ভারত দেখিয়েছে তারা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে নিজের স্বার্থরক্ষা করতে যথেষ্টই সক্ষম। আর এখন শক্তিশালী অবস্থানে থেকেই শান্তির পথে হাঁটতে চাইছে দেশটি।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর সেনা প্রত্যাহার শুরু এবং নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) বরাবর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হয়। এর মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লির আঞ্চলিক নীতি আরেকটি কৌতূহলকর মোড় নেয়। বিষয়টি ঘটে পাক্কা ৯ দফা উচ্চপর্যায়ের সামরিক আলোচনার পর। পানগং তসো অঞ্চলে অসামরিকীকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চীনা এবং ভারতীয় সৈন্যসামন্ত এবং অস্ত্রসরঞ্জাম তাদের স্থায়ী ঘাঁটিতে ফিরে গিয়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর একাধিক স্থানে ভারতীয় সেনারা এখনো চীনা প্রতিপক্ষের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি অব্যাহত রাখলেও সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপগুলোকে ব্যাপকভাবে দুই এশীয় পরাশক্তির মধ্যে দীর্ঘকালীন উত্তেজনা হ্রাস প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দুদেশের সামরিক অভিযানবিষয়ক মহাপরিচালকরা (ডিজিএমও) টেলিফোনে নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) বিষয়ে কথা বলেছেন। তারা সীমান্তে উভয়ের সুবিধা এবং টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে নিয়ন্ত্রণরেখা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তের বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত সব চুক্তি মেনে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। উভয় দেশের মধ্যে ২০০৩ সালে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলার জন্য ২০১৮ সালেও একটি সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীন-ভারত সীমান্তে অস্থিরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমবর্ধমানভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালে পাঁচ হাজারেরও বেশিবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের খবর পাওয়া গেছে। এ বছর এ পর্যন্ত পাকিস্তান ৬০০ বারেরও বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিদ্যমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা সবাইকে অবাক করে দেয়।
ভারতে এই ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষণে যা চোখে পড়ার মতো তা হলো পরাজয়তত্ত্বের এক আজব ধুয়া। কেউ কেউ এই পদক্ষেপগুলোকে ভিতুর কাজ বলে সমালোচনা করেছেন। অন্য কেউ কেউ আবার মন্তব্য করেছেন, বাইরের চাপের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসরণ করা হয়েছে এ নীতি। কিন্তু ভারতের আঞ্চলিক পরিবেশ এবং নয়াদিল্লির বৈদেশিক নীতি এবং নিরাপত্তাগত অবস্থানের মৌলিক পরিবর্তনগুলোর যথাযথ মূল্যায়নের পরই শুধু এ ধরনের নীতিগত উদ্যোগের সমালোচনা করা যেতে পারে। আর এখন পর্যন্ত এ ধরনের মূল্যায়ন অনুপস্থিত বলেই আমরা দেখছি।
সব দেশের নীতিগত কাঠামো রূপ নেয় বিস্তৃত ঘরোয়া, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের বিবেচনা থেকে। কোনো দেশই, এমনকি সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোও ‘অনন্য বিচ্ছিন্নতার’ অবস্থায় থাকে না, যেখানে কোনো বাহ্যিক কারণ নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলে না। বুদ্ধিদীপ্ত নীতি হচ্ছে সেটাই যেখানে ওই সীমাবদ্ধতাগুলোকে স্বীকৃতি দিয়ে তা সঠিক সময়ে নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করা হয়।
গত কয়েক মাসের মধ্যে একক বৃহত্তম ভূরাজনৈতিক বিষয় হচ্ছে ২০২০ সালের জুন মাসে গালওয়ান উপত্যকার ঘটনার পর ভারতের চীনকে সফলভাবে মোকাবিলা করা এবং এর মাধ্যমে পেইচিং এবং বিশ্ববাসীকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দেওয়া যে, তাদের পক্ষে সফলভাবে চীনা আগ্রাসন প্রতিহত করা সম্ভব।
ভারতীয় বাহিনী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর তাদের উল্লেখযোগ্যভাবে অধিকতর অস্ত্রসরঞ্জামে সমৃদ্ধ চীনা প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানালেও ভারতীয় কূটনীতি বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা অব্যাহত রাখা নিশ্চিত করেছিল। এ ভূমিকাটি হচ্ছে করোনা টিকার অন্যতম প্রধান সরবরাহকারীর, যা বিশ্বব্যাপী চলমান এ স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় অবদান রাখছে। বেশির ভাগ দেশের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ দেশীয় ও বৈশ্বিক পরিবেশে চীনের সঙ্গে দ্বৈরথে লিপ্ত হওয়া অসম্ভব হতো। তবে নয়াদিল্লি পিছপা না হয়ে তাদের মোকাবিলা করে। বিশ্বের কাছে ভারতের বার্তা ছিল এটাই যদি ‘নতুন সাধারণ’ হয় তবে আমরা প্রস্তুত।
শুধু বাকি বিশ্বই নয়, পেইচিংও তা লক্ষ করেছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি যে এখন ‘সীমান্তবিরোধ নিষ্পত্তি করার জন্য সহায়ক পরিস্থিতি তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা’ নিয়ে কথা বলছে, তা ভারতের তৎপরতারই ফল। ভারত ধারাবাহিকভাবে বার্তা দিয়ে গেছে যে, চীন-ভারত সম্পর্ককে সীমান্ত সংকট নিয়ে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার অবকাশ নেই। ভারত ও চীনের মধ্যে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কৌশলগত ভিতটি বরাবরের মতোই নাজুক রয়ে গেছে। চীনা সেনারা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার একটি অংশ থেকে সরে গিয়েছে বলেই এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে দেশটি তার আচরণ বদলাবে। তবে এ তথ্যটি আর উপেক্ষা করা যাবে না যে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে শর্ত ঠিক করায় ভারতের সামর্থ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নয়াদিল্লি যেভাবে কাশ্মীরের এলওসির বিষয়ে নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে এগিয়েছে, তাতে এই আত্মবিশ্বাসটি প্রতিফলিত হয়েছে। বহু বছর পর ভারতের পাকিস্তানবিষয়ক নীতি দেশটিকে বিভিন্ন দিক দিয়ে চাপে ফেলতে পেরেছে।
অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তানের বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা দেশটিকে ফেলেছে চরম বিপাকে। এ ছাড়া ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের নজরদারি, প্রথমে যা ভাবা হয়েছিল তার চেয়ে বেশি কার্যকর হয়েছে।
কূটনৈতিকভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের প্রচারণা সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার পাকিস্তানি তৎপরতার ওপর সবার মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। সামরিকভাবে ভারত প্রমাণ করেছে যে তারা কেবল পাকিস্তানের পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলা করতেই সক্ষম নয়, প্রচলিত কায়দার দ্বৈরথেও যথাযথ সাড়া দিতে পারে এবং বেপরোয়া আচরণের জন্য পাকিস্তানকে মূল্য চুকাতে হতে পারে। আর চীনকে মোকাবিলার মাধ্যমে কৌশলগতভাবে রাওয়ালপিন্ডির কাছে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে চীন-পাক মৈত্রীও দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জে সাফল্যের কোনো নিশ্চয়তা নয়। এর ফল হচ্ছে নয়াদিল্লির জন্য চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনীতির খেলা আজ ততটা ব্যয়বহুল নয়, একসময় যতটা ছিল। এটিই আঞ্চলিক ছক আর ভারতের নিরাপত্তার হিসাবনিকাশের আসল পরিবর্তন। ভারত যে শান্তির পথে হাঁটছে তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে মিলমিশের মতো ধোঁয়াটে ধারণা বা ওয়াশিংটনের মতো বাইরের শক্তির চাপের কারণে নয়। নয়াদিল্লি কখনোই কূটনীতির দরজা বন্ধ করে দেয়নি। আর ভারতের প্রতিবেশীরা সে পথে না যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারত যদি এখন আবারও কূটনীতিকে সুযোগ দিতে রাজি হয়, তবে তা হবে কেবল কার্যকরভাবে এটি প্রমাণ করার পরই যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলে নিজের স্বার্থ সংরক্ষণে দেশটি প্রয়োজনের চয়েও বেশি প্রস্তুত। আর ঘরোয়া বিরোধিতা সত্ত্বেও এ বার্তাটি ভারতের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা ঠিকই শুনতে পাচ্ছে।
লেখক : লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক। নয়াদিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষণাবিষয়ক পরিচালক দি হিন্দুস্থান টাইমস থেকে ভাষান্তর আবু ইউসুফ