সহিংসতা চর্চার হাতেখড়ি পশুপাখি নির্যাতনে

কিছুদিন আগে একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড সাড়া ফেলেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। হত্যাকা-ের ভিকটিম একটি বিড়াল। এ দেশে বহু প্রাণী অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়, যেমনটা মানুষের ক্ষেত্রেও নেহাত কম নয়। কিন্তু এই ঘটনাটি সবার বিবেকে আঘাত হানে হত্যাকাণ্ডের ধরনের কারণে। এক কিশোরী ছোট একটি বিড়ালকে জীবন্ত চামড়া ছাড়িয়ে সেই অবস্থায় তার নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করে। বিড়ালটির যন্ত্রণাকাতর চিৎকার তার হৃদয়কে ছুঁতে পারেনি। সে নির্বিকারভাবে হত্যাকা-ের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে এবং ছোট ভাইকে দিয়ে পুরো ঘটনাটির ভিডিওচিত্র ধারণ করে। এ সময় তার কণ্ঠে শোনা যায় ‘আই লাভ ব্লাড’। অতঃপর সে ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে। বিষয়টি প্রাণিপ্রেমীদের নজরে আসে এবং তারা সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেন।

২০১৬ সালে সাভারে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছি এক কিশোর ছোট্ট একটি কুকুরছানাকে চক্রাকারে ঘুরিয়ে আছড়ে আছড়ে হত্যা করে। ছানাটির তীব্র আর্তনাদেও কিশোরটির মন গলেনি। পুরো ঘটনাটির ভিডিওচিত্র ধারণ করে অপর এক কিশোর। উদ্দেশ্য ছিল নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রচার করে দর্শক বাড়ানো। ঘটনাস্থলে ৫-৮ বছর বয়েসি আরও কয়েকটি শিশু উপস্থিত ছিল। এই ঘটনায়ও আইনি হস্তক্ষেপ করা হয় এবং জরিমানা দিয়ে মুক্তি পায় অপরাধী। এই দুই ঘটনার সাধারণ মিল হলো ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার পাওয়ার আকাক্সক্ষা এবং নিজেদের অনুসারী বাড়ানো, বিকৃত মানসিকতায় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার সংকল্প এবং দুই ক্ষেত্রেই অভিভাবক কর্র্তৃক অপরাধের বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টাও লক্ষ করা যায়।

হত্যাকারীর বয়স এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার প্রক্রিয়া দুটোই আমাদের একটি প্রশ্নের মুখে ফেলার জন্য যথেষ্ট, কোথায় যাচ্ছে শিশু-কিশোরদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা?

এ তো গেল অপরাধ, প্রতিক্রিয়া এবং আইনি পদক্ষেপ। প্রশ্ন হলো এ ঘটনা আমাদের কোনো বাস্তবতার মুখোমুখি করে? কী ঘটত যদি প্রাণিপ্রেমীরা সোচ্চার না হতেন? এবং এমন একটি অপরাধ কেন কেবল প্রাণিপ্রেমীদের মাধ্যমেই আইনের আওতায় আসতে হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর তল্লাশি এখন সময়ের চাহিদা।

আমরা লক্ষ করছি, আমাদের দেশে নানা ধরনের সহিংসতা যেমন খুন, হত্যা, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, আত্মহত্যা ও গণপিটুনি দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রশাসন অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে তৎপর হচ্ছে। কিন্তু অপরাধী সৃষ্টি হওয়ার কারখানাটা কোথায়? একজন মানুষ তো অপরাধী হয়ে জন্মায় না? তবে কোন কোন কারণে কিংবা কোন ‘মনস্তত্ত্বের কারখানা’ তাকে অপরাধী হিসেবে গড়ে তুলছে। প্রশাসন কি সমাজ থেকে সেসব ‘মনস্তত্ত্বের কারখানা’ বন্ধ করার কোনো পরিকল্পনা নিয়েছে? নাকি ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলা অপরাধীদের ধরতেই তারা ব্যস্ত থাকবেন? সহিংসতার সূত্র খুঁজতে হলে প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা অথবা প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে শুধু প্রাণিপ্রেমীদের বিষয় বলে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

‘Human beings would benefit enormously if fighting animal cruelty (investigating, prosecuting) were taken seriously. Many human lives would be saved and much human suffering would be prevented’– Dr. Harold Hovel. মূলত একজন ব্যক্তি যখন অপরাধ করেন, শুধু তখনই আমরা তাকে অপরাধী হিসেবে জানতে পারি। একটি শিশু, কিশোর অথবা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কোনো কোনো আচরণ অপরাধী হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেয়, সেটি সময়মতো বুঝতে পারলে বহু সম্ভাব্য অপরাধীকে হয়তো অঙ্কুরেই সংশোধন করা যেত। এ বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলো গত কয়েক দশকে তাদের গোয়েন্দা বিভাগ, কারা কর্র্তৃপক্ষ, মানসিক হাসপাতাল, মনোবিজ্ঞানী, সমাজ বিজ্ঞানীদের সহায়তা নিয়ে বেশ খানিকটা গুছিয়ে এনেছে। এই বিষয়ে Board of The New York State Humane Association-এর চেয়ারম্যান ড. হ্যারোল্ড হোভেলের গবেষণার কথা বলা যায়। তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর মানবিকতা এবং প্রাণিকল্যাণ বিষয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে নিযুক্ত থেকেছেন। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘The Connection between Animal Abuse and Human Violence’। এই গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগ এফবিআই, বিচার বিভাগ, পুলিশপ্রধানদের অ্যাসোসিয়েশন এবং বহু বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের যুক্ত করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যের বিভিন্ন কারাগার থেকে অপরাধীদের ওপর করা এক জরিপে দেখা যায় শতকরা হিসাবে ধর্ষকদের মধ্যে ৪৮ ভাগ, যৌন বিকারগ্রস্ত খুনিদের প্রায় ৪৬ ভাগ, উপর্যুপরি নির্যাতনকারীদের ৫২ ভাগ, বিকৃত যৌনরুচির অপরাধীদের ৩০ ভাগ এবং পেশাদার খুনিদের ৯০ ভাগেরই শৈশবে প্রাণীর প্রতি নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে। সেসব নির্যাতনের বর্ণনা যেকোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষকে বিপর্যস্ত করে দেবে। এরা কেউই শুরু থেকেই প্রাণীদের প্রতি এমন নির্মম ছিলেন না। গবেষণায় দেখা যায় প্রায় প্রত্যেকেই শৈশবে নিজেরা শারীরিক, মানসিক অথবা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অথবা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সহিংসতার চর্চা দেখেছেন।

প্রাণী অধিকার নিয়ে সরাসরি কাজ করার ফলে গত দশ বছরে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার বহু লোমহর্ষক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে আলোচিত হওয়ার অসুস্থ মানসিকতা থেকেও অনেকেই এমন সহিংসতা দেখান। হতাশাজনক হলো এসব সহিংসতার ঘটনা হয় প্রাণিপ্রেমীদের আলোচনায়ই সীমাবদ্ধ থেকেছে কিংবা অনেকের কাছে এই প্রাণিপ্রেমীদের বাড়াবাড়ি হিসেবে গণ্য হয়েছে।

ড. হ্যারোল্ডের গবেষণায় স্পষ্ট দেখা যায় যারা প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা করেন, তারা সুযোগমতো তা মানুষের ওপরও প্রয়োগ করেন। পশ্চিমা বিশ্ব এবং আমাদের দেশে এ বিষয়ে একটি বড় পার্থক্য হলো তারা গবেষণা করে অপরাধমূলক আচরণগুলো চিহ্নিত করেছে। অন্যদিকে আমরা অপরাধীকে চিহ্নিত করতে পারি মানুষের ওপর চড়াও হওয়ার পর। কারণ, আগেই পরিবার থেকে প্রাণীদের ওপর এমন ব্যক্তির নির্যাতনের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা অথবা শখ হিসেবে ছাড় দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২০১৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই প্রাণী নির্যাতনকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে আমলে নিচ্ছে এবং মানুষ হত্যার তদন্তের মতোই একই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করেছে।

যেহেতু পরিবারই একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র, কাজেই শিশুর মানবিকতা অথবা পাশবিকতার বিকাশও পরিবার থেকেই শুরু হয়। ড. হ্যারোল্ড দেখিয়েছেন, শিশুদের মনোবিকারের জন্য প্রধানত দায় পরিবারের সদস্যদের। যে শিশু শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয় অথবা পারিবারিক কলহে বেড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বেশি দেখা যায়। পশ্চিমা বিশ্বের পরিবারগুলোয় প্রায় প্রত্যেকের বাড়িতে পোষা প্রাণী রয়েছে। কাজেই, নির্যাতিত শিশু তার ক্রোধ দমন করতে পোষা প্রাণীর ওপর নির্যাতন চালায়। অন্যদিকে, পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য নিজের আধিপত্য বিস্তার এবং ভীতিকর আবহ সৃষ্টি করে রাখতেও বাসার পোষা প্রাণীর ওপর অত্যাচার করেন। ফলে, সেই বাসার শিশুরা একটা ভীতির মধ্যে বেড়ে ওঠে। এ দেশে বাড়িতে বাড়িতে পোষা প্রাণী খুব বেশি দেখা না গেলেও, আমাদের সমাজে বহু পথপ্রাণী এবং বন্যপ্রাণী রয়েছে। যাদের অনেককেই ‘বেওয়ারিশ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। শিশু-কিশোরদের নির্যাতনের স্বীকার হয় এই প্রাণীগুলো। অভিভাবকরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো উপেক্ষা করেন। যেহেতু কোনো শিশুই সহিংস বা অহিংস হয়ে জন্মায় না, সেহেতু কেউ যদি কোনো প্রাণীর প্রতি নির্মমতা করে বুঝতে হবে সেই শিশুর বিকশিত হওয়ার পরিবেশ সুস্থ নয় এবং সে কোনো না কোনো সহিংসতার সাক্ষী।

অভিভাবকের গালাগাল, পারিবারিক কলহ, সহপাঠীদের দ্বারা অপদস্থ হওয়া এমন নানাবিধ কারণে একটি শিশুর মনে অপরাধী হয়ে বেড়ে ওঠার সম্ভাবনার বীজ রোপিত হয়। যার ফলে অপরাধ চর্চা শুরু হয় নিজের ঘর থেকেই এবং তার শিকার হয় বাসার গৃহপরিচারিকা, ছোট ভাই-বোন, শারীরিকভাবে পঙ্গু বয়স্ক মানুষ অথবা পোষা প্রাণী।

অন্যদিকে বিস্মিত হওয়ার মতো একটি তথ্য হলো, ১৯৬২ সালের আগে পশ্চিমা দেশগুলোয়ও অভিভাবক কর্র্তৃক শিশু নির্যাতন হতে পারে এটি মনেই করা হতো না এবং ১৯৮০ সালের আগে শিশুদের ওপর পরিবারের সদস্য কর্র্তৃক যৌন নিপীড়ন হতে পারে সেটিও মনে করা হতো না। এটি প্রথম আমলে নেন ড. হেনরি কেম্প। প্রায়ই দেখা যেত সন্তানের ভাঙা হাত অথবা চোখে-মুখে ক্ষত নিয়ে অভিভাবকরা আসতেন চিকিৎসা নিতে। বলা হতো দুর্ঘটনায় এমনটি হয়েছে। ঘুরে-ফিরে পশ্চিমাদের কথা আসছে এ কারণে যে, আমাদের সমাজে সন্তানকে পেটানো, স্ত্রীকে পেটানো অথবা বৃদ্ধ বা দুর্বল মানুষকে নির্যাতন করা এখনো একটি প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা। আমরা হয়তো নানাভাবে পশ্চিমাদের নগর কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছি কিন্তু আদর্শিক বা নীতিগত উন্নতির বিষয়টি প্রাধান্য দিচ্ছি না। ফলে, পশ্চিমারা যেসব সামাজিক ব্যাধি থলেয় লুকিয়ে বেড়াচ্ছে, আমাদেরও সেই একই পরিণতি হবে। হিউম্যান সোসাইটি অব ইউনাইটেড স্টেটের একটি জরিপে দেখা যায় খোদ যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দশ মিলিয়ন প্রাণী নির্যাতনের শিকার হয়। যার মধ্যে মালিক কর্র্তৃক কুকুর-বিড়াল ধর্ষণের মতো ঘটনাও রয়েছে।

প্রাণীর প্রতি স্বাভাবিক সহমর্মিতা প্রকাশ না করা সামাজিক অস্থিরতার একটি পরিচায়ক। এ ধরনের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করাকে ‘প্রাণিপ্রেম’ তকমা দিয়ে হালকা করে দেখার উপায় নেই। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার-বিভাগ, সমাজবিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং গবেষকদের এসব বিষয়ে তদন্ত শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে নিজের এবং সন্তানের আচরণ সম্পর্কে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা করে কেবল ভালো চাকরিপ্রাপ্তির চেয়ে সামাজিক মূল্যবোধে বিকশিত হয়ে বিশ্বজনীন হয়ে ওঠাটা বেশি জরুরি। প্রাণী-প্রকৃতিকে ভালোবেসে সমাজের সবস্তরেই মানবিকতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। কেবল তাহলেই আমরা একটি সহিংসতাবর্জিত সহানুভূতিশীল সমাজ গড়তে পারব।

লেখক স্থপতি ও প্রাণী অধিকার কর্মী

haqueamil83@gmail.com