গত ২২ ফেব্রুয়ারি দেশ রূপান্তরের শেষ পৃষ্ঠায় ‘সাদেকা হালিমসহ ৩ শিক্ষকের গবেষণার অধিকাংশ নকল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই প্রতিবেদন নিয়ে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবাদলিপি পাঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। ওই প্রতিবাদলিপিটি পর্যবেক্ষণ তথা যাচাই-বাছাই করে ছাপা হওয়ার আগেই ৯ দিনের মাথায় গত ৪ মার্চ অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ও অধ্যাপক ড. কাউছার আহমেদের পক্ষে দেশ রূপান্তর সম্পাদক অমিত হাবিব, প্রকাশক মাহির আলী খাঁন রাতুল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি তানভীর হাসানকে একটি লিগ্যাল নোটিস (উকিল নোটিস) পাঠানো হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্যাডে ভারপ্রাপ্ত ডিন ড. সাদেকা হালিম স্বাক্ষরিত প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, “সাদেকা হালিমসহ ৩ শিক্ষকের গবেষণার অধিকাংশ নকল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের প্রকাশনায় গবেষণা চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও এই প্রতিবেদনে কে, কোথায়, কবে অভিযোগ করেছেন তা উল্লেখ করা হয়নি। নাম প্রকাশ না কওে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক’-এর বরাতে কোনো ধরনের তথ্যসূত্র ও প্রমাণ ছাড়াই গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির অভিযোগের মতো একাডেমিক বিষয়ে মনগড়া তথ্য উপস্থাপন করা কোনো বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ভাষা হতে পারে না।”
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, ‘২০১২ সালে ‘ওয়ার্ল্ড জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচার সার্ভিসেস (আই.ডি.ও.এস আই নম্বর ১৮১৭, ৩০৪৭)-এ প্রকাশিত মো. কাউসার আহমেদ, সাদেকা হালিম, শামিমা সুলতানার সম্মিলিত একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই গবেষণা প্রবন্ধে ৬৪ শতাংশ তথ্য ও লেখা হুবহু মিল পাওয়া গেছে, যে তথ্যটি সঠিক নয়। কারণ এই লেখাটি ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে এবং এখন অর্থাৎ ২০২১ সালে Similarity (%) চেক করার সময় তার নিজের প্রকাশিত প্রবন্ধ (সোর্স প্রবন্ধ) থেকে ৬১% সিমিলারিটি দেখাচ্ছে। তাছাড়া যেসব আর্টিকেল, রিপোর্ট বা মনোগ্রাফ আমাদের আর্টিকেলটি প্রকাশিত হওয়ার পরে অর্থাৎ ২০১২ সালের অনেক পরে প্রকাশিত হয়েছে এবং আমাদের আর্টিকেল থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছে, এবং ২০১৪ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে প্রকাশিত বেশ কয়েকটি উৎস রয়েছে যেগুলো Plagiarism চেক করার সময় বাদ দিলে এই আর্টিকেলটির Similarity ২০ (%)-এর কম, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং গ্রহণযোগ্য।’
প্রতিবাদলিপির শেষে বলা হয়, ‘উল্লেখিত প্রতিবেদন নানা অসঙ্গতিতে পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর ও অসত্য। বিশেষায়িত জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত বোধগম্যতা থাকা এই ধরনের প্রতিবেদন তৈরির পূর্বশর্ত।’
আমাদের ব্যাখ্যা : প্রকৃতপক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমসহ তিন শিক্ষকের ওই গবেষণাপ্রবন্ধটি প্ল্যাজিয়ারিজম বা কুম্ভীলকবৃত্তি বা চৌর্যবৃত্তি শনাক্ত করার সফটওয়্যার ‘টার্নইটইন’র মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। টার্নইটইনে প্রবন্ধটি যাচাইয়ের প্রতিবেদনের অনুলিপি দেশ রূপান্তরের কাছে রয়েছে। এতে দেখা যায়, প্রবন্ধটির ৮৮ শতাংশের সঙ্গে বিভিন্ন জার্নাল ও আর্টিকেলে প্রকাশিত লেখার মিল রয়েছে। যেগুলো ওই গবেষণা প্রবন্ধটি প্রকাশের আগেই প্রকাশিত হয়েছে। টার্নইটইনে করা যাচাই প্রতিবদেনের তথ্যই ওই সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে। টার্নইটইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই গবেষণাপ্রবন্ধের ৮৮ শতাংশ নকলের মধ্যে Idosi.org নামে একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে ৬১ শতাংশ নকল করা হয়েছে। এ নিবন্ধটি ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়া bfrf.org ও bangladesh.nlembassy.org -এ প্রকাশিত দুটি নিবন্ধ থেকে ৮ শতাংশ করে ১৬ শতাংশ, shrimpfoundation.org ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখা থেকে ৩ শতাংশ এবং csd.ulab.edu.bd-এ প্রকাশিত লেখা থেকে দুই শতাংশ নকল করা হয়েছে। বাকি অংশ বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লেখা থেকে কপি করা হয়েছে। ১৬ পৃষ্ঠার ওই যৌথ নিবন্ধটির প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম, একাদশ এবং চতুর্দশ পৃষ্ঠার পুরোটাই নকল করা। আর তৃতীয়, পঞ্চম, দশম, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ পৃষ্ঠার কিছু অংশ নকল আর বাকি অংশ তাদের মৌলিক লেখা। এছাড়া দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়েছে। তাছাড়া গবেষণায় কুম্ভীলকবৃত্তি বা চৌর্যবৃত্তির অভিযোগের বিষয়ে ড. সাদেকা হালিমের সহগবেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাউছার আহমেদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি এবং আরেক গবেষক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানাকে কয়েক দফা টেলিফোন ও খুদে বার্তা পাঠিয়ে সাড়া পাওয়া যায়নি, প্রতিবেদনে এ কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং তথ্যসূত্র ও প্রমাণ ছাড়াই প্রতিবাদলিপিতে করা মনগড়া তথ্য উপস্থাপনের অভিযোগ আদৌ সঠিক নয়।
উকিল নোটিস : অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম ও অধ্যাপক ড. কাউছার আহমেদের পক্ষে গত ৪ মার্চ পাঠানো উকিল নোটিসে বলা হয়, নোটিস পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ‘ক্ষমা চেয়ে’ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে ‘ক্ষমা চেয়ে’ দুজনের কাছে আলাদাভাবে চিঠি পাঠাতে হবে। এছাড়া এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেটিও লিখিতভাবে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে। উকিল নোটিসে বলা এসব দাবি অযৌক্তিক হওয়ায় তা করার প্রশ্ন ওঠে না।