেন যে, প্রকল্প ব্যয় এমটিবিএফ সিলিংয়ের মধ্যে রয়েছে; কিন্তু বাস্তবে তা সিলিংয়ের অনেক বেশি। বিষয়টি সচিবদের দেওয়া সত্যায়নের বিপরীত।
প্রশাসনের শীর্ষ এ কর্মকর্তা চিঠিতে বলেন, সরকারি খাতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধন পদ্ধতি মোতাবেক ৫০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে প্রাক্কলিত ব্যয় সম্পন্ন, সব বিনিয়োগ প্রকল্প গ্রহণের পূর্বে আবশ্যিকভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই তৃতীয়পক্ষের মাধ্যমে করতে হবে। ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত যেখানে সম্ভাব্যতা যাচাই বাধ্যতামূলক নয় সেখানে নিজ প্রতিষ্ঠান দিয়ে যাচাই করতে হবে। মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ বৈদেশিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। প্রকল্পের ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান যাতে একই দেশের বা একই মালিকানা প্রতিষ্ঠানের যাতে না হয় সেটা বাস্তবায়নকারী সংস্থা নিশ্চিত করবে।
চলমান প্রকল্পের ভেরিয়েশন বা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভেরিয়েশন হতে পারে কারণ প্রকল্পের ডিজাইন আনুমানিকভাবে প্রস্তুত করা হয়। তবে এ ভেরিয়েশন যদি ১০ থেকে ১৫ ভাগ এর বেশি হয় সে ক্ষেত্রে ঠিকাদারের মতামত প্রয়োজন হবে। ঠিকাদারের মতামতের পর তা তৃতীয়পক্ষের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবার প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে।
অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবের বরাত দিয়ে চিঠিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী গণপূর্ত অধিদপ্তরের রেট শিডিউল বারবার বৃদ্ধির বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রেট শিডিউল বাড়ালে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং বাজেটে অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হয়। রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য অর্থ বিভাগের অনুমোদনের প্রয়োজন। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তর রেট শিডিউল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আর্থিক বিভাগের অনুমোদন নিচ্ছে না। যেমন, প্রাথমিকভাবে একটি প্রতিষ্ঠান ১০ থেকে ১৫ ভাগ কমে কাজ পাচ্ছে, কিন্তু পরবর্তী রেট শিডিউল বৃদ্ধির ফলে ওই কাজের ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে ওই প্রতিষ্ঠানকে নতুন রেট শিডিউল দেওয়া হলে তা বিধিবহির্ভূত।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার বলেন, ‘গণপূর্তের রেট শিডিউল বৃদ্ধিতে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়া হয় না।’
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘এটি মূলত গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীল রেট শিডিউল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। সে বিবেচনায় আমরা অধিদপ্তর থেকেই রেট শিডিউল বৃদ্ধির কাজটি সম্পন্ন করে থাকি। সরকার যদি মনে করে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়সহ অর্থ বিভাগের অনুমোদন নেওয়া প্রয়োজন তাহলে আমরা কাজটি সেভাবেই করব।’
সংশ্লিষ্ট একটি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে উন্নয়ন ব্যয়ে অনিয়ম বা নিয়মের ব্যত্যয় যাতে না হয়; সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্বান্ত হয়েছে। এছাড়া দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করতেও সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। অভিজ্ঞতা নেই এমন সংস্থা যেন কাজ করতে না পারে সে বিষয়েও বলা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ধরনের নির্দেশনা স্থানীয় সরকার বিভাগ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, পূর্ত মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সেতু বিভাগ, রেলপথ মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ আরও ১৫টি সংস্থা প্রধানের কাছে লিখিতভাবে পাঠানো হয়েছে।’