মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবং বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) থেকে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুল, কলেজ, টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট ও মাদ্রাসার প্রায় ১০ লাখ শিক্ষকের একটি তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আলাদা কোনো সংগঠন না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পৃথকভাবে তাদের তালিকা পাঠাচ্ছে। তবে এখনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কোনো তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পৌঁছায়নি। তাদের তালিকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এই তালিকায় দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১৮ বছরের ঊর্র্ধ্বে শিক্ষকদের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে। এই তালিকায় ৪০ বছরের কম বয়সীদের পাশাপাশি ৪০ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষকদের নামও রয়েছে। সে তালিকা ইতিমধ্যেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অধিদপ্তরে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এখন আইসিটি এই তালিকা তাদের ওয়েবসাইটে এন্ট্রি করলেই ৪০ বছরের কম বয়সী শিক্ষকরা টিকার জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন।
এসব কর্মকর্তা জানান, আইসিটি এন্ট্রি করলে সুরক্ষা অ্যাপে শিক্ষকদের যে ক্যাটাগরি সেখানে তাদের নাম উঠে যাবে। তখন এনআইডি দিয়ে নিবন্ধন করতে পারবেন। তারপর টিকা দেওয়া শুরু হবে। তাদের জন্য আলাদা কোনো ক্যাটাগরি করা হবে না। তবে ৪০ বছরের কম বয়সীরা ঠিক কবে থেকে টিকার জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এ ব্যাপারে গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত করোনার টিকা ব্যবস্থাপনাবিষয়ক এক বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষক, কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী ও অন্যান্য কর্মচারী যারা আছেন, তাদেরও টিকা দেওয়া হবে। সেই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে। টিকায় শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য বয়সের বাধাও থাকছে না।
কবে নাগাদ ৪০ বছরের কম বয়সী শিক্ষকরা টিকার জন্য নিবন্ধন করতে ও টিকা নিতে পারবেনজানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৪০ বছরের শিক্ষকরা তো টিকা পাচ্ছেন। তারা নিবন্ধনও করতে পারছেন। ৪০ বছরের কম বয়সীদের তালিকা চূড়ান্ত হলে সেটা আমরা ব্যাকঅ্যাপে এন্ট্রি করব। সেটা শেষ হলে তারাও নিবন্ধন করতে পারবেন। আশা করছি স্কুল-কলেজ খোলার আগেই নিবন্ধন ও টিকা দেওয়ার কাজ শেষ করতে পারব।
তবে চলমান টিকাদান কর্মসূচির পরিকল্পনায় আপাতত কোনো পরিবর্তন আসছে না বলে জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, কোভ্যাক্সের এক কোটি ও কেনা তিন কোটি মিলে যে চার কোটি টিকা পাওয়া যাবে, সে টিকা বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ীই দেওয়া হবে। কারণ ৪০ বছর থেকে তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষের সংখ্যাই চার কোটি। এর সঙ্গে করোনার সম্মুখসারীর অন্য ক্যাটাগরির মানুষ রয়েছে। সুতরাং এখন যে পরিকল্পনায় টিকা দেওয়া হচ্ছে, সে অনুযায়ীই দেওয়া হবে। পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন দেখছি না।
দেশে বর্তমানে ৪০ বছর থেকে তদূর্ধ্ব বয়সী শিক্ষক-কর্মচারীরা টিকা পেলেও ৪০ বছরের কম বয়সী শিক্ষক-কর্মচারীরা টিকার বাইরে ছিলেন। আগামী ৩০ মার্চ দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ায় সরকার ১৮ বছরের বেশি বয়সী সব শিক্ষককে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। গত শনিবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার ঘোষণার আগে বিকেলে এক ভার্চুয়ালি সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে চাই। তবে তার আগে আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী যাদের বয়স হয়েছেএমন শিক্ষার্থীদেরও করোনার টিকা দিতে চাই। উচ্চ শিক্ষাস্তরে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের করোনার টিকা দেওয়া হবে। নিম্নস্তরেও শিক্ষকদের টিকা দেওয়ার কাজ শেষ করতে চাইছি।
ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে বাংলাদেশ ৩ কোটি টিকা কেনার চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস প্রতিমাসে ৫০ লাখ ডোজ করে টিকা আনবে। জানুয়ারিতে ৫০ লাখ টিকা এলেও দ্বিতীয় চালানে এসেছে ২০ লাখ টিকা। বেক্সিমকো সরকারকে জানিয়েছে, দ্বিতীয়ে চালানের বাকি টিকা মার্চের প্রথম সপ্তাহে চলে আসবে। এর আগে ভারত সরকারের উপহার হিসেবে ২০ লাখ টিকা দেশে এসেছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ১৩ কোটির বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। সে অনুযায়ী প্রথম দফায় ৩৫ লাখ টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হলেও টিকার সরবরাহ নিশ্চিত হওয়ায় সরকারের হাতে থাকা ৭০ লাখ টিকা প্রথম ডোজ হিসেবে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। গতকাল ৩ মার্চ পর্যন্ত ৩৩ লাখ ৪১ হাজার ৫০৫ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। আর টিকা নিতে নিবন্ধন করেছেন ৪৫ লাখ ৭৭ হাজার ৮০৩ জন।
এ ছাড়া গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে করোনার টিকা ব্যবস্থাপনাবিষয়ক এক সভায় টিকাদান কর্মসূচির বিষয়ে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে আগামী জুন-জুলাই পর্যন্ত টিকা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয় ও পরবর্তীকালে ডিসেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় দফায় টিকাদান পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে বলে জানানো হয়।
এ ব্যাপারে বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সাংবাদিকদের বলেন, আমরা আশা করি, জুন-জুলাই পর্যন্ত ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা তিন কোটি ও কোভেক্স থেকে যা পাব, সেটা মিলিয়ে আমাদের হাতে ৪ কোটি ডোজ হতে থাকবে। এই টিকা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাসে বাংলাদেশে আসবে। সেই অনুযায়ী আমরা ভ্যাকসিন কার্যক্রম করব। যদি এর মধ্যে কোনো রকমের পরিবর্তন লাগে, তাহলে সেই বিষয়টিও আমরা করব।
প্রথম দফায় ৪০ বছরের কম বয়সীদের টিকা নয় : চলমান টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৪০ বছরের কম বয়সীদের করোনার টিকা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। টিকা বেশি এলে ৪০ বছরের নিচের বয়সীদের টিকা দেওয়ার বিষয়টি চিন্তা করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর সময় ১৮ শ্রেণির সম্মুখসারির করোনাযোদ্ধাদের পাশাপাশি নাগরিক ক্যাটাগরিতে ৫৫ বছর থেকে তদূর্ধ্ব বয়সীদের টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু টিকাদান শুরুর কয়েক দিন পরেই নিবন্ধনের সংখ্যা আশানুরূপ না হওয়ায় সরকার টিকার নিবন্ধনের জন্য বয়সসীমা কমিয়ে ৪০ বছর করে। এখন শুধু ৪০ বছরের বেশি বয়সীরা টিকা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
গতকালের করোনার টিকা ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বৈঠক শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ভারতে ৬০ বছর বা এর বেশি বয়সীদের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। আমাদের দেশে এটা অনেক কমিয়ে ৪০ বছরে নিয়ে এসেছি। ৪০ বছরে নিয়ে আসার কারণে আমাদের ৪ কোটি মানুষকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। আমাদের হাতে যদি ভ্যাকসিন বেশি আসে, তাহলে বয়সের বিষয়টি চিন্তা করতে পারব। শিডিউলও পরিবর্তন করতে পারব। আমাদের সবসময় চেষ্টা থাকবে, নিশ্চিত হয়ে যেন আমরা কাজ করি। সেকেন্ড ডোজ যেন আমাদের হাতে থাকে। সেটাকে মাথায় রেখে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
সাড়ে ৩ হাজার মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রস্তাব : টিকা কেনার জন্য ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংস্থা সাড়ে ৩ হাজার মিলিয়ন ডলার সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার তার প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা নেবে। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংক থেকে পাওয়া ৫০০ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন হয়ে গেছে।
বেসরকারি পর্যায়ে টিকা নিজ খরচে : দেশের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান করোনার টিকা কীভাবে আনবে ও তা প্রয়োগ করবে, সে ব্যাপারেও গতকালের বৈঠকে আলোচনা হয়। এর আগে বেসরকারি হাসপাতাল ও প্রতিষ্ঠান কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে এক বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, সরকারের কেনা টিকার কিছু অংশ বেসরকারি খাতকে দেওয়া হবে। তবে সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান করোনার টিকা আনতে চাইলে তাদের নিজ খরচে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত টিকা আনতে হবে। এ জন্য দেশের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন লাগবে। এমনকি এ টিকা যারা নেবেন, তাদের কিনে নিতে হবে।
টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে স্বস্তি : গতকালের বৈঠকে চলমান টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে সন্তুষ্টি ও স্বস্তি প্রকাশ করা হয়েছে। বৈঠকে গত এক মাস ধরে চলা টিকাদান কর্মসূচির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানানো হয়। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টিকাদান কর্মসূচিতে দেশের মানুষ সন্তুষ্ট। বিদেশ থেকেও সফলতার বিষয়ে অনেক সুনামের কথা পেয়েছি। আমরা এই সুনাম ধরে রাখতে চাই। আমরা যত মানুষকে ভ্যাকসিন দিয়েছি প্রত্যেকেই সুস্থ আছে। কোনো জায়গায় কোনো অঘটন ঘটেনি। এটা বিরাট অর্জন।
বিদেশি নাগরিকরাও টিকা পাচ্ছেন : দেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদেরও টিকা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যেসব পাঁচ তারকা হোটেল এবং যেসব হোটেল কোয়ারেন্টাইন সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে কর্মরতরাও টিকা পাবেন। স্থল, নৌ ও বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের টিকা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী।