এক বছরে ব্যাংকগুলোর হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে টানা দরপতন সামাল দিতে গত বছর ১০ ফেব্রুয়ারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে বিশেষ সুবিধায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের সুযোগ হয়। তবে বেশিরভাগ বাণিজ্যিক ব্যাংক এখনো তহবিল গঠন করেনি। আবার কিছু ব্যাংক তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করছে। এর ফলে এক বছরের বেশি সময় পার হলেও বিশেষ তহবিল থেকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে মাত্র হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, তহবিল গঠন সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির পর গত ৭ মার্চ পর্যন্ত ২৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক বিশেষ তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। আর ওই তহবিল থেকে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করেছে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা।

এক সময়ে পুঁজিবাজারে আইনিসীমা লঙ্ঘন করে ব্যাংকগুলো বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করলেও ২০১০ সালের ধসের পর তা ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ সীমা আরও কমিয়ে আনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এতে করে পুঁজিবাজারে দৈনিক লেনদেনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। এক সময়ে মোট লেনদেনের ৩০ শতাংশের বেশি ব্যাংকের অংশগ্রহণ থাকলেও বর্তমানে তা ৫-৬ শতাংশে নেমে এসেছে। পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (এসইসি) উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকগুলোর বন্ড অনুমোদনের ক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ২০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের শর্ত জুড়ে দিচ্ছে এসইসি। এতে করে কিছু ব্যাংক তহবিল গঠন করলেও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলক কম।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো সুবিধায় সহজ শর্তে তহবিল গঠনে ঋণ দেওয়ার সুযোগ দিলেও অধিকাংশ ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। এর মধ্যে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, ওয়ান, ইউসিবি, এনসিসিবিএল, ইসলামী ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক প্রতিটি ২০০ কোটি টাকা করে বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। এছাড়া এক্সিম ব্যাংক ৮০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে। সিটি ব্যাংক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ৫০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। এর বাইরে রূপালী, পূবালীসহ আরও ১৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক আরও ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। বেশিরভাগ ব্যাংকই নিজস্ব উৎস থেকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের তহবিল গঠন করেছে।

জানা গেছে, বিশেষ তহবিল থেকে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, আইএফআইসি, ইউসিবি ও রূপালী ব্যাংক। এ ছয়টি ব্যাংক বিশেষ তহবিল থেকে প্রায় শতকোটি টাকা করে বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া পূবালী ব্যাংক ৭০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই বিশেষ তহবিল থেকে নিজস্ব পোর্টফোলিওতে বিনিয়োগ করছে। নীতিমালা অনুযায়ী, বিশেষ তহবিলের ৬০ শতাংশ সাবসিডিয়ারিসহ ব্যাংক তার নিজস্ব পোর্টফোলিওতে বিনিয়োগ করতে পারে।

তফসিলি ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ড রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারে। ব্যাংকগুলো চাইলে নিজস্ব উৎস থেকেও এমন তহবিল গঠন করতে পারে। ওই বিশেষ তহবিলের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব পোর্টফোলিওতে ব্যবহার করতে পারবে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে গঠন করা বিশেষ তহবিল ২০২৫ সাল পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবে ব্যাংক, যা পুঁজিবাজারে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বর্ণিত বিনিয়োগ গণনার বাইরে থাকবে।

তহবিলের অর্থ শুধু পুঁজিবাজারের ২১৭টি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে, যা পুঁজিবাজারে ব্যাংক কোম্পানি আইনের বর্ণিত বিনিয়োগ গণনার বাইরে থাকবে। ওই বিশেষ তহবিলের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব পোর্টফোলিওতে ব্যবহার করতে পারবে। আর ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিও গঠনের জন্য ঋণ হিসেবে তহবিলের ২০ শতাংশ দেওয়া যাবে। অন্য ব্যাংকের বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংক বা ব্রোকারেজ হাউজের নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিওর জন্য ৩০ শতাংশ ও অন্যান্য মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের নিজস্ব নতুন পোর্টফোলিও গঠনের জন্য তহবিলের ১০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেওয়া যাবে।