আইন সংশোধনীর খসড়া

এমএলএমে নিষিদ্ধ হচ্ছে পিরামিডসদৃশ বিক্রয়

পিরামিডসদৃশ বিক্রয় নিষিদ্ধ করে বহুস্তর বিপণন (এমএলএম) কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালার সংশোধনীর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সংশোধনীটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত হলে দেশের অবৈধ এমএলএম কোম্পানিগুলোকে নিষিদ্ধ করা ও অনুমতিপ্রাপ্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। আমি খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব।’ অতিরিক্ত সচিব (ডিটিও) সোলেমান খানও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘খসড়া নিয়ে কাজ চলছে। অফিস সময়ে খোঁজ নিয়ে সর্বশেষ অগ্রগতি জানাতে পারব।’ 

বহুস্তর বিপণনব্যবস্থায় আগ্রহীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ‘এমএলএম ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে একটি আইন ও একাধিক বিধি হয়েছে। মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩ (২০১৩ সালের ৪৪ নম্বর আইন), এসআরও নং ১৯১/২০১৪-এর কিছু সংশোধনী খসড়া আকারে তৈরি করা হয়েছে। সংশোধনীটি প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ না হওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কাউকে এমএলএম ব্যবসার অনুমতি দিচ্ছে না। ফলে এখন যেসব এমএলএম কোম্পানি রয়েছে তার প্রায় সবই অবৈধ। তা ছাড়া লাইসেন্স না দেওয়ায় যারা এখন এমএলএম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করছে, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, আইন পাস হওয়ার আগে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এমএলএম ব্যবসা শুরু করে। আইন পাসের পর লাইসেন্স না দেওয়ায় তাদের ব্যবসা প্রায় গুটিয়ে নিতে হয়। নতুন করে লাইসেন্স না দেওয়ায় আগের অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা পরিচালনায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে ভারত, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ আইন করে এমএলএম ব্যবসার অনুমতি দিয়েছে। আমাদের দেশে এমএলএম ব্যবসার অনুমতি দেওয়া হলে বৈধ ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়ের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে অসংখ্য বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

এদিকে এমএলএম আইনের খসড়া সংশোধনীতে পিরামিডসদৃশ বিক্রয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ অংশে বলা হয়েছে, ‘মাল্টি লেভেল কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০১৯ দ্বারা অবৈধ অর্থ সঞ্চালন বা পিরামিড স্কিমের আওতাভুক্ত যেকোনো কার্যক্রম বা পরিকল্পনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের ছদ্মবেশে বা আচ্ছাদনে অবৈধ অর্থ সঞ্চালন বা পিরামিড স্কিমের আওতাভুক্ত কোনো ধরনের কার্যক্রম বা পরিকল্পনায় তালিকাভুক্ত বা অংশগ্রহণ করবেন না বা প্রচার চালাবেন না।’

এতে আরও বলা হয়, ‘ম্যাট্রিক প্ল্যান, বাইনারি প্ল্যান ও স্টেয়ার-স্টেপ বা বোর্ড ব্রেকিং প্ল্যান বা এর সদৃশ কোনো প্রকার কার্যক্রম পিরামিড স্কিমের আওতাভুক্ত বলে গণ্য হবে এবং ওই প্ল্যানগুলোর অধীনে যেকোনো প্রকার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিচালনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউনি লেভেল প্ল্যানের অধীনে পরিচালিত কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক মাধ্যমসহ যেকোনো মাধ্যমের সহায়তায় প্রচারিত বিজ্ঞাপন, প্রস্তুত, প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা বা অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করা যাবে না।’

খসড়ায় ইউনি লেভেল প্ল্যান সম্পর্কে বলা হয়, ‘গ্রাহকের দ্বারা গঠিত একটি বিপণন-প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রত্যেক গ্রাহক তার সম্মুখে বা পরবর্তী স্তরে যেকোনো সংখ্যক গ্রাহককে সংযুক্ত করার মাধ্যমে একটি বহু স্তরযুক্ত নেটওয়ার্ক সিস্টেম গড়ে তোলেন।’

ম্যাট্রিক প্ল্যান সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘গ্রাহকের দ্বারা গঠিত একটি বিপণন-প্রক্রিয়া। যার মাধ্যমে প্রত্যেক গ্রাহক তার সম্মুখে বা পরবর্তী স্তরে ৩ বা ততোধিক নির্ধারিত গ্রাহককে যুক্ত করার মাধ্যমে একটি বহু স্তরযুক্ত নেটওয়ার্ক সিস্টেম গড়ে তোলা, যার ফলে পর্যায়ক্রমে একটি বহুস্তরবিশিষ্ট পিরামিডসদৃশ নেটওয়ার্ক গঠিত হয়।’

এ ছাড়া বাইনারি প্ল্যান সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘গ্রাহকদের দ্বারা গঠিত একটি বিপণন-প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রত্যেক গ্রাহক তার সম্মুখে বা পরবর্তী স্তরে নির্ধারিত দুজন গ্রাহককে সংযুক্ত করার মাধ্যমে একটি বহুস্তরযুক্ত নেটওয়ার্ক সিস্টেম গড়ে তোলা, যার ফলে পর্যায়ক্রমে একটি বহুস্তরবিশিষ্ট পিরামিডসদৃশ নেটওয়ার্ক গঠিত হয়।’

স্টেয়ার স্টেপ বা বোর্ডি প্ল্যান হচ্ছে গ্রাহকের দ্বারা গঠিত একটি বিপণন-প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন গ্রাহক তার সম্মুখে/পরবর্তী স্তরে/ স্তরগুলোয় নির্দিষ্টসংখ্যক গ্রাহক যুক্ত করার শর্তে কার্যক্রম শুরু করেন। ওই শর্ত পূরণের মাধ্যমে তিনি কমিশন/ বোনাস প্রাপ্তিসহ পরবর্তী উচ্চতর ধাপে আরোহণ করে একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন, যার ফলে পর্যায়ক্রমে একটি বহুস্তরযুক্ত পিরামিডসদৃশ নেটওয়ার্ক গঠিত হয়।

অবৈধ অর্থ সঞ্চালন বিষয়ে বলা হয়েছে, মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কার্যক্রমের আচ্ছাদনে যেকোনো ধরনের পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা অপারেশন বা কার্যক্রম, যার মাধ্যমে কোনো বাস্তব পণ্য বা সেবা বিক্রির পরিবর্তে শুধু অর্থের বিনিময়ে নতুন গ্রাহককে সংযুক্ত করা হয় এবং তদানুযায়ী লভ্যাংশ, কমিশন, বোনাস ইত্যাদি দেওয়া।

খসড়ায় এমএলএম মার্কেটিং কার্যক্রম পরিচালনার শর্তে বলা হয়, বাংলাদেশ কোম্পানি, আয়কর, পরিষেবা কর, খাদ্যনিরাপত্তা, ভোক্তা অধিকার আইনসহ প্রযোজ্য বাংলাদেশের সব বিধিবদ্ধ আইন ও বিধানগুলো মেনে চলতে হবে। একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী অফিস থেকে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। এমএলএমের সঙ্গে যুক্ত ভোক্তা, বিক্রেতা, ক্রেতা-পরিবেশক ও বিপণনকারীদের সুবিধার্থে পণ্যের পরিচিতি, মূল্য পরিশোধ, কার্যকরী ডেলিভারি প্রক্রিয়া, বিক্রয়োত্তর সেবা, পণ্য ফেরত বা প্রতিস্থাপনের নীতি ইত্যাদি পরিষেবার জন্য ক্ষেত্রমতে আঞ্চলিক শাখা অফিস প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোনো অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়ে গত ৫ বছরের মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যবস্থাপক, প্রবর্তক বা গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তা বা কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হবেন না মর্মে নিশ্চিত করতে হবে।

আইনের খসড়ায় এমএলএম কোম্পানিকে বেশ কিছু বিধি মেনে চলার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে ‘প্রত্যেক বিক্রেতা, ক্রেতা, পরিবেশক ও বিপণনকারীদের বিস্তারিত বিবরণসহ একটি নিবন্ধন বহি (ম্যানুয়াল বা ইলেকট্রনিক) রাখতে হবে, যেখানে প্রত্যেক বিক্রেতা, ক্রেতা-পরিবেশক ও বিপণনকারীর সব ব্যবসায়িক লেনদেন সঠিকভাবে লেখা থাকবে। এটি যথাযথ আপডেট ওয়েবসাইট থাকবে; যেখানে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, পণ্য, পণ্যসংক্রান্ত তথ্য, গুণগত সনদ, মূল্য, পরিষেবা, আয়ের পরিকল্পনা, যোগাযোগের তথ্যসহ বিস্তারিত বিবরণ থাকবে। ওয়েবসাইটে ভোক্তা, বিক্রেতা, ক্রেতা-পরিবেশক ও বিপণনকারীদের অভিযোগ নিবন্ধনের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং অভিযোগ নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরপর প্রত্যেক বিক্রেতা, ক্রেতা-পরিবেশক ও বিপণনকারীদের তাদের ক্রয়-বিক্রয়, আয়, কমিশন বোনাস ও অন্যান্য তথ্য সম্পর্কিত লিখিত বিবৃতি দেবে।

প্রাতিষ্ঠানিক বিধিনিষেধ সম্পর্কে বলা হয়, ভোক্তা, বিক্রেতা বা বিপণনকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য কোনো ধরনের বিভ্রান্তিকর বা প্রতারণামূলক পন্থা নেওয়া যাবে না; বিক্রয় বা উপার্জন সম্পর্কে কোনো মিথ্যা তথ্য বর্ণনা করা যাবে না; মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা আশ^াস দেওয়া যাবে না; প্রতারণা, জালিয়াতি বা বেআইনি কোনো প্রচারণা চালানো যাবে না। কোনো ধরনের প্রবেশ ফি, নবায়ন ফি বা মাসিক চাঁদা নেওয়া যাবে না। প্রশিক্ষণের কোনো ফি নিতে পারবে না।

এ ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়স্ক ব্যক্তি, ফুলটাইম স্কুলছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসাকর্মী, সরকারি কর্মচারী ও সামরিক বাহিনীতে তালিকাভুক্ত ব্যক্তি, অন্য কোনো মাল্টি লেভেল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, বিদেশি নাগরিক ও কোনো আইন বা প্রশাসনিক বিধিনিষেধ অনুসারে নিষিদ্ধ কোনো ব্যক্তিকে এমএলএম কোম্পানিতে বিক্রেতা, ক্রেতা-পরিবেশক ও বিপণনকারী হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে না।

জানা গেছে, গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা বন্ধে মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩ পাস করা হয়। এই আইনে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জেল অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে। প্রশাসক নিয়োগের বিধানও রাখা হয়েছে। ওই সময় চলমান কোম্পানিগুলোকে ৯০ দিনের মধ্যে সনদ নেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়। কিন্তু গত ৮ বছরেও কেউ লাইসেন্স পাননি।