বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন প্রশ্ন করেছিলেন নারী কেন পিছিয়ে? কারণ হিসেবে শিক্ষার অভাবকেই চিহ্নিত করেছিলেন তিনি। রোকেয়া ভেবেছিলেন শিক্ষা মেয়েদের নাগরিক অধিকার নিয়ে আসবে। এজন্যই রোকেয়া নারীদের মানসিক ও শারীরিক এই দুই শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে গেছেন। রোকেয়ার এই স্বাপ্নিক অভিযাত্রার শতবর্ষ পেরিয়ে আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে উপনীত। ইতিহাসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে, আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবসে দাঁড়িয়ে তাই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি ফিরে দেখাটা জরুরি।
স্বাধীনতার পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অনেক অর্জন বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের তুলনামূলক চিত্র থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। ১৯৭০ সালে স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে বাংলাদেশের জিডিপি ছিল মাত্র ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই সময়ে ৩০ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশের জিডিপি ২০১৯ সালে পৌঁছেছে ২৭৫ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে, ১৯৭০ সালে মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১৪০ ডলার, ২০২০ সালে গড় আয় পৌঁছেছে ২০৬৪ ডলারে। সে হিসেবে মাথাপিছু আয় বেড়েছে প্রায় ১৫ গুণ। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্পায়ন, গৃহায়ণ, নগরায়ণ, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, দারিদ্র্য বিমোচন, বিদ্যুতায়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো প্রভৃতি ক্ষেত্রে যেমন বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে তেমনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য তথা শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, গড় আয়ু, ইপিআই, নারীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রগতির কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এর মধ্যে বিগত পাঁচ দশকে দেশে নারীর অগ্রগতির চিত্র বুঝতে নারীশিক্ষার ব্যাপক প্রসারের বিষয়টি বিশেষভাবে আমলে নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘অ্যানুয়াল রিপোর্ট অন পাবলিক ইন্সট্রাকশন ফর দ্য ইয়ার ১৯৭০-৭১’ প্রতিবেদন অনুসারে, সে সময়ে দেশের মোট শিক্ষার্থীর ২৮ শতাংশের কিছু বেশি ছিল ছাত্রী। আর সরকারের শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে এখন মেয়েদের হার প্রায় ৫১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকেও প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ছাত্রী। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেয়েদের হার কিছুটা কম, ৩৮ শতাংশ। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, বখাটেদের উৎপাতসহ নানা কারণে মেয়েদের শিক্ষা ব্যাহত হলেও সার্বিকভাবে সাধারণ শিক্ষা ও পেশাগত শিক্ষায় মেডিকেল, প্রকৌশল এবং কারিগরি সব ক্ষেত্রেই মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শিক্ষার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখন ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের হার বেশি। ব্যানবেইসের একই প্রতিবেদন অনুসারে, ১৩ ধরনের পেশাগত শিক্ষায় ৫৪ শতাংশ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ২৫ শতাংশের কিছু বেশি, ইংরেজি মাধ্যমে স্কুলে ৪৪ শতাংশ এবং মাদ্রাসার দাখিল পর্যায়ে ৬০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী মেয়ে।
শিক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ কারণে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের সাফল্যে আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না। উচ্চশিক্ষাতেও যেন নারীর অংশগ্রহণ বাড়ে সে লক্ষ্যে নারীবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দেখা যাচ্ছে, অনেক অভিভাবক প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষা দিলেও উচ্চশিক্ষায় মেয়ের জন্য বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন না। এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা শেষে একজন নারী কোন পেশা গ্রহণ করবেন কিংবা নিজের জীবন গড়তে কী সিদ্ধান্ত নেবেন সেই স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এভাবেই সমাজে নারী-পুরুষের সমতা অর্জন এবং প্রকৃত অর্থে সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের পথ উন্মুক্ত হবে। সাম্প্রতিক নানা পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে পুরুষের তুলনায় কর্মসংস্থানে নারীর অবস্থান এখনো অর্ধেক। কিন্তু স্বাধীনভাবে কর্মসংস্থানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশের নারীরা এখনো পিছিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হলো নারীর শ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন। কর্মজীবী নারী বলতে আমরা কী বুঝি সেটা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। দেশের অন্ততপক্ষে ২ কোটি নারী সরাসরি
কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতসমূহে শ্রম দিচ্ছেন। দেশের রপ্তানি আয়ের বৃহত্তম উৎস তৈরি পোশাক খাতে কাজ করছেন ৩৫ লাখের বেশি নারী। এর পাশাপাশি সারা দেশের সব নারীই প্রাত্যহিক গার্হস্থ্য শ্রমে নিয়োজিত। কিন্তু গার্হস্থ্য শ্রমের যেমন অর্থমূল্য নিরূপণ হয় না, তেমনি তা জাতীয় উৎপাদনের কোনো সূচকেও অন্তর্ভুক্ত নয়। এ কারণেই আজকাল বলা হচ্ছে সব নারীই কর্মজীবী নারী।
আশাব্যঞ্জক খবর হলো, দেশে নারী-পুরুষ বৈষম্য বা জেন্ডার গ্যাপ কমছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স অনুসারে, নারীদের সামগ্রিক ক্ষমতায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশে বৈশ্বিকভাবে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। চলমান বৈশ্বিক করোনামহামারী মোকাবিলায় কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সফল তিন নারীনেত্রীর একজন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু কমনওয়েলথই নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও নারীনেত্রীরা মহামারী মোকাবিলায় বেশি সফল। এই তথ্য আমাদের পৃথিবীর প্রথম নারীবাদী বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী রোকেয়ার ‘সুলতানার স্বপ্ন’র কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। যেখানে রোকেয়া দেখিয়েছিলেন পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাচর্চার শেষ পরিণতি যুদ্ধ আর ধ্বংস। বিপরীতে নারীরা রাজ্য চালায় প্রেম ও সত্য দিয়েযা শান্তি আর সমৃদ্ধি নিয়ে আসে। আগামীর বাংলাদেশ শান্তি ও সমৃদ্ধির একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে সুবর্ণজয়ন্তীর নারী দিবসে এটাই প্রত্যাশা।