শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকৃতির মতোই আমাদের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সঙ্গে বহমান। তার সৃষ্টির ছোঁয়ায় আমরা একটি মানচিত্র পেয়েছি, পেয়েছি স্বাধীন একটি দেশ, যার নাম বাংলাদেশ। পেয়েছি লাল সবুজের পতাকা।
আশ্চর্যের বিষয়— এই স্বাধীন বাংলাদেশের উৎপত্তি একটি তর্জনীর ইশারা একটি মুখের বিপ্লবী কণ্ঠস্বর থেকে। যদিও এ দেশের স্বাধীনতার জন্য রজব আলী, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানীসহ অনেকেই বুকের রক্ত দিয়েছে, স্বাধীনতা কারো হাতে আসেনি। টুঙ্গিপাড়ার খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু সেই ছেলেটির হাতেই এসেছে স্বাধীনতা।
দিনটি ছিল ৭ মার্চ ১৯৭১ সাল। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো লাখো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে সেদিন একটি মানুষের মুখ থেকে উচ্চারিত কিছু শব্দাবলি বিচ্ছুরিত হয়ে একটি দেশের মুক্তিকামী মানুষদের করেছিল উদ্বেলিত, নিরস্ত্র বাঙালি স্বপ্ন দেখেছিল একটি স্বাধীন দেশের। ৯ মাস ১ সমুদ্র রক্ত দিয়ে কেনা এ দেশটি বাংলাদেশ।
এই ভূখণ্ডের পূর্বসূরিরা ছিল ২ হাজার বছর পরাধীন। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত এই পলি ভূমিতে আর্য-মৌর্য-গুপ্ত সাম্রাজ্য আমাদের এই ভূখণ্ড দখল করে সেই সপ্তম শতাব্দী থেকে আমাদের পূর্ব পুরুষেরা ছিল পরাধীন। পাল বংশ, সেন বংশ একের পর এক শোষক দল শাসনের নামে করেছে শোষণ। অথচ এ দেশের জন্ম হয়েছিল উর্বর পলিতে।
তলিয়ে যাওয়া রক্ত নদীর প্রবাহ, বোমার আঘাতে ঝলসে যাওয়া, আগুনের কুণ্ডলী থেকে এত এত রক্ত, এত এত মানুষের আত্মবলিদানে অর্জিত যে স্বাধীন লাল-সবুজ পতাকা আজ বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে সমগ্র পৃথিবী জুড়ে আমরা উড়তে দেখি সেই পতাকার মর্মর ধ্বনিতে আজও বেজে ওঠে, “আমাদের কেউ দাবাইয়া রাখতে পারবা না”।
কী ছিল সেই জাদুর ভাষণে?
যার প্রতিধ্বনি আর আঙুলের ইশারায় সাত কোটি নিরস্ত্র বাঙালি চোখের নিমেষে ঝাঁপিয়ে পড়লে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সামনে! যে ভাষণ শুনে মানুষ নিজের জীবনকে হাতে নিয়ে এগিয়ে চলল নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে অনুধাবন করতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরও অতীতে।
১৯৪৭ সালে যখন ভারত-পাকিস্তান দুটি আলাদা রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে যায়। আর ভৌগোলিক মানচিত্রের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তান দুটি আলাদা জনপদের সমন্বয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি পরিচালিত হয়। কিন্তু এই রাষ্ট্রের যাবতীয় শাসনভার পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতেই রয়ে যায়। পূর্ব বাংলার লোকেরা প্রতিটি পদে পদে তাদের অধিকার বঞ্চিত হতে থাকে।
এমনকি ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দুতে পরিণত করার প্রস্তাব করা হয়। সেই থেকে পূর্ব বাংলার মানুষ অনুভব করতে পারে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি তাদের কেবল দাসত্ব বানিয়ে রাখতে চায়।
তারপর ১৯৫২ সালে পূর্ব বাংলার মানুষ তাদের মাতৃভাষার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভেঙে গর্জে উঠলে। আর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী নির্বিচারে গুলি চালালে ছাত্র জনতার ওপরে। রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার ও বরকতের তাজা রক্তে ছেয়ে যায় ঢাকার রাজপথ। তার দুই বছর পরে ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় আইনসভার নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করে, তবুও বাংলার মানুষ তাদের অধিকার বঞ্চিত থাকে। ১৯৬৬ সালে পিতা মুজিবের ঐতিহাসিক ছয় দফার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন তুলে ধরা হয়।
১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানান অভিযোগ এনে বাঙালিদের ওপরে অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সেই অন্ধকার সময়ে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালি জাতির মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। তারপর এলো সেই ঐতিহাসিক দিন ৭ মার্চ, ১৯৭১।
বাঙালির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময় একটি দিন। ৭ মার্চের ভাষণে অনেকগুলো দিক পরিলক্ষিত হলেও বস্তুত দুটি দিক খুবই গুরুত্ব বহন করে— ধৈর্য ও সাহস। বঙ্গবন্ধু সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তেও বলেছিলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ফয়সালা করতে পারলে ভাই ভাই হিসেবে এ দেশে বাস করার সম্ভাবনা আছে। এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নেবার অনেক কিছুই আছে। যেকোনো ঝগড়া-বিবাদ-সহিংসতা মোকাবিলা করতে গেলে প্রথমে মানুষকে ধৈর্যশীল হতে হয়। ধৈর্য হারিয়ে ফেললে সবকিছু এলোমেলো হয়ে পড়ে। তা ছাড়া যেকোনো পরিস্থিতির সমাধান করতে গেলে প্রথমে দেখতে হয় শান্তিপূর্ণ দিকটাকে। যদি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান সম্ভব হয় তাহলে যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। যুদ্ধ মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে। তাই তো বঙ্গবন্ধু সেই উত্তাল অবস্থার ভেতর দাঁড়িয়েও শান্তির বার্তা ছড়িয়েছিলেন। কিন্তু তখনকার বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। বর্বর পাকিস্তান শান্তিকামী বাঙালির এই সংস্কৃতিকে দুর্বলতা ভেবেছিল। পাকিস্তানি শাসকদের এই মনোভাব বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন।
যখন মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায় তখন যুদ্ধই হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। সাত কোটি বাঙালি সেদিন এক প্রকার খালি হাতেই পাক বাহিনীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এটাই সাহস। কতটুকু সাহস প্রাণে সঞ্চারিত হলে মানুষ মরতেও ভয় পায় না, সেই সাহসের প্রবাহ বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণের মধ্যে ঢেলে দিয়েছিলেন। যার প্রতিফলন আমরা ২৬ মার্চের পরে দেখেছি যখন ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে পাকিস্তানের করাচি নিয়ে যাওয়া হয়। তখন বাংলাদেশ যেন বিশাল মহাসমুদ্রে একখণ্ড ভাসমান কাঠের টুকরায় পরিণত হয়েছিল।
এ দেশে তখন নেতা বলতে মানুষ একজনকেই চেনে-জানে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই নেতাই তখন দেশের মাটিতে ছিলেন না। তিনি বাঁচবেন কি মরবেন, কোনো দিন ফিরবেন কিনা তাও কেউ জানত না। এদিকে দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা শহরসহ প্রতিটি গ্রামে-গঞ্জে ঢুকে নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে মারছে, বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কী হবে এখন? কী করে মুক্তি মিলবে ওই পাকিস্তানি হায়েনাদের থেকে? কে এখন সাহস জোগাবে? সবাই কি তাহলে পাকিস্তানি মিলিটারির গুলির নিচে নিজেকে সঁপে দেবে? নাকি সবাই তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করবে?
না, এসবের কিছুই সেদিন হয়নি। কারণ বাংলার আকাশে-বাতাসে তখন ধ্বনিত হচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ— “তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে; মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো; তবুও এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশা আল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।
সেই ভয়াল মুহূর্তগুলোতে বঙ্গবন্ধু ছিল না। কিন্তু তার সেই বজ্রকণ্ঠ প্রতিটি মানুষের প্রাণে গাঁথা হয়েছিল। তাই তো বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, মো.মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিব নগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করেন। সেই সরকারের অধীনেই মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। অতঃপর লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। একাত্তরের ভগ্নদশা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে উন্নত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলছে। এই এগিয়ে চলার মাঝেও আছে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধের ইতিহাস। দেশ স্বাধীন হওয়ার চার বছর পরই বাংলাদেশের বুকে ঘটে যায় পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। যেদিন দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর এ দেশে শাসনভার পেয়ে যায় দুষ্কৃতকারী স্বৈরশাসক গোষ্ঠী। তারপর যখন ১৯৮১ সালে ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন, তখন থেকে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে। কিন্তু যুদ্ধ তখনো থামেনি। তারই নেতৃত্বে ১৯৯০ সালে রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদকে ক্ষমতা থেকে নামাতে বাধ্য করা হয়।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে ছোড়া হয় গ্রেনেড। অনেক নেতা-কর্মী সেদিন জীবন হারালেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি। এভাবে প্রতিটি পদে পদেই যুদ্ধ ও ষড়যন্ত্রের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। তবুও বাংলাদেশ কখনো দমেনি, থেমে থাকেনি। কারণ এই বাংলার মাটিতে একজন বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন। যিনি ৭ মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতিকে লড়াই করার মন্ত্র দিয়ে গেছেন। এই মন্ত্র যত দিন আমরা আঁকড়ে থাকতে পারবো তত দিন বাংলাদেশ পথ হারাবে না। বাংলাদেশ এগিয়ে চলবে দুরন্ত দুর্বার গতিতে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বা ৭ মার্চের সেই ভাষণ কতটা প্রভাবিত করে সেই আলোচনা বিশদ। তবে এটাই নির্মম সত্য যে, যেদিন আমাদের রাজনীতির মঞ্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেমে যাবে, যেদিন আমাদের ভেতর থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মুছে যাবে, সেদিনই আমাদের রাজনীতি অন্ধকার সমুদ্রে নিমজ্জিত হবে।
জানি, সেই দিন এ দেশের বুকে কোনো দিনও আসবে না। কেননা নদীমাতৃক এই দেশে যত দিন রবে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-বহমান তত দিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।
লেখক: সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ