মঞ্চে এ প্রজন্মের চার নারী নির্দেশক

আজ ৮ মার্চ, বিশ্ব নারী দিবস। দিনটি নারীর সাফল্য উদযাপনের। নারীরা এখন সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে এসেছেন। একসময় দেশে নারী নির্মাতার কথা ভাবা যেত না। টিভি নাটক বা সিনেমায় এখনো নারী নির্মাতার সংখ্যা কম। তবে মঞ্চ ব্যতিক্রম। অনেকেই দারুণ সব নাটক পরিচালনা করছেন। মঞ্চের চার তরুণ নির্দেশকের সঙ্গে কথা বলেছেন মাসিদ রণ

নারী-পুরুষের সমতা ভীষণ জরুরি

ত্রপা মজুমদার

অভিনয়ের সঙ্গে অনেক আগে থেকে যুক্ত থাকলেও মঞ্চ নির্দেশনায় এসেছি অনেক পরে। বেশ কিছু নাটক নির্দেশনা দিয়েছি। আমার নির্দেশনার শুরু ‘মুক্তি’ নাটকটি দিয়ে। মা ও তিন মেয়ের কাহিনী নিয়ে নাটকটি রচিত। এটা আসলে আমেরিকান একটা নাটকের ভাবানুবাদ। এরপর ‘বারাম খানা’ (ফকির লালন শাহের ওপর নির্মিত) এবং ‘কুহক জাল’ নাটক দুটো মঞ্চে এনেছি। নতুন নাটকের কাজ ধরব শিগগিরই। আসলে কাজের প্রতি ভালোবাসা আর অভিজ্ঞতা থাকলে যে কেউ ভালো করতে পারে। এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোনো আলাদা ব্যাপার নেই। তবে এটা ঠিক যে নারীদের বাধার শুরুটা হয় পরিবার থেকেই। সেই আগল ছিন্ন করে বেশির ভাগ নারী বের হতেই পারেন না। যারা পারেন তারা পরিশ্রম করলে সফলতা পাবেন। এখন এমন নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, এটা ভালো দিক। একটি আধুনিক ও উন্নত সমাজ নির্মাণে নারী-পুরুষের সমতা ভীষণ জরুরি।

শুরুটা মসৃণ ছিল না

আইরিন পারভীন লোপা

শুরুর দিকটা আমার জন্য একেবারেই যে মসৃণ ছিল তা কিন্তু নয়। আমাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলে দু-একজন পুরুষ নাট্যবন্ধুর ইগোতে লাগত। কিন্তু ওসব কখনো গায়ে মাখিনি। যদি তা করতাম তাহলে পরবর্তী সময়ে পথচলাটা কঠিন হতো। আমি মনে করেছি যে, মেধার ছাপ রাখতে হবে। তা হলেই তারা আমাকে নিয়ে নিজেদের মূল্যায়ন বদলাবেন। তাই হয়েছে। ১৯৯৮ সাল থেকে মঞ্চে নির্দেশনা দিচ্ছি। এখন পর্যন্ত ৩৭টি নাটক মঞ্চে এসেছে। দেশের এমন কোনো প্রান্ত নেই যেখানে নাটকের কাজে না গিয়েছি। বলতে গেলে মানসিক তৃপ্তি নিয়েই কাজ করেছি। এটা থিয়েটারের বিশেষ সফলতা ও আরামের জায়গা। এত নাটকের মধ্যে পছন্দের নাটক আলাদা করা কঠিন। তারপরও আমার নিজের দল নাট্যম রেপার্টরির ‘দমের মাদার’ নাটকটির নাম বলা যায়। সিরাজগঞ্জের নাট্যলোকের জন্য করা মান্নান হীরার ‘ধীবর গাথা’ খুব প্রিয় একটি নাটক। জেলে সম্প্রদায়ের শোষণের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বগুড়াতে ২০০৮ সালে মান্নান হীরারই আরেকটি রম্য নাটক ‘কালো দৈত্য’ করেছিলাম। একাত্তরে কিছু লোক ছিল ওপরে মুক্তিবাহিনীর, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পাক বাহিনীর হয়ে কাজ করত। এই চরম দেশদ্রোহীদের নিয়ে সাহসী নাটকটি করে আত্মতৃপ্তি পেয়েছি। দু বছর আগে নাসরিন মুস্তাফার রচনায় বঙ্গবন্ধুর জীবনের সত্য ঘটনা নিয়ে ‘বাঘ’ নামের একটি নাটক করেছি দৃশ্যকাব্য নাট্যদলের জন্য। অনেকে বলেছেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নাটকে না আনলে জানতামই না। নাসরিন মুস্তাফার রচনায় কাঁচখেলা রেপার্টরির জন্য করছি ‘মজিবের মেয়ে’ নামে একটি নাটক। এটি শিগগিরই মঞ্চে আসবে।

থিয়েটারে ভেদাভেদটা নেই

নূনা আফরোজ

নারীরা ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে বেশিদিন তো হয়নি। তাই সব ক্ষেত্রেই তাদের আলাদা করে প্রমাণের একটা বিষয় রয়েছে। তাদের পুরুষের তুলনায় বেশি যোগ্য হয়ে দেখাতে হয়, দেখুন আমিও কাজটি সুন্দরভাবে করতে পারি। তবে আস্তে আস্তে দিন বদলাচ্ছে। বিশেষ করে সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার চেয়ে থিয়েটারে নারীর সক্রিয়তা বা সফলতা বেশি হওয়ার কারণ হলো থিয়েটারকর্মীদের মানসিক ব্যবস্থা। থিয়েটারে নারী-পুরুষের ভেদাভেদটা নেই। আমরা নাট্যকর্মী পরিচয়ে কাজ করি। এজন্য নারী নির্দেশক বলেন বা পর্দার পেছনের কাজ বলেন, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী বাধাহীন কাজ করছে। আমি একজন নারী নির্দেশক হিসেবে সেভাবে কোনো চ্যালেঞ্জ অনুভব করিনি। এ পর্যন্ত ৫টি নাটক মঞ্চে এনেছি। শুরুটা ছিল রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায় অবলম্বনে ‘স্বদেশী’। এরপর রবীন্দ্রনাথেরই ‘রক্তকরবী’ ও ‘শেষের কবিতা’ নির্দেশনা দিয়েছি। চতুর্থ নাটকটি ছিল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার ভাবনা বিষয়ক ‘আমি ও রবীন্দ্রনাথ’। শেষ কাজটি একেবারেই মৌলিক। নাম ছিল ‘কৃষ্ণচূড়ার দিন’।

পথপ্রদর্শকদের কষ্ট করতেই হয়

হৃদি হক 

কোনো কাজে সফলতা ব্যর্থতা নির্ভর করে তার মেধা, একাগ্রতা, সততা ও নিষ্ঠার ওপর। কিন্তু সারা বিশ্বেই নারীদের দুর্বল ভাবার বিষয়টি প্রচলিত। নারী-পুরুষের এই ব্যবধান আসলে সমাজসৃষ্ট। এজন্য নারীকে থেমে থাকলে হবে না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই যারা পথপদর্শক হবেন তাদের কষ্ট করতেই হয়। আমরা যে সব নারী মঞ্চে নির্দেশক হিসেবে কাজ করছি তারা এখন সেই কষ্টটা করছি। একটা সময় নারীরা আমাদের সৃষ্ট এই মসৃণ পথেই হাঁটবে। মঞ্চের সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত থাকলেও ২০১৫ সালে প্রথম নির্দেশনায় আসি। সেটি ছিল ফোকনির্ভর নাটক ‘গহর বাদশা ও বানেছা পরী’। কাজটি দর্শক খুব ভালোভাবে গ্রহণ করে। ফলে পরবর্তী সময়ে নতুন নাটক নির্দেশনা দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হই। এই ৫ বছরে তিনটি প্রযোজনা মঞ্চে এনেছি। দ্বিতীয়টি ছিল আমার লেখা ‘একাত্তর ও একজন নাট্যকার’। এটি আমার বাবা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ড. এনামুল হককে উৎসর্গ করে লেখা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনিই বিটিভিতে প্রথম মুক্তিযুদ্ধের নাটক ও ভাষা আন্দোলন নিয়ে নাটক লিখেছেন। এরপর আরও অনেক মুক্তিযুদ্ধের নাটক করেছেন। সেই সব নাটকের ওপরেই আমার এই গবেষণাধর্মী নাটক। সর্বশেষ ২০২০ সালে মঞ্চে নিয়ে আসি ‘আকাশে ফুইটেছে ফুল’।