রাজনীতি নিয়ে অন্ধকারে আ.লীগ নেতাকর্মীরা

‘আওয়ামী লীগের এখনকার রাজনীতিতে কোনো কিছুই জানার সুযোগ নেই। আগে রাজনীতিতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সবার সঙ্গে সবার যোগাযোগ, আলাপ-আলোচনা হতো। দিবসভিত্তিক যেসব জাতীয় কর্মসূচি আমরা পালন করতাম সেগুলো নিয়ে আগে নানা ধরনের মহড়া হতো। নেতারা জানতেন ফলে কর্মীরাও জানতেন কখন কী করতে হবে। এখন নেতারাও জানেন না, কর্মীরা তো না-ই। এ সময়ের রাজনীতিতে জানাবোঝার সংস্কৃতি উঠে গেছে। ফলে নেতাকর্মী সবাই দিক-নির্দেশনাহারা।’ দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করে এসব কথা বলেন গাইবান্ধার সাঘাটার ঘুড়িদহ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ষাটোর্ধ্ব আবদুল জলিল।

আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনীতিতে তার মতো ‘মুজিব আদর্শ ধারণকারী’রা অবহেলিত ও বঞ্চিত উল্লেখ করে তৃণমূলের এ রাজনীতিবিদ বলেন, ‘১৯৭০ সালের ১৯ জুন ফুলছড়ি তিস্তামুখ ঘাটে এক জনসভায় আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। ওইদিন থেকে মুজিব আদর্শ ধারণ করে আজও রাজনীতি করি। এখনকার রাজনীতি দেখে মনে হয় আমাদের রাজনীতি ভুল। মুজিব আদর্শের আমরা যারা রাজনীতি করি তারা অবহেলিত-বঞ্চিত।’

তবে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জোয়াহেরুল ইসলাম জোয়াহের দলের বর্তমান সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতার কথা স্বীকার করলেও এর জন্য করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই দায়ী বলে মনে করছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক পলিসি জানতে-বুঝতে মিটিং-সিটিং প্রয়োজন পড়ে। করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় সবার সঙ্গে সবার যোগাযোগ একরকম বিচ্ছিন্ন। স্বাভাবিক সময়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা হয়, যাওয়া-আসা হয়, মাঝেমধ্যে বর্ধিত সভাসহ নানা ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে। ফলে ধারণা পাওয়া যায়। এখন তো সবাই অন্ধকারে।’

নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আনম সেলিমের মন্তব্যও প্রায় একইরকম। তার জেলায় দলের নেতা আবদুল কাদের মির্জা এবং জেলা সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরীর মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচিত। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে খায়রুল আনম সেলিম বলেন, ‘আমি কিছু জানি না।’ আর এই ‘জানি না’ শব্দটি এখন আওয়ামী লীগের প্রায় সব পর্যায়ের নেতাদের মুখেই শুনতে পাওয়া যায়। রাজনীতি ও সরকারি নীতিনির্ধারণী বিষয় নিয়ে সরকারের ও দলের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে এখন আওয়ামী লীগের কোনো নেতাই মুখ খোলেন না। নেতাদের দাবি, তারা কিছুই জানেন না। এর ফলে বিভিন্ন মহলে নেতিবাচক নানা মন্তব্যও শোনা যায়। ওইসব মহলের একটি দাবি ইতিমধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা পেতেও শুরু করেছে তা হলো আমলা নির্ভরতা বেড়েছে সরকারে ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। তাই দলীয় নেতারা নন, আমলা ও প্রশাসনই এখন সরকার ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে বেশি ওয়াকিবহাল। এ আলোচনা নিয়ে ভিন্ন কথা পাওয়া যায় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে। এ প্রসঙ্গে দলটির এক ডজন নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মূলত দিক-নির্দেশনাহারা তারা। করোনা পরিস্থিতিতে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কম সাক্ষাতের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আর সে কারণেই রাজনৈতিক পলিসি কী, নেতাদের কখন কী করা উচিত-অনুচিত সে সম্পর্কে একেবারেই অন্ধকারে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তাই বিভিন্ন ইস্যুতে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত কী আসতে পারে সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্যই করেন না তারা। যেকোনো বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ও সাংগঠনিক জেলার দায়িত্বশীল প্রায় সব নেতারই একই উত্তর ‘জানি না। আমরা দিক-নির্দেশনাহারা।’

দলের এমপি, নেতা ও বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ তুলে নোয়াখালীর বসুরহাটের পৌর মেয়র আবদুল কাদের মির্জা দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলেন। দলের অনেক নেতার কাছে তার এই বক্তব্য দলীয় শৃঙ্খলাপরিপন্থী। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অন্তত ছয় নেতার কাছে জানতে চাইলে ওইসব নেতা বলেন, কোনো কিছুই তাদের জানা নেই। সর্বশেষ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে সমালোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়েও দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে আলোচনা হয় এই প্রতিবেদকের। এ প্রসঙ্গেও কোনো তথ্য জানা নেই বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ওইসব নেতা। তাদের দাবি, সরকার পরিচালনায় রাজনৈতিক দল থাকলেও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা বাদে আর কোনো রাজনৈতিক নেতার নিয়ন্ত্রণে নেই কোনো কিছুই। তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরে আমলা ও প্রশাসনই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। রাজনৈতিক পলিসিতে সরকারবিরোধী রাজনীতি এখন মোকাবিলা করা হয় না। ফলে কর্মকাণ্ড আর কী-ইবা থাকে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালীন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক নেতাদের একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগে বেশ ভাটা পড়েছে। দলের এমন অনেক নেতা রয়েছেন, যাদের দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় না প্রায় এক বছর। তাছাড়া মিটিং-সিটিংও হয় না। ফলে বিভিন্ন ব্যাপার অনেকের নখদর্পণে থাকে না।’

একই বিষয়ে দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে আমাদের দলের নীতিনির্ধারণী বৈঠকগুলো অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।’

আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে দলটির সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের সঙ্গে আলাপকালে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের বেশিরভাগ নেতার সঙ্গে প্রায় এক বছর হলো সরাসরি দেখা নেই দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার। তাছাড়া লম্বা সময় ধরে দলের নীতিনির্ধারণী মিটিং-সিটিং নেই। নেত্রীর সঙ্গে দেখা হলে ওনার অ্যাটিচুড দেখে অনেক নেতা বুঝতে পারেন আগামীতে কী হতে যাচ্ছে। গণভবনে নিয়মিত যাতায়াত থাকলে অনেক ইস্যু নিয়ে কিছু নেতার সঙ্গে আলাপচারিতার সুযোগ হয়। সেখান থেকেও অনেক বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। কখন কোনটা করতে হবে, কোনটা করা যাবে না তা নিয়ে অনেক সময় দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকেন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। আর আমাদের সব নেতাই ওনার সেই দিক-নির্দেশনা মতোই বিভিন্ন ব্যাপারে মন্তব্য করি। কিন্তু এখন সেই সুযোগ নেই।’

প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করে দলের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের যোগাযোগ কমে যাওয়ায় মূলত দলীয় নেতাদের অনেক বিষয়ে জানার সুযোগ থাকে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচন উপলক্ষে দলীয় বোর্ড সভা হয়েছে, সেখানে সিলেকটিভ নেতাদের উপস্থিতি ঘটে। ওই সভাগুলোতে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে আলোচনায় অন্য ইস্যু নিয়ে কথা বলার সময় আর হাতে থাকে না।’

দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কার্যনির্বাহী সংসদের সভার কথা উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এ সদস্য আরও বলেন, ‘মূলত সেখানেই নীতিনির্ধারণী ব্যাপারগুলো আলোচনার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্বাভাবিক সময়ে ওই সভা নিয়মিত হতো। করোনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ ওই সভা হয় না। তাই অনেক ব্যাপারে অন্ধকারেই থেকে যেতে হয় আমাদের।’ অবশ্য রাজনীতিতে এখন আওয়ামী লীগের তেমন একটা সম্পৃক্ততা নেই বলেও মনে করেন এ নেতা। তিনি বলেন, ‘এটাও বলা যায় রাজনীতিতে এখন সম্পৃক্ততা নেই আওয়ামী লীগের নেতাদের। রাজনৈতিক পলিসিতে আপাতত রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করা হয় না। বলা যায় রাজনীতি শিকেয় উঠেছে।’

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী ও সম্পাদকমণ্ডলীর তিনজন নেতা বলেন, রাজনীতি ও সরকার পরিচালনা দুই-ই করতে হয় দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। হয়তো জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্য রাজনৈতিক নেতাদের দক্ষতা-পারদর্শিতার অভাব রয়েছে। তাই যেকোনো পরিস্থিতির শুরুতে থাকেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা আর মাঝে থাকেন আমলা ও প্রশাসন।

দলের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নেতারা সবাই দিক-নির্দেশনাহীন। কী হতে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে কী হবে, আমজনতার মতো আমাদেরও অজানা।’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা আরও বলেন, নেতাদের যাতায়াত নেই গণভবনে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিয়মিত সাক্ষাৎ পান না কেন্দ্রীয় নেতারা। তাই বেশিরভাগ ব্যাপারেই এখন রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ত থাকার সুযোগ হয়ে ওঠে না।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধিকাংশ নেতাই এখন রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনাহীন। আমলা-প্রশাসন মিলে রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যু মোকাবিলা করেন। রাজনৈতিক পলিসিতে এখন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রয়োজন পড়ে না। ফলে কোনো নির্দেশনাও থাকে না ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রতি।’