তরুণীরা বেশি সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছেন: কামরুল আহসান

সাইবার ক্রাইমের শিকার নারীদের বেশির ভাগই তরুণী। তারা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগী নারীদের অনেকে অভিযোগ নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ক্রাইম কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টারে।

সাইবার অপরাধীদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন সিআইডি অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান। ৮ মার্চ নারী দিবস উপলক্ষে নারীদের সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া ও সেখান থেকে উত্তরণের বিষয়ে অভিজ্ঞতার আলোকে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন পুলিশের এ কর্মকর্তা।

তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের অপরাধ বিভাগের স্টাফ রিপোর্টার ইমন রহমান

সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে নারীরা আপনাদের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসে কোন বয়সের নারীরা সাইবার অপরাধীদের টার্গেটে বেশি পরিণত হচ্ছেন?

কামরুল আহসান: বর্তমানে সাইবার রিলেটেড ইস্যুগুলো চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসছে। আগামী দিনে আরো আসবে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ফেইসবুকে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ২৭ হাজার ৭৮৬ জন। ফোন কল করেছে প্রায় ৮ হাজারের মতো। ফোনে প্রায় ২ হাজারের বেশি সমাধান করেছি। ১৬৮৭ অভিযোগ আমরা নিয়েছি। এর মধ্যে মেয়েদের প্রতি হ্যারাসমেন্ট, উত্ত্যক্ত করা, ব্ল্যাকমেল করা বা প্রতারিত করার বিষয়টি বেশি। এদের মধ্যে বেশি রয়েছে টিনএজ মেয়েরা। অর্থাৎ বেশি প্রতারণার শিকার হচ্ছে ১৬ থেকে ২৫ বা ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েরা।

নারীরা কোন ধরনের অভিযোগ বেশি করছে এবং সেখান থেকে উত্তরণে কী ধরনের দিকনির্দেশনা দিতে চান?

কামরুল আহসান: প্রথমত হ্যারাসমেন্টের শিকার হচ্ছে। নানাভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে। তাদের ছবিগুলোকে ফরম্যাট করে দেওয়া হচ্ছে। তাদের প্রেমের সম্পর্ক জড়িয়েছে, একটু কাছাকাছি গেছে। যারা গভীরতায় গেছে সেটাকেই পরবর্তীতে পুঁজি করছে আর্থিক লাভের আশায়। সম্পর্কটা নষ্ট করে দিয়ে বলছে টাকা না দিলে ছবি ভাইরাল করে দেব। দেখা যাচ্ছে বাবা-মা রক্ষণশীল, সে ক্ষেত্রে মেয়েটা অসহায় হয়ে যাচ্ছে। তখন হয়তো একটা অবৈধ প্রস্তাব দিচ্ছে। প্রস্তাবে জড়ালে আরো ছবি তুলছে। এ বিষয়টি খুবই ভয়ংকর। পরিবারের কাছে লজ্জায় মুখ দেখাবে কীভাবে এমন চিন্তা থেকে অনেকে নিজের জীবনহানি করতে বা বিনষ্ট করতেও তখন আর কুণ্ঠিত হয় না। আমি মেয়েদের বলব, ফেইসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে ইঞ্জিনিয়ারিং হয় এটির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এখানে সাজেশন হচ্ছে, কতটুকু মেশা যায় এটা আপনাকে বুঝতে হবে, জানতে হবে। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই আছে। সুবিধা হচ্ছে, আমরা কানেকটিভিটিটা ফাস্টার করতে পেরেছি। আর অসুবিধা হলো আমরা এটার অপব্যবহারও দ্রুত করছি। তাহলে আমাকে কিছু কিছু অংশ ম্যানুয়ালি করতে হবে। অন্তরঙ্গতার কতটুকু যাব বা যাব না, বন্ধুত্বের কতটুকু জায়গা পর্যন্ত আমি মেনটেইন করব বা করব না-এ জায়গাগুলোর একটি বাউন্ডারি থাকা দরকার। সামাজিক অনুশাসনের জায়গাটাও মানাটা জরুরি।

অপরাধীদের বেশির ভাগ কোন বয়সের হন ?

কামরুল আহসান: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে নারীদের প্রতারিত করার জন্য ৫০ ঊর্ধ্ব পুরুষ যুবক সেজেছে। সে ২২ বছরের একটা ছেলে বা ২৫ বছরের একটা সুদর্শন যুবকের ছবি দিয়ে ভুয়া অ্যাকাউন্ট করেছে। তার পর সে ১০ থেকে ১৫টা প্রেম করছে। এর মধ্যে দুই-একজনকে কোনো না কোনো ভাবে গ্রিপেও নিচ্ছেন। নেয়ার পরে আর্থিকভাবে প্রলোভন দিচ্ছেন, তার সঙ্গে একটা শারীরিক সম্পর্কে জড়াচ্ছেন। গোপনে সেটার ছবিও তুলছেন। তুলে তাকে নিয়মিত ব্ল্যাকমেল করে যাচ্ছেন। এ রকম শুধু অভিযোগ না মামলাও আমরা গ্রহণ করেছি। আমরা সম্প্রতি একজন ব্যাংকারকে পেয়েছি। তিনি এমন কাজ করছিলেন। তার বিরুদ্ধে আমরা মামলাও নিয়েছি। হঠাৎ করে কোন ছবি দেখে সেটি যদি আপনার পরিচিত না হয়, যদি পরিচিত গ্রুপের লিংক থেকে না পেয়ে থাকেন তাহলে ওই লিংকে যেন বন্ধুত্ব করতে না যায়। আর বন্ধুত্ব করলেও সতর্কতা জরুরি।

সাইবার অপরাধীরা কোন প্রক্রিয়ায় অপরাধ সংগঠনের চেষ্টা করে?

কামরুল আহসান: সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে মোবাইল ফোনে অনেক মেসেজ আসছে। সেখানে বলা হচ্ছে, আপনি এই মেসেজের মাধ্যমে আসা লিংকে যদি ক্লিক না করেন তাহলে আপনার এই ফেসবুকের মধ্যে যে সমস্ত ছবি আছে অথবা যে সমস্ত সাইটে ভিজিট করেছেন এই ভিজিটেড সাইটগুলো সম্পর্কে পাবলিক করে দেওয়া হবে। তার মানে ধরেন কোনো একজন মানুষ যদি নিষিদ্ধ কোনো সাইটে গিয়ে থাকেন, তাহলে সে যদি দেখে তার সাইটে ভিজিট হিস্ট্রি ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে তখন সেও একটা লজ্জায় পড়ে যেতে পারে। এ রকম মেইলও ইদানীং আসছে। এগুলো সব হ্যাকিং সাইট। এগুলো ডেটা হ্যাক করে। এগুলোতে আতঙ্কিত হওয়ার বিষয় আছে। কিন্তু এগুলোতে মনযোগ না দেওয়াই ভালো।

কীভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিরাপদ রাখা যায়?

কামরুল আহসান: বিভিন্ন ডিভাইসের পাসওয়ার্ড অবশ্যই কিছুদিন পরপর পরিবর্তন করতে হবে। এক পাসওয়ার্ডে মাসের পর মাস চলতে পারবেন না। সিকিউরিটির জন্য এটা দরকার। বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় বলা যে, আমাদের দেশের মেয়েরা খুবই অনুভূতি প্রবণ। তারা সহজেই যে কোনো কিছু বিশ্বাস করে ফেলে। এই জায়গায় বিশেষত আর্থিক প্রতারণার শিকার তারা বেশি হচ্ছে। মোবাইলে ব্যক্তিগত কিছু স্টোর না কারা ভালো। যে অংশগুলো একদম ব্যক্তিগত সেগুলো হার্ডডিস্কে সরিয়ে নেওয়া ভালো। কারণ মোবাইলটি যদি হারিয়ে যায় বা কোনোভাবে কেউ হ্যাক করে বা চুরি হয়ে যায় তাহলে এই ডেটাগুলো অনেক ঝুঁকি নিয়ে আসে। এ রকম ঝুঁকির মধ্যে অনেকে পড়েছেন। অনেকের ব্যক্তিগত ছবি এমনভাবে শেয়ার হয়েছে যে, টাকা-পয়সা দিলেও তারা রক্ষা পায়নি। অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক অপরাধী ভয়েস রেকর্ড করে থাকে। দুর্বল মুহূর্তে এটা কাউকে শেয়ার করে। সেটিও এক ধরনের মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। অনেকে ফোনে পাসওয়ার্ড, অ্যাকাউন্ট নম্বর রেখে দেন। এগুলো রাখা যাবে না।

ভুক্তভোগী নারীদের ক্ষেত্রে পরিবারের কি ভূমিকা রাখা দরকার?

কামরুল আহসান: আমরা আমাদের সন্তানদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিচ্ছি। টিনএজ গ্রুপের যারা অভিভাবকের আওতায় থাকেন, তাদের ব্রাউজ হিস্ট্রি যদি মা-বাবা দেখতে পারেন তাহলে খুবই ভালো হয় এবং যে আইপিটা ব্যবহার করছে সেই আইপির প্রোটেকশন লেভেলটা কি এটা বুঝতে পারা। ভিপিএন যদি ব্যবহার করে তাহলে যে জায়গাগুলোতে যাওয়ার সুযোগ নাই সেখানে যে কেউ যেতে পারে। যদি ব্রাউজ হিস্ট্রি দেখেন তাহলে এগুলো বুঝতে পারবেন। বাবা-মার দায়িত্ব সন্তানকে বোঝান, যেন ডিজিটাল মাধ্যমে কাউকে গালাগাল না করে। এমন কিছু শেয়ার না করা যা আরেকজনের ক্ষতির কারণ হয়। সামাজিক শিক্ষাটা ডিজিটাল ফরম্যাটে নিয়ে আসলেই হবে। আর মানুষ ভুল করতেই পারে। সংশোধনের জায়গাও আছে। বাবা-মাকে অবশ্যই সন্তানকে বোঝাতে হবে। দরকার হলে যে জায়গাটাতে সমস্যা মনে করছেন, সেখানে ভালো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারেন।  যে সমস্যাগুলোতে আইনগত সমাধানের সুযোগ আছে, সেখানে পুলিশের কাছে দ্বারস্থ হওয়া উচিত। হঠাৎ করে রাগ করে বকাঝকা করা উচিত না। এতে সাইকোলজিকাল ট্রমা হতে পারে। যে ট্রমাটা ক্ষতির কারণ হতে পারে। যারা হ্যারাসমেন্টের শিকার হচ্ছে, তাদের প্রতি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ঝড়ের বেগে দেখান যাবে না। ধীরে ধীরে সময় নিয়ে বোঝাতে হবে।

দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ।

কামরুল আহসান: দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ।