দেশের আর্থিক চিত্র বিদেশে তুলে ধরা হচ্ছে : এসইসি চেয়ারম্যান

পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশের সঠিক আর্থিক চিত্র ও উন্নয়ন প্রচারের কাজ চলছে। বিশে^র বিভিন্ন দেশে রোড শো আয়োজনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের পুঁজিবাজারের পরিচিতি বাড়ানো ও ভাবমূর্তি উন্নয়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম।

গতকাল ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ডায়ালগ অন বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে এমন তথ্য জানিয়ে এসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ইতিমধ্যেই দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বিদেশিদের কাছ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, এত দিন বিদেশিদের কাছে দেশের সব নেতিবাচক দিক তুলে ধরা হয়েছে। তারা আমাদের ভালো দিকগুলো সম্পর্কে জানেন না। আমাদের অর্থনীতি যে অনেক ভালো করছে, আমাদের যে অনেক সম্ভাবনা আছে, এসব তথ্য বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তেমন জানেন না। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের তুলনায় আমরা যে ভালো করছি, তা তথ্য আকারে আমাদের সত্যিকারের অবস্থান বিদেশিদের জানাতে কাজ করছি। তাই পুঁজিবাজার ও দেশের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য এসইসি বিভিন্ন দেশে রোড শো আয়োজন শুরু করেছে। সম্প্রতি আমরা দুবাইয়ে রোড শো করেছি, খুব ভালো ফল পাওয়া গেছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে, যারা আমাদের বন্ড ও মিউচুয়াল ফান্ডে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে চায়।

তিনি বলেন, বিশে^র অন্যতম বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট সুইস আগামী ১৫ জুন বাংলাদেশকে নিয়ে রোড শোর আয়োজন করবে, যেখানে আমরা বাংলাদেশকে তুলে ধরব। এ ছাড়া জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের যে রাষ্ট্রদূতরা রয়েছেন, তারাও রোড শো করবেন বলে জানিয়েছেন। এর বাইরে টোকিও, সাংহাই, হংকং, সৌদি আরবে প্রচারণা চালানো হবে, যার মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। পৃথিবীতে যত বড় বড় ফিন্যান্সিয়াল হাব বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র রয়েছে আমরা সেখানে যাচ্ছি। সব মিলিয়ে আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশের সঠিক আর্থিক চিত্র সারা বিশে^ তুলে ধরতে পারব বলে আশা করছি।

দেশের অর্থনীতির তুলনায় আমাদের পুঁজিবাজার অনেক পিছিয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি জানান, দ্রুতই এ অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। বড় কিছু সংস্কার শুরু হয়েছে বাজারে। চালু হতে যাচ্ছে নতুন নতুন পণ্য। এসইসির নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আগামী বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে এমার্জিং মার্কেটে উন্নীত হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই চেয়ারম্যান।

এসইসি চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারের যে চরিত্র, তার অনেক কিছুই আমাদের এখানে অনুপস্থিত। এখানে ইকুইটি মার্কেটনির্ভর একটি ক্যাপিটাল মার্কেট। এখানে শুধু কোম্পানির ইকুইটি নিয়ে কাজ হয়। সেই ইকুইটির জন্য যে এক্সিট প্ল্যান লাগে, সেই প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মার্কেট নিয়েই সারা দিন আলোচনা হয়। অথচ একটি ভালো অর্থনীতির পুঁজিবাজারে ইকুইটির পাশাপাশি বন্ড, কমোডিটি, ফিউচারসহ বিভিন্ন সিকিউরিটিজ লেনদেনের সুযোগ থাকে। তাই শুধু ইকুইটি শেয়ারের নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে এসইসি নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। কার্যকর বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। সরকারি-বেসরকারি খাতে সুকুক বন্ড ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ছাড়া কমোডিটি মার্কেট, ফরোয়ার্ড মার্কেট, ডেরিভেটিভসসহ নানা প্রডাক্ট চালুরও প্রস্তুতি চলছে। এক বছরের মধ্যে সেন্ট্রাল কাউন্টার পার্টি, স্মল ক্যাপ বোর্ড ও অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট বোর্ড কার্যক্রম শুরু করবে। এসব উইং ও পণ্য চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করা হচ্ছে। স্টক এক্সচেঞ্জগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই প্রধান বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন সাড়ে ৩০০ ডলারের এবং বাজেটের সাইজ ৫ লাখ টাকারও বেশি। অথচ আমরা কমিশনে যোগদানের পর ১২০০-১৩০০ কোটি টাকার আইপিও দিয়েছি, যা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির যে আকার, সেখানে যদি ১২০০-১৩০০ কোটি টাকার ইকুইটি দেওয়া হয়, তা দিয়ে সামনে এগুতে পারবে না।

অধ্যাপক ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম জানিয়েছেন, মিউচুয়াল ফান্ডের উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। আগামীতে মিউচুয়াল ফান্ডে বড় ধরনের বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। এই প্রান্তিকে মিউচুয়াল ফান্ডগুলো ভালো করছে। ফান্ডগুলো লভ্যাংশ দিতে শুরু করেছে। আশা করছি, বিনিয়োগকারীরা লভ্যাংশ পেলে তাদের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা আসবে। এতে এই খাত ঘুরে দাঁড়াবে।

দেশে ৫-৬টি কোম্পানি আছে, যাদের বার্ষিক টার্নওভার ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। দেশে যেসব বহুজাতিক ও স্থানীয় ভালো কোম্পানি রয়েছে, তাদের পুঁজির ততটা প্রয়োজন নেই। আর অর্থের প্রয়োজন হলেও তারা বিদেশ থেকে স্বল্প সুদে তা সংগ্রহ করতে পারে। তাই এসব কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে হলে তাদের কর সুবিধা দিতে হবে জানিয়ে এসইসি চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারের ব্যবধান মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ। আমরা প্রস্তাব দিয়েছি এই করহারের ব্যবধান ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে। এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান যাতে বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, সে জন্য আমরা বন্ডের ওপর জোর দিচ্ছি।

রিজার্ভের অর্থ দ্রুত বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে শিবলী রুবাইয়াত বলেন, সামনে আমাদের রিজার্ভ ৫০ বিলিয়ন ডলার হয়ে যাবে। এই রিজার্ভের অর্থের জোগান যারা দেন, তাদের টাকা কিন্তু পরিশোধ করা হয়ে গেছে। এই রিজার্ভ ধরে রাখলে দায় বাড়বে। তাই দ্রুত রিজার্ভের অর্থ বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, করোনার শুরুর দিকে বিশ^বাজারে জ¦ালানি তেলের দাম ৫ ডলারে নেমে এসেছিল। সে সময় ৫ ডলারে তেল কিনে রাখলে ৩০ ডলারে বিক্রি করা সম্ভব হতো। এই তেল কেনার শক্তি ও সামর্থ্য সবই ছিল আমাদের। কিন্তু দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশ এই সুযোগ নিতে পারেনি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য লভ্যাংশের সীমা বেঁধে দেওয়াসংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে এসইসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘একেক ব্যাংকের অবস্থা একেক রকম। সুতরাং আমরা মনে করি ব্যাংকের লভ্যাংশের বিষয় বেঁধে দেওয়া ঠিক হবে না। এখানে অনেক ব্যারিয়ার আছে। এটা নিয়ে আমরা আলাপ-আলোচনা করে ঠিক করব। তবে এখানে শেয়ারহোল্ডার ও এজিএমের একটা বড় ভূমিকা আছে, সেটাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত হবে না।’

তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষা প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা বাড়াতে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এসইসি চেয়ারম্যান। এর অংশ হিসেবে আইসিএবির সঙ্গে এসইসি ও এফআরসি চুক্তি সই করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও তাতে সই করবে। ফলে আইসিএবিতে থাকা একটি কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন যেকোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা পরীক্ষা করতে পারবে। ফলে একটি কোম্পানি ব্যাংকের জন্য এক রকম, এনবিআরের জন্য অন্য রকম এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেক রকম আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করতে পারবে না।

এসইসি চেয়ারম্যান বলেন, সম্প্রতি আমরা খেয়াল করছি বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই কিছু কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এ বিষয়ে আমরা দেশের সর্বোচ্চ মহলের সঙ্গে কথা বলেছি। তার নির্দেশেই আমি গভর্নরের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি হাইপ্রোফাইল টিম এসইসিতে ১৫ মার্চ আলোচনা করতে আসবে। বৈঠকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ভবিষ্যতে যাতে এসব বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে এবং কোনো রেগুলেটরি সিদ্ধান্ত কারও অসুবিধার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় তা নিয়ে আলোচনা করব।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুঁজিবাজার এখন অনেক বেশি আধুনিকায়ন হয়েছে। তাই এখন আর আগের মতো কারসাজির সুযোগ নেই। ফলে ১৯৯৬ কিংবা ২০১০ সালের মতো বাজারে বড় পতন হবে বলে মনে করি না।

ইআরএফ সভাপতি শারমিন রিনভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এস এম রাশিদুল ইসলাম।