একাত্তরের এই দিনে পূর্ব পাকিস্তানে তখন স্বাধীনতার মন্ত্রে দৃপ্ত বাঙালি। অগ্নিবিদ্রোহে টালমাটাল গোটা দেশ। অসহযোগ আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। বাড়ছে মানুষের জোট। প্রতিদিনই যূথবদ্ধ শপথ নিচ্ছে বাঙালি। মূল লক্ষ্য-স্বাধীনতা। সে লক্ষ্যের মধ্যমণি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন তিনিই বাঙালির অঘোষিত সরকারপ্রধান। মানুষ চলছিল তারই নির্দেশে।
আজ ১১ মার্চ। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে একাত্তরের এই দিনে পূর্ব পাকিস্তানে ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হয়ে আসে। লেনদেন শুরু হয় স্টেট ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক ও সরকারি ট্রেজারিতে। বিমান ছাড়া সড়ক, রেল ও নৌ চলাচল অব্যাহত থাকে। শহরের বিপণিবিতানগুলো সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত খোলা থাকে। নারায়ণগঞ্জের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে ছায়াছবি শুরুর আগে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতের পরিবর্তে পরিবেশন শুরু হয় ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি।
বরিশালের কারাগার ভেঙে ২৪ কয়েদি বেরিয়ে আসেন। কয়েদিদের সঙ্গে কারারক্ষীদের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই কয়েদির মৃত্যু হয়। আহত হন ২০ কয়েদি ও ২৪ কারারক্ষী। একইভাবে কুমিল্লা কারাগার ভেঙে বেরিয়ে আসার সময় কারারক্ষীর গুলিতে তিন কয়েদি মারা যান ও সংঘর্ষে আহত হন শতাধিক কয়েদি ও পুলিশ।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এক বিবৃতিতে বলেন, এ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কর্র্তৃক জারিকৃত নির্দেশগুলোকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের পক্ষ থেকে জারি করা হয়েছে বলে গণ্য করতে হবে। এই দিন আরও ১৪টি নির্দেশের কথা ঘোষণা করেন তিনি।
টাঙ্গাইলে বিন্দুবাসিনী হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভায় ন্যাপপ্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালনের আহ্বান জানান। ন্যাপ (ওয়ালী) বাংলাদেশ শাখার সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, পাঞ্জাব আওয়ামী লীগ সভাপতি এম খুরশীদ, কাউন্সিল মুসলিম লীগপ্রধান মমতাজ দৌলতানার বিশেষ দূত পীর সাইফুদ্দিন ও ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি কে উলফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ধানমণ্ডির বাসায় পৃথক বৈঠক করেন। সিএসপি ও ইপিসিএস সমিতির বাঙালি সরকারি কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান।
সিলেট, রংপুর ও যশোরে রসদ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর স্বাভাবিক সরবরাহের সময় সেনাবাহিনীর কনভয় আটকে দেয় জনতা। রাতে সামরিক কর্র্তৃপক্ষ ১১৪নং সামরিক আদেশ জারি করে সংশ্লিষ্টদের সামরিক বিধি অনুযায়ী শাস্তির নির্দেশ দেয়।
স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতা নুরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, গত ১০ মার্চ ভোরে চট্টগ্রাম বন্দরের ১৭ নম্বর জেটিতে এমএন সোয়াত নামে একটি অস্ত্রবাহী জাহাজ নোঙর করেছে। বন্দরশ্রমিকরা জাহাজ থেকে সমরাস্ত্র খালাসের নির্দেশ উপেক্ষা করেছেন। স্বাধীন বাংলার নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যই এ অস্ত্র আনা হয়েছে।
অন্যদিকে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলি ভুট্টো করাচি থেকে বঙ্গবন্ধুর কাছে পাঠানো এক তারবার্তায় বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত। ধ্বংস এড়ানোর জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই আমাদের করতে হবে। যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে দেশকে রক্ষা করতেই হবে।
করাচিতে গণঐক্য আন্দোলনের নেতা এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে অবিলম্বে ক্ষমতা দেওয়া না হলে দেশের দুই অংশকে এক রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সংখ্যালঘু দলগুলোর প্রতিনিধিরাও শেখ মুজিবের চার দফা দাবির প্রতি সমর্থন জানান। সামরিক কর্র্তৃপক্ষ রংপুর শহরে আরোপিত রাত্রীকালীন কারফিউ প্রত্যাহার করে নেয়।