সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন

বিভক্তির অস্বস্তিতে বিএনপিপন্থিরা জয় পেতে মরিয়া আ.লীগ সমর্থকরা

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (সুপিম কোর্ট বার) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। তাদের দুটি প্যানেল নির্বাচনের মাঠে নেমেছে। এতে অস্বস্তি বেড়েছে বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের। অবশ্য বিএনপিপন্থি মূলধারার দাবি করা আইনজীবী নেতারা দুটি প্যানেল সৃষ্টিকে সরকারের চক্রান্ত বলে মনে করছেন। তাদের আশা ছিল ‘বিদ্রোহী’ আখ্যা পাওয়া প্যানেলটি নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এক হয়ে কাজ করবে। কিন্তু সেটি এখন পর্যন্ত হয়নি। তবে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা বলছেন, শেষ মুহূর্তে সবাই এক হয়ে কাজ করবেন। অন্যদিকে জয়ের জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা। সবমিলিয়ে শেষ মুহূর্তে উভয়পক্ষই জোরেশোরে প্রচার চালিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট বারে এক বছরের প্রতিনিধি নির্বাচনের লক্ষ্যে সভাপতি ও সম্পাদকসহ কার্যনির্বাহী কমিটির ১৪টি পদে আগামীকাল বুধবার ও বৃহস্পতিবার ভোট হবে। এবারের নির্বাচনে ৮ হাজার ৭০০ আইনজীবী ভোটার রয়েছেন। সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীদের এ নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় হলেও কার্যত দলপন্থিদের নিয়ে প্যানেলের আদলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও সারা দেশের জেলা বারের আইনজীবীদের নজর ও উৎসাহ থাকে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ (সাদা প্যানেল) এবং বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য পরিষদের (নীল প্যানেল) ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেন।

সাদা প্যানেল থেকে এবার সাবেক আইনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু সভাপতি পদে এবং অ্যাডভোকেট মো. আবদুল আলিম মিয়া জুয়েল সম্পাদক পদে নির্বাচনে লড়ছেন। অন্যদিকে বিএনপিপন্থিদের নীল প্যানেল থেকে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান সভাপতি এবং রুহুল কুদ্দুস কাজল সম্পাদক পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া অ্যাডভোকেট ওয়ালিউর রহমান খান সভাপতি এবং অ্যাডভোকেট মির্জা আল মাহমুদ সম্পাদক পদে বিএনপিপন্থি আরেকটি প্যানেল নির্বাচনে নেমেছে। ফজলুল রহমান জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য সচিব ও বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। রুহুল কুদ্দুস কাজল সমিতির বর্তমান সম্পাদক। ওয়ালিউর রহমান জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের সহসভাপতি ছিলেন। মির্জা আল মাহমুদও সংগঠনের সদস্য ছিলেন। এ প্যানেলের একাধিক প্রার্থী দাবি করেন, দলের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের অনেকেই তাদের পাশে রয়েছেন। তবে কৌশলগত কারণে প্রকাশ্যে আসছেন না তারা।

বিএনপিপন্থি বেশ কয়েকজন আইনজীবী নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফোরামের সম্মেলন, কমিটি গঠন, খালেদাপন্থি-তারেকপন্থি নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে অনৈক্য ও মতবিরোধ অনেক দিন ধরেই চলছিল। সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচনেও সেটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নীল প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে অন্য প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী এবিএম ওয়ালিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফোরামের মধ্যে যেকোনো বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে কিছু বলব না। আমি বিএনপির আদর্শে বিশ্বাস করি। দীর্ঘদিন ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটের সহসভাপতি পদে ছিলাম। যেদিন থেকে নির্বাচনের চিন্তা শুরু করেছি, সেদিন থেকেই মাঠে আছি। শেষ পর্যন্ত থাকব। আমাদের বিদ্রোহী বলে কটাক্ষ করা হচ্ছে। কিন্তু এটা নির্দলীয় নির্বাচন এবং যে কারও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে।’

সুপ্রিম কোর্ট বারের বর্তমান সম্পাদক ও নির্বাচনে সম্পাদক প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস কাজল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে নীল প্যানেল কারা এটা সবাই জানে। নীল প্যানেল যেহেতু বিএনপি সমর্থিত প্যানেল, তাই মূল প্যানেলকে বিভ্রান্ত করার জন্য এটা সরকারের নানামুখী চক্রান্ত হতে পরে। তবে সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্যদের এত বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই। এখানে মার্কার ভোট হয় না। ভোট হয় নামের ওপর। তাই এ বিষয়টি বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়বে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি একটি বড় রাজনৈতিক দল, তাই এরকম হতেই পারে। আর জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা তাদের (কথিত বিদ্রোহী) সঙ্গে রয়েছে বলে তারা যে দাবি করছে এগুলো শুধুই কথার কথা। সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচনে এরকম প্রার্থী থাকে। কিন্তু জয়-পরাজয় মূল স্রোতের মধ্যেই থাকে।’

ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ও সদস্য সচিব ফজলুর রহমানের অনুমোদন সাপেক্ষে গত ২৬ জানুয়ারি অ্যাডভোকেট আবদুল জব্বার ভূঁইয়াকে সভাপতি এবং অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজলকে সম্পাদক করে ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট শাখার ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর কয়েক দিন পর গত ১ ফেব্রুয়ারি অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারকে সভাপতি এবং রফিকুল হক তালুকদার রাজাকে সাধারণ সম্পাদক করে ৫০১ সদস্যবিশিষ্ট ফোরামের সুপ্রিম কোর্ট শাখার আরেকটি কমিটি ঘোষণা করে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের একটি অংশ। এর কয়েক দিন পর তৈমূর আলম খন্দকার সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ালে ফোরামের সাবেক সহসভাপতি গোলাম মোস্তফাকে কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। বিদ্রোহী কমিটির একাধিক আইনজীবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশের ৬৪টি বারে সম্মেলনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কমিটি গঠন করা হলেও সুপ্রিম কোর্ট শাখার কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সেটি মানা হয়নি। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তারা অবমূল্যায়িত হচ্ছেন। যে কারণে তারা পাল্টা কমিটি ও প্যানেলে নির্বাচন করছেন।

বিএনপিপন্থি অন্য প্যানেলের সম্পাদক প্রার্থী অ্যাডভোকেট মির্জা আল মাহমুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্মেলন না করেই একপক্ষ তাদের ইচ্ছেমতো কমিটি করেছে। আমাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। যে কারণে আমরাও প্রার্থিতা দিয়েছি।’ নিজেদের বৈধ প্রার্থী দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপিপন্থি ফোরামের নাম করে যারা নির্বাচন করছেন তারা পকেট কমিটি। তাদের সঙ্গে সিনিয়র আইনজীবীরা নেই। কৌশলগত ও দলের চেইন অব কমান্ড বজায় রাখার স্বার্থে সিনিয়র আইনজীবীরা প্রকাশ্যে আমাদের সমর্থন না দিলেও নীরবে সমর্থন দিচ্ছেন।’

তবে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ফজলুর রহমান ও রুহুল কুদ্দুস কাজলকে মনোনয়ন দিয়েছি। ফোরামের সম্মেলন ও কমিটি গঠন নিয়ে একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। যে কারণে অন্যরাও প্যানেল দিয়েছে। আমার মনে হয় শেষ মুহূর্তে দলের স্বার্থে সবাই এক হয়ে কাজ করবে।’

এদিকে সাদা প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। আমি আইনমন্ত্রী থাকাকালে আইন ও বিচার বিভাগের জন্য অনেক কাজ করেছি। সুপ্রিম কোর্টের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিচার বিভাগে আমূল পরিবর্তন এনেছি। আমি বিশ্বাস করি আইনজীবীরা আমার ব্যাপারে ইতিবাচক বিবেচনা করবেন।’