ঢাকার ৮০% ভবনই নকশা না মেনে

রাজধানী ঢাকায় নির্মিত ভবনের ৮০ শতাংশেই অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় হয়েছে। এক্ষেত্রে আগে নির্মিত ভবনের চেয়ে বর্তমানে নির্মাণাধীন ভবনে এ ব্যত্যয়ের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। রাজধানী ঢাকার পরেই ভবন নির্মাণে নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) এলাকা। সেখানে নির্মিত ভবনগুলোর মধ্যে ৬০ শতাংশ নির্মাণে নিয়মের ব্যত্যয় পাওয়া গেছে। ৫টি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও জাগৃকের মালিকানাধীন এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নকশার সবচেয়ে কম ব্যত্যয় হয়েছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (খুউক) এলাকায়। সেখানে নকশা ব্যত্যয়ের সংখ্যা ১১ শতাংশ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) এলাকায় নকশা ব্যত্যয়ের ভবনের সংখ্যা ৩৬ শতাংশ, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাউক) এলাকায় ২১ শতাংশ ও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) মালিকানাধীন এলাকায় ৫৪ শতাংশ ভবন নির্মাণের অনুমোদিত নকশা মানা হয়নি। সম্প্রতি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে ৬টি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আসা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবগুলো উন্নয়ন কর্তৃপক্ষই নকশা অনুমোদন করার সময় সব দেখেশুনে করে থাকে। কিন্তু দেখা গেছে নকশা অনুমোদন করার পর সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক তা না মেনেই নির্মাণকাজ করে। যারা নকশা না মেনে ভবন নির্মাণ করেছে আমরা তালিকা করে প্রথমে নোটিস দিচ্ছি। নোটিসে সাড়া না পেলে নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধমে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে।’

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মার্চ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভায় ৬টি কর্তৃপক্ষ তাদের আওতাধীন এলাকায় ভবন সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করে। সেখানে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গত ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ১ হাজার ৬৩০টি ভবন পরিদর্শন করে সেখানে ১ হাজার ৩০৬টি ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা না মানার চিত্র পেয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৬৬টি ভবন মালিককে নোটিস দিয়ে বাকি ৪০টি ভবনে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। চউক এলাকায় এক মাসে মোট ২২৬টি ভবন পরিদর্শন করে সেখানে ৮১টি ভবনে নির্মাণের নকশার ব্যত্যয় পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে চউক থেকে ৭২ জনকে নোটিস দিয়ে ৫টি ভবন উচ্ছেদ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (খুউক) এলাকায় মোট ১৩৬টি ভবনের মধ্যে ১৫টিতে নির্মাণে ব্যত্যয় পাওয়া গেছে। কউক এলাকায় মোট ৫৩টি ভবন পরির্দশন করে ৩২টিতে নির্মাণে ব্যত্যয় পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২টি ভবন ইতিমধ্যে ভেঙে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ। আর ১৮টি ভবন মালিককে নোটিস দিয়েছে। এছাড়া জাগৃক এলাকায় মোট ৯৮টি ভবন পরিদর্শনে ৩৯টি ও রাউক এলাকায় মোট ৬৩টি পরিদর্শন করা ভবনের মধ্যে ১৩টি নির্মাণে অনুমোদিত নকশা মানা হয়নি।

রাজউকের পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তানজিলা খানম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা ভবনের বিরুদ্ধে আমাদের বছরব্যাপী অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকে। দুইভাগে আমাদের এ অভিযান পরিচালিত হয়। একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত দিয়ে; অন্যটি নোটিসের মাধ্যমে।’

নোটিসের ক্ষেত্রে পরিদর্শনের সময় যদি মনে করি ভবনটি নির্মাণে নকশা মানা হয়নি সেক্ষেত্রে প্রথমে ‘মঞ্জুরি নোটিস’ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে কারণ দর্শানোর নোটিস আর পরে ১৫ দিন সময় দিয়ে ব্যত্যয় করা অংশ সংশোধন করার জন্য একটি চূড়ান্ত নোটিস দেওয়া হয়। এরপর কর্তৃপক্ষে বেঁধে দেওয়া জায়গাগুলো ঠিক না হলে সংশ্লিষ্ট ভবনে অভিযান চালানো হয়। অনুমোদিত নকশা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি অর্থদন্ডও দেওয়া হয়।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজউকের মূল কাজ হচ্ছে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু সেখানেই সংস্থাটির বেশি গাফিলতি দেখা যায়। যে বিভাগ থেকে নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণের বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা তারা কাজটি ঠিকমতো করছে না। এক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিও দেখি না। আমরা মনে করি রাজউকসহ সবগুলো কর্তৃপক্ষকে জোর দিয়ে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন।’