করোনায় নিয়মিত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত কিডনি রোগীরা

দেশে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে কিডনি রোগীর সংখ্যা। সরকারের তথ্যমতে, দেশে আড়াই কোটি কিডনি রোগী রয়েছেন। করোনাভাইরাসের আতঙ্কের কারণে তাদের অনেকেই নিয়মিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে আক্রান্ত রোগী অনুপাতে চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র কম থাকায় ভোগান্তি বাড়ছে কিডনি রোগীদের। এ বিষয়ে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর অনেক বেসরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি অনেক সরকারি হাসপাতালেও নিয়মিত চিকিৎসাসেবা মিলছে না বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীর ফার্মগেটের বাসিন্দা আরতী বিশ্বাস কিডনি রোগে ভুগছেন গত দশ বছর ধরে। বর্তমানে মিরপুরের কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। দেশ রূপান্তরকে আরতী জানান, কিডনি, ফুসফুসে পানি জমা, বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি নিয়মিত চিকিৎসা নিতেন। কিন্তু করোনার পর থেকে সে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাননি। এরপর আরও কয়েকটি হাসপাতালে চেষ্টা করেও তার স্বজনরা চিকিৎসা পেতে ব্যর্থ হন। এখন মিরপুর কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসা নিলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা পাচ্ছেন না।

বিশেষায়িত এই হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. শেখ মইনুল খোকন দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রতিদিন শতাধিক রোগী ডায়ালাইসিসের জন্য আসেন, যাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। তিনি বলেন, ‘করোনার ভেতরেও আমাদের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত ছিল। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি চিকিৎসা দেওয়ার।

এমন পরিস্থিতির বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘করোনার ধাক্কায় পুরো পৃথিবীর চিকিৎসাব্যবস্থা পাল্টে গিয়েছে। তার প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। আমাদের দেশে  এমনিতে কিডনি রোগীর চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল। এর ব্যয়ও অনেক বেশি। তাই চিকিৎসকদের রোগীদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। যেহেতু এখন করোনা পরিস্থিতি বিদ্যমান তাই যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসকদের কিডনি রোগীদের সেবা দেওয়া উচিত।’

আজ ১১ মার্চ বিশ্ব কিডনি দিবস সামনে রেখে গতকাল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে কিডনি রোগের চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। পাঁচ বছর আগে ডায়ালাইসিস খরচ ছিল ১৫০০-২০০০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ৩-১০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এছাড়া পরীক্ষা খরচ ও ওষুধের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা খরচ কম থাকলেও অপ্রতুলতায় সেই সেবা পাচ্ছেন না বেশিরভাগ রোগী। ফলে কিডনি সমস্যায় আক্রান্তদের ৯০ শতাংশই ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারছেন না।

 দেশে কত মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কারও কাছে নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ বিষয়ে বড় ধরনের কোনো উদ্যেগ নেওয়া হয়নি। তবে কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে ভুগছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ হাজারের কিডনি পুরোপুরি অকেজো হচ্ছে প্রতি বছর। ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপন ছাড়া এ রোগের বিকল্প কোনো চিকিৎসা নেই।

কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎকরা জানান, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়বেটিস ও ভাস্কুলার বা রক্তনালির রোগাক্রান্তদের মধ্যে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। তাই এসব রোগীর ক্রনিক কিডনি ডিজিজ পরীক্ষার (স্ক্রিনিং) আওতায় রাখা প্রয়োজন। কারণ, একটি বড় অংশের রোগী, যাদের ক্রনিক কিডনি ডিজিজ প্রাথমিক পর্যায়ে (স্টেজ ১-৩) ধরা পড়ে, তাদের চিকিৎসার আওতায় রাখলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই রোগ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে না। এই চূড়ান্ত স্তরে কিডনি প্রতিস্থাপন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে কিডনি রোগীর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। ছোট ছোট কিছু পরিসংখ্যান রয়েছে। তবে বাস্তবে পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি। সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সুবিধা কম থাকায় অনেকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এতে একজন রোগীর ডায়ালাইসিস, পরীক্ষা, ওষুধ বাবদ মাসে ৩-৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়ে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের ১০ ভাগেরও কম রোগী ডায়ালাইসিস চালিয়ে যেতে সক্ষম। ৫০-৬০ ভাগ কিডনি রোগী ডায়ালাইসিস শুরু করলেও কিছুদিন পর তা বন্ধ করে দেন। দেশের কিডনি রোগীরা দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। চিকিৎসাকেন্দ্র ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বাড়ানোর এখনই উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

বিশ্ব কিডনি দিবস আজ : ১১ মার্চ বিশ্ব কিডনি দিবস। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি, সর্বত্র সবার জন্য’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন, ক্যাম্পস, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন, পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।