বিক্ষোভে ফের পুলিশের গুলি নিহত আরও ৬ বিক্ষোভকারী

মিয়ানমারে পুলিশের গুলিতে আরও ছয় বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার রাতভর সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভের সময় ইয়াঙ্গুনের থারকেতা জেলায় পুলিশের গুলিতে দুইজন নিহত হন। গতকাল শনিবার পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আরও চার বিক্ষোভকারী।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী মান্দালায় বিক্ষোভকারীরা অবস্থান ধর্মঘট শুরু করলে পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি ছোড়ে। এতে তিনজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। মধ্যাঞ্চলের শহর পিআইতে একজন নিহত হয়েছেন।

পিআইতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২৩ বছরের এক বিক্ষোভকারী বলেন, গুলি করার পর নিরাপত্তা বাহিনী শুরুতে ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স আসতে বাধা দেয়। পরে অবশ্য অ্যাম্বুলেন্স আসতে দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে মারাত্মক আহত একজন মারা যান।

এদিকে আটক বিক্ষোভকারীদের মুক্তির দাবিতে একদল বিক্ষোভকারী শুক্রবার রাতে ইয়াঙ্গুনের থারকেতা জেলা পুলিশ স্টেশনের বাইরে জড়ো হলে পুলিশ তাদের দিকে সরাসরি গুলি চালায়। গুলিতে দুজন প্রাণ হারান।

মিয়ানমারের ক্ষমতা দখল করা জান্তা বাহিনী এক দিকে বিক্ষোভ দমাতে বল প্রয়োগ করে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরাও যেন দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে না ফেরার প্রতিজ্ঞা করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীরা শনিবার আরও বড় বিক্ষোভ আয়োজনের ডাক দেন। ১৯৮৮ সালের এই দিনে মিয়ানমারে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রেঙ্গুন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফোন মাও। পুলিশ ক্যাম্পাসের ভেতরই তাকে গুলি করে হত্যা করে। মাও এবং কয়েক সপ্তাহ পর নিহত হওয়া আরেক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর মিয়ানমার জুড়ে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। যেটা ৮-৮-৮৮ বিক্ষোভ নামে পরিচিত। ওই বিক্ষোভে প্রায় তিন হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হন।

ওই বিক্ষোভের সময়ই গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান অং সান সু চি। তারপর থেকে প্রায় দুই দশক তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। ২০০৮ সালে তিনি গৃহবন্দি দশা থেকে মুক্তি পান।

গত ১ ফেব্রুয়ারি সু চির দল মিয়ানমারের নির্বাচিত এনএলডি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতার দখলে নেয় দেশটির সেনাবাহিনী। তারপর থেকে সেখানে সেনা অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

এ বিষয়ে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্ত কর্মকর্তা টমাস অ্যান্ড্রু বলেছেন, বিক্ষোভ দমনে সামরিক বাহিনীর এই ‘খুন, নির্যাতন ও হয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড’ মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

অ্যান্ড্রু জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদকে বলেছেন, নিহতদের অর্ধেকের বেশির বয়স ২৫ বছরের কম। সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর দুই হাজারের বেশি মানুষকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছে এবং প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বেড়েই চলছে। মিয়ানমার নামের দেশটি খুনি ও অবৈধ শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর লোকেরা বিক্ষোভকারী, চিকিৎসাকর্মী ও পথচারীদের নির্মমভাবে মারধর করেছে এমন ঘটনার বিস্তৃত ভিডিওচিত্র প্রমাণ হিসেবে রয়েছে।

সহিংসতার এমন ভিডিওচিত্র রয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর হামলার পরের পরিস্থিতিও উঠে এসেছে, দেখা গেছে প্রাণঘাতি গুলি বিক্ষোভকারীদের মাথায় আঘাত করেছে এবং সেনাসদস্যরা নিহত প্রতিবাদকারীদের মৃতদেহ সরিয়ে নিচ্ছে।

এদিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত রাশিয়া ও চীন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, পাশাপাশি কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি সমুন্নত রাখার কথাও বলেছে।